রেমিট্যান্স: অর্থনীতির অপরিহার্য শক্তি নাকি গভীর ভ্রান্তি?
রেমিট্যান্স: অপরিহার্য শক্তি নাকি গভীর ভ্রান্তি?

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স এখন এক ধরনের 'অপরিহার্য শক্তি', কিন্তু একই সঙ্গে এক গভীর ভ্রান্তির উৎসও। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রেমিট্যান্স ৩০ বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রবাসী আয় প্রায় ৩০.৩২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে, যা আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রায় ২৩-২৪ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় উল্লেখযোগ্য (প্রায় ২৬-২৭ শতাংশ) বৃদ্ধি নির্দেশ করে। চলতি অর্থবছরেও এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে।

এই পরিসংখ্যান নিঃসন্দেহে অর্থনীতির জন্য স্বস্তির বার্তা বহন করে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই সাফল্য কতটা টেকসই, নাকি এটি এমন একটি বাস্তবতাকে আড়াল করছে, যা বাংলাদেশের মতো দেশের ভবিষ্যতে বড় সংকটের রূপ নিতে পারে? রেমিট্যান্স মূলত প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা—যা একদিকে পরিবারগুলোর জীবনধারণের ভিত্তি, অন্যদিকে রাষ্ট্রের বৈদেশিক মুদ্রার জোগানের একটি প্রধান উৎস। এই অর্থের মাধ্যমে আমদানি ব্যয় মেটানো সহজ হয়, বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য কিছুটা রক্ষা পায়, এবং মুদ্রার মান স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করে। এই অর্থে রেমিট্যান্স অর্থনীতির একটি 'ম্যাক্রোইকোনমিক সেফটি ভালভ' হিসেবে কাজ করে। কিন্তু এই সেফটি ভালভের সুইচ বাংলাদেশের হাতে নেই—এটাই এর সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা। কারণ এই আয় নির্ভর করে একটি বহিরাগত শ্রমবাজারের ওপর, যা সম্পূর্ণভাবে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও ভূরাজনীতির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।

অভিবাসনের অর্থনৈতিক কাঠামো

বাংলাদেশ থেকে বর্তমানে প্রায় ৮-১০ মিলিয়নের বেশি মানুষ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত। মধ্যপ্রাচ্য এখনো এই শ্রমবাজারের কেন্দ্রবিন্দু হলেও ইউরোপ, কানাডা, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়াতেও বাংলাদেশি অভিবাসীদের উপস্থিতি বাড়ছে। তবে বাস্তবতা হলো, মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত শ্রমিকদের বড় অংশই নিম্নদক্ষ এবং নিম্নমজুরির কাজে নিয়োজিত। এর ফলে তারা সংখ্যায় যতই বড় হোক না কেন, তাদের আয়ের সীমা নির্ধারিত থাকে। এই বাস্তবতা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে—আমরা কি উন্নয়নকে 'সংখ্যা' দিয়ে মাপছি, নাকি 'মান' দিয়ে?

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অভিবাসনের অর্থনৈতিক কাঠামো বিশ্লেষণ করলে এই সমস্যাটি আরও স্পষ্ট হয়। একজন শ্রমিককে বিদেশে যেতে গড়ে কয়েক লাখ টাকা ব্যয় করতে হয়, যার বড় অংশই দালালচক্র ও প্রভাবশালী রিক্রুটিং সিন্ডিকেটের হাতে যায়। এই অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে অনেক পরিবার ঋণের ফাঁদে পড়ে, জমি বিক্রি করে, কিংবা সামাজিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে যায়। বিদেশে গিয়ে সেই শ্রমিকের প্রথম কয়েক বছর কেটে যায় এই ঋণ শোধ করতে। ফলে যে রেমিট্যান্স দেশে আসে, তার একটি বড় অংশ আসলে 'উপার্জন' নয়, বরং 'ঋণ পুনরুদ্ধারের অর্থপ্রবাহ'।

