‘পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে জীবিকায়নের ধরন, বর্তমান প্রেক্ষাপট ও বাধাসমূহ’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা পার্বত্য অঞ্চলের উন্নয়নে সমন্বয়ের ঘাটতি, জুমচাষের স্বীকৃতি, ভূমি অধিকার ও পানিসংকটসহ নানা চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করেছেন। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন ও প্রথম আলোর আয়োজনে এই বৈঠকে বক্তারা টেকসই উন্নয়নের জন্য রাজনৈতিক আস্থা ও সমন্বিত উদ্যোগের ওপর জোর দেন।
সমন্বয়ের ঘাটতি ও উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ
সাবেক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান এমপি বলেন, পার্বত্য অঞ্চলের উন্নয়নে অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলো সমন্বয়ের ঘাটতি। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, উন্নয়ন বোর্ড, জেলা পরিষদ ও বেসরকারি সংস্থা কাজ করলেও কার্যকর সমন্বয়ের অভাবে অনেক সময় একই কাজের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। পার্বত্য চুক্তির পর উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ হলেও তার সুফল প্রত্যাশিতভাবে অর্জিত হয়নি। তাই আঞ্চলিক পরিষদ ও জেলা পরিষদের ভূমিকা আরও কার্যকর করা এবং বিদ্যমান সমন্বয় কাঠামোর বাস্তবায়ন ও শক্তিশালীকরণ জরুরি।
তিনি আরও বলেন, পার্বত্য অঞ্চলের উন্নয়নে কৃষি, সড়ক, বাজার ও সরবরাহব্যবস্থাকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে, যাতে কৃষকেরা উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পান। একই সঙ্গে জমি, কৃষি ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে সমন্বয় জোরদার ও পার্বত্য চুক্তির ধারাগুলো বাস্তবায়নে কাজ করতে চাই।
জুমচাষের স্বীকৃতি ও কাপ্তাই হ্রদ
রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কাজল তালুকদার জুমচাষের স্বীকৃতির দাবি জানান। তিনি বলেন, জুমচাষ সরকারিভাবে স্বীকৃত না হওয়ায় চাষিরা সরকারি সুযোগ–সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। কৃষি বিভাগের অবহেলায় এই চাষ পিছিয়ে আছে, যদিও পার্বত্য অঞ্চলে হলুদসহ নানা ফসলের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। জুমচাষকে স্বীকৃতি না দিলে চাষিরা বঞ্চিতই থেকে যাবেন। তিনি প্রস্তাব দেন, এটিকে আউশ মৌসুমের আওতায় এনে উৎপাদনের হিসাব করা হোক।
কাপ্তাই হ্রদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি এখন মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশনের অধীনে থাকলেও জেলা পরিষদের নিয়ন্ত্রণে নেই। সেখানে মাছ উৎপাদন ও রাজস্ব বাড়ানোর সুযোগ থাকলেও কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায় না। তিনি মনে করেন, কাপ্তাই হ্রদ জেলা পরিষদের অধীনে আনা হলে রাজস্ব আহরণ বাড়বে, যা এলাকার উন্নয়ন কার্যক্রমে ব্যবহার করা যাবে।
রাজনৈতিক ও নীতিগত বাস্তবতা
পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য চঞ্চু চাকমা বলেন, শুধু উন্নয়ন প্রকল্প দিয়ে পার্বত্য অঞ্চলের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। মানুষের জীবন–জীবিকার বাস্তবতা ও বাধাগুলো চিহ্নিত করে সে অনুযায়ী উদ্যোগ নিতে হবে। পার্বত্য অঞ্চলের উন্নয়নকে শুধু প্রকল্প বা অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলে হবে না; এটিকে রাজনৈতিক ও নীতিগত বাস্তবতার আলোকে বিবেচনা করতে হবে। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি সমতল থেকে আসা মানুষের বাস্তবতাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। ভারত প্রত্যাগত বহু শরণার্থী পরিবার এখনো বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রয়েছে। তাঁদের পুনর্বাসন, ভূমি ও বসবাসের বিষয়গুলো সুরাহা না হলে টেকসই উন্নয়ন বাস্তবায়ন কঠিন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিশ্রুতি
ইউরোপীয় ইউনিয়নের ফার্স্ট কাউন্সেলর এডউইন কুক্ কুক্ বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশে দারিদ্র্য ও বৈষম্য হ্রাস এবং এসডিজি অর্জনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে চরম দারিদ্র্য এখনো বিদ্যমান, বিশেষ করে পার্বত্য তিন জেলা—বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির মতো পিছিয়ে পড়া জেলাগুলোতে। পার্বত্য চট্টগ্রামে উপযোগী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্যোগ প্রয়োজন। এ লক্ষ্যেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন ‘পার্টনারশিপ ফর রেজিলিয়েন্ট লাইভলিহুডস’ প্রকল্পে বিনিয়োগ করছে, যা প্রায় ২০ হাজার পরিবারের জীবিকা উন্নয়নে কাজ করছে।
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের ভূমিকা