রাজনৈতিক অর্থনীতি ও স্বার্থগোষ্ঠী

এই প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক অর্থনীতির প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিবাসন ব্যয় এত বেশি কেন? এই ব্যয় কে নিয়ন্ত্রণ করে? রাষ্ট্র কেন কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারছে না? বাস্তবতা হলো, এই পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে একটি শক্তিশালী স্বার্থগোষ্ঠী জড়িত, যারা এই উচ্চ ব্যয়কে টিকিয়ে রাখতে আগ্রহী। ফলে শ্রমিক রপ্তানি একটি নীতিনির্ভর কৌশল না হয়ে, অনেক ক্ষেত্রে একটি অনিয়ন্ত্রিত ও শোষণমূলক বাজারে পরিণত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক তুলনা

আন্তর্জাতিক তুলনা করলে এই সীমাবদ্ধতা আরও স্পষ্ট হয়। মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত শ্রমিকরা তাদের আয়ের বড় অংশ দেশে পাঠান, কারণ তাদের পরিবার বাংলাদেশে অবস্থান করে। কিন্তু ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা বা জাপানের মতো দেশে অভিবাসীরা পরিবারসহ স্থায়ী হয়ে গেলে রেমিট্যান্সের প্রবাহ কমে যায়। তবে এই অভিবাসীরা উচ্চ আয়ের অধিকারী এবং দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও জ্ঞান বিনিময়ের মাধ্যমে দেশের জন্য আরও বড় সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশ এখনো এই উচ্চদক্ষ অভিবাসন কাঠামো গড়ে তুলতে পারেনি। যার পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্নীতি এবং বিনিয়োগ পরিবেশে আস্থার ঘাটতি তৈরির কারণগুলো।

মানবসম্পদ হারানোর ঝুঁকি

এখানে একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব সামনে আসে—আমরা কি সত্যিই শ্রমিক রপ্তানি করছি, নাকি ধীরে ধীরে আমাদের মানবসম্পদ হারাচ্ছি? দক্ষতা উন্নয়ন ছাড়া জনশক্তিকে বিদেশে পাঠানো হলে তা অনিবার্যভাবে 'brain drain'-এ রূপ নেয়। স্বল্পমেয়াদে এটি রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ালেও, দীর্ঘমেয়াদে দেশের উৎপাদনশীলতা, উদ্ভাবনী সক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক গতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে প্রশ্নটি কেবল অর্থনৈতিক নয়, কৌশলগতও—এই মূল্য আমরা কতদিন বহন করতে পারব?

রেমিট্যান্সের ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা

দেশে রেমিট্যান্সের ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। দেশে আসা অর্থের বড় অংশ ভোগব্যয়ে ব্যবহৃত হয়—বাড়ি নির্মাণ, সামাজিক খরচ বা দৈনন্দিন জীবনে। উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের হার তুলনামূলকভাবে কম। ফলে এই অর্থ অর্থনীতির ভেতরে টেকসই প্রবৃদ্ধির ভিত্তি তৈরি করতে পারছে না। বরং এটি একটি বহুমুখী ভোগনির্ভর অর্থনৈতিক সংস্কৃতিকে আরও শক্তিশালী করছে।

নারী শ্রমিকদের প্রসঙ্গ

নারী শ্রমিকদের প্রসঙ্গ এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মধ্যপ্রাচ্যে গৃহকর্মী হিসেবে কর্মরত বহু নারী নির্যাতন, নিরাপত্তাহীনতা ও আইনি জটিলতার সম্মুখীন হন। সামাজিক ও পারিবারিক চাপে তারা অনেক সময় এসব বিষয় প্রকাশ করতে পারেন না। অথচ তাদের পাঠানো অর্থই বহু পরিবারকে টিকিয়ে রাখে। এই বৈপরীত্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়—রেমিট্যান্সের পেছনে কেবল অর্থনৈতিক হিসাব নয়, একটি গভীর মানবিক বাস্তবতাও রয়েছে।