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের জীবনজীবিকা এখনো দারিদ্র্য, কর্মসংস্থান ও বিকল্প জীবিকার অভাবে সংকটাপন্ন। দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তায় মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন ও স্থানীয় সহযোগী সংগঠনগুলো একটি বিশেষ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। ২০ হাজার দরিদ্র ও হতদরিদ্র পরিবারের জীবন–জীবিকার উন্নয়ন, পুষ্টিঘাটতি মোকাবিলা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে এই প্রকল্প কাজ করছে।
প্রকল্পের প্রোগ্রাম ম্যানেজার মেহের নিগার ভুঁইয়া বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের জীবন–জীবিকা উন্নয়নে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় ২০ হাজার পরিবারকে সহায়তা দিয়ে সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সম্ভব নয়; তাই সরকারি সহায়তা ছাড়া এই উদ্যোগ টেকসই করা যাবে না।
ইউএনডিপির মতামত
ইউএনডিপি বাংলাদেশের চিফ বিপ্লব চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রায় এক-চতুর্থাংশ সংরক্ষিত বন এবং কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পসহ বড় অংশ ব্যবহার অনুপযোগী হওয়ায় কার্যত অল্প জমিতেই জীবন–জীবিকা নির্ভরশীল। বন পুনরুদ্ধারে অন্তত ৫০ বছরের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন, যা পানির সংকট মোকাবিলায়ও সহায়ক হবে।
কৃষি বিভাগের চ্যালেঞ্জ
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে নতুন প্রযুক্তি সম্প্রসারণ ও আধুনিক চাষাবাদের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষি বিভাগের মূল কাজ নতুন প্রযুক্তি মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া। পার্বত্য অঞ্চলের কৃষির প্রধান চ্যালেঞ্জ পানির সংকট ও দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থা।
উপপরিচালক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, পাহাড়ি অঞ্চলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মূল কাজ নতুন ও টেকসই প্রযুক্তি কৃষকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। পার্বত্য অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে এনজিওগুলো কাজ করলেও সীমিত ও স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগ দিয়ে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি বাস্তবায়ন জরুরি।
প্রাণিসম্পদ বিভাগের বাস্তবতা
বান্দরবানের জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ড. জুলহাস আহমেদ বলেন, প্রাণিসম্পদ বিভাগ টিকাদান, চিকিৎসাসেবা, প্রশিক্ষণ ও খামার পরিদর্শনের কাজ করছে। বান্দরবানের ভৌগোলিক বাস্তবতায়, বিশেষ করে দুর্গম এলাকায় জনবলসংকট ও যোগাযোগ দুর্গমতার কারণে কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী সেবা পৌঁছে দেওয়া কঠিন। জনবলসংকট বড় চ্যালেঞ্জ। পাশাপাশি মোবাইল ভেটেরিনারি ক্লিনিকের আওতা বাড়ানো জরুরি।
প্রকল্পের অভিজ্ঞতা ও সুপারিশ
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের প্রজেক্ট কোঅর্ডিনেটর নিখিল চাকমা বলেন, বাংলাদেশের প্রায় ১০ শতাংশ ভূমি পার্বত্য চট্টগ্রামে হলেও সেখানকার জনসংখ্যা দেশের মাত্র ১ শতাংশের কিছু বেশি। কিন্তু ভূমির বড় অংশ সংরক্ষিত বন, চাষ অনুপযোগী পাহাড় ও জলাশয়ের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় জীবন–জীবিকার জন্য ব্যবহারযোগ্য জমি খুব সীমিত। প্রকল্পের অভিজ্ঞতায় প্রধান চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে জুমচাষিদের স্বীকৃতি না দেওয়া, প্রযুক্তি ও সম্প্রসারণসেবার সীমিত প্রবেশের সুযোগ, বাজারসংযোগের দুর্বলতা ও বিকল্প জীবিকায়নে অভাব।
দ্য ডেইলি স্টারের সিনিয়র সাংবাদিক জাগরণ চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে নিরাপত্তা, উন্নয়ন ও পর্যটন—এসব আলোচনা হলেও পাহাড়ের মানুষের বাস্তব জীবন নিয়ে আলোচনা কম হয়। পাহাড়ের সংকট অর্থনৈতিক নয়; আস্থা, রাজনৈতিক বিভাজন ও টেকসই ভবিষ্যতের সংকট।
আশিকা ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েটসের নির্বাহী পরিচালক বিপ্লব চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের জীবিকায়নের প্রধান ক্ষেত্র হলো গাছ, মাছ, বাঁশ, মিশ্র ফল, কৃষিপণ্য ও পর্যটন। তবে উৎপাদনকারীরা সরাসরি বাজারে প্রবেশের সুযোগ পান না; মধ্যস্বত্বভোগীরাই বেশি লাভবান হন।
পার্বত্য চট্টগ্রাম হেডম্যান নেটওয়ার্কের সাধারণ সম্পাদক শান্তি বিজয় চাকমা বলেন, পার্বত্য অঞ্চলে পানিসংকট এখন বড় বাস্তবতা। শুষ্ক মৌসুমে অনেক এলাকায় পানির উৎস শুকিয়ে যায় এবং দূষিত পানি ব্যবহারে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। জুমচাষিরা কৃষিঋণসহ নানা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
পিআরএলসি প্রকল্পের সুবিধাভোগী কাজলী তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, আগে প্রচলিত চাষাবাদে তেমন ফল পেতাম না, এখন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নানা রকম শাকসবজি ফলাতে পারছি। উৎপাদনও বেশি হচ্ছে। তবে এখনো বড় সমস্যা হলো পানির সংকট ও যোগাযোগের দুরবস্থা।