ডায়াসপোরা আচরণ ও দ্বিতীয় প্রজন্ম

ডায়াসপোরা আচরণ দীর্ঘমেয়াদে রেমিট্যান্স প্রবাহকে প্রভাবিত করে। প্রথম প্রজন্মের অভিবাসীরা পরিবারের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে নিয়মিত অর্থ পাঠালেও, দ্বিতীয় প্রজন্মের সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রেমিট্যান্স কমার প্রবণতা তৈরি হয়। এই বিষয়টি এখনো আমাদের নীতিনির্ধারণে যথাযথ গুরুত্ব পায়নি।

বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা ও ঝুঁকি

সবশেষে আসে বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা এবং ঝুঁকির প্রশ্ন। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা গোটা বিশ্বের অর্থনীতির জন্য এখন একটি মারাত্মক চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে ইরানের উপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক আগ্রাসন এবং পরবর্তীতে উপসাগরীয় দেশগুলোতে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ইরানের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ব্যালিস্টিক আক্রমণের জেরে এই অঞ্চলে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। যার ফলে এই সংঘাত উপসাগরীয় অঞ্চলের শ্রমবাজারকে প্রভাবিত করেছে। এই অঞ্চলের নির্মাণ ও অবকাঠামো খাতে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি শ্রমিক নিয়োজিত রয়েছেন। যদি এই সংঘাত স্থায়ীভাবে বন্ধ না হয়, তাহলে এই খাত ধীর হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। অথবা অভিবাসন নীতির পরিবর্তনে কঠোরতা আসলে বাংলাদেশের অর্থনীতি সরাসরি চাপে পড়বে আগামি দিনগুলোতে। কারণ আমরা এই মধ্যপ্রাচ্যের আয়ের ওপর অনেকটা নির্ভরশীল, যার ওপর আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। তবে এর সঙ্গে আশার সংবাদ হলো—যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠন পর্বে নতুন শ্রমবাজার তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে এই অঞ্চলে, যা সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে কাজে লাগানো গেলে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।

সরকারের নীতিগত পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা

এই বাস্তবতায় সরকারের নীতিগত পরিবর্তন অনিবার্য। প্রথমত, দক্ষতা উন্নয়নকে কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে, যাতে উচ্চ আয়ের শ্রমবাজারে প্রবেশ সম্ভব হয়। দ্বিতীয়ত, অভিবাসন ব্যয়ের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হবে এবং দালালচক্র ও সিন্ডিকেটভিত্তিক নিয়োগব্যবস্থাকে ভেঙে স্বচ্ছ কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। তৃতীয়ত, রেমিট্যান্সকে ভোগ থেকে উৎপাদনে রূপান্তর করতে বিশেষ আর্থিক নীতি গ্রহণ করতে হবে—যেমন প্রবাসী বিনিয়োগ বন্ড, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য প্রণোদনা, এবং আঞ্চলিক বিনিয়োগ তহবিল।

সবচেয়ে বড় কথা হলো—রেমিট্যান্সকে 'সহজ অর্থ' হিসেবে দেখার প্রবণতা থেকে আমাদেরকে বেরিয়ে আসতে হবে। কারণ এই অর্থ যেমন একদিকে শক্তির উৎস, তেমনি অন্যদিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত। আজ যে রেমিট্যান্স অর্থনীতির প্রধান ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে, নীতিনির্ধারণে এই অন্ধত্ব অব্যাহত থাকলে সেটিই একদিন সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।

বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের বাস্তবতা বোঝাতে এই গল্পটি যথেষ্ট। গ্রামের এক গরীব যুবক কয়েক লাখ টাকা ঋণ নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে পাড়ি জমায়। পরিবারের কাছে সে হয়ে ওঠে ভাগ্য বদলের প্রতীক। কিন্তু বাস্তবে বিদেশে গিয়ে তার প্রথম কয়েক বছর কেটে যায় কেবল ঋণ শোধ করতেই। তার পাঠানো অর্থ আসলে সঞ্চয় নয়, বরং ঋণের কিস্তি। এই গল্প কোনো এক ব্যক্তির নয়; এটাই বাংলাদেশের রেমিট্যান্স অর্থনীতির নীরব, অপ্রকাশিত বাস্তবতা।