জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের মধ্যে বাংলাদেশে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি ২০২৬ সালের মে মাসে ৯.৪২ শতাংশে পৌঁছেছে, যেখানে খাদ্য মূল্যস্ফীতিও ৯ শতাংশের বেশি, জানিয়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চাল, ময়দা, ডিম, চিনি এবং ভোজ্য তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম গত এক বছরে ক্রমাগত বেড়েছে। তবে খাদ্যপণ্যের দামের এই তীব্র বৃদ্ধি সত্ত্বেও নিম্নস্তরের সিগারেটের দাম ততটা বাড়েনি। এই পার্থক্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ কারণ দেশের অধিকাংশ ধূমপায়ীই নিম্নতম মূল্যের সিগারেট ব্যবহার করেন। আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে সরকার প্রতি স্টিকে মাত্র ২০ পয়সা দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে, যা গত বছরের তুলনায় মাত্র ৩ শতাংশ বেশি।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা
বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, এই দাম সমন্বয় মূল্যস্ফীতির তুলনায় অনেক কম হওয়ায় নিম্নস্তরের সিগারেট ভোক্তাদের কাছে অত্যন্ত সাশ্রয়ী থাকবে। এর ফলে এই সেগমেন্টে সিগারেটের ব্যবহার বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাছাড়া উচ্চস্তরের সিগারেটের দাম বেশি বাড়ায় বাজেট-সচেতন ভোক্তারা সস্তা ব্র্যান্ডে চলে যেতে পারেন।
ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) বাজার তথ্য পরিবারের বাজেটের ওপর চাপের বিষয়টি স্পষ্ট করে। দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বছরে ৭ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। চালের দাম বিভিন্ন প্রকারে ৫ থেকে ৮ টাকা বেড়েছে। ভোজ্য তেলের বাজারেও অনুরূপ অস্থিরতা দেখা গেছে; ১ লিটারের সয়াবিন তেলের বোতল এখন ১৯৯ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা গত বছর ১৮৮ থেকে ১৯০ টাকা ছিল। অন্যদিকে ডালের দাম ৫ থেকে ১০ টাকা বেড়েছে। এই ক্রমবর্ধমান বাজারদরের বিপরীতে নিম্নস্তরের সিগারেটের দাম কার্যত স্থির রয়েছে। ১১ জুন উন্মোচিত বাজেট প্রস্তাবে নিম্নস্তরের সিগারেটের ১০ স্টিকের প্যাকের ন্যূনতম খুচরা মূল্য মাত্র ২ টাকা বাড়িয়ে ৬০ থেকে ৬২ টাকা করা হয়েছে।
মূল্যস্ফীতির তুলনায় অর্ধেক
এই প্রায় ৩ শতাংশ দাম বৃদ্ধির অর্থ হলো নিম্নস্তরের সিগারেটের দাম খাদ্য মূল্যস্ফীতির মাত্র এক-তৃতীয়াংশ হারে বাড়ছে। তুলনায় মধ্যম স্তরের সিগারেটের দাম ১৫ শতাংশ, উচ্চ স্তরের ব্র্যান্ডের দাম প্রায় ১৫ শতাংশ এবং প্রিমিয়াম স্তরের সিগারেটের দাম প্রায় ১৫ শতাংশ বাড়বে। এই অসামঞ্জস্যপূর্ণ মূল্য বৃদ্ধি সরকারের রাজস্বের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, কারণ নিম্নতম সেগমেন্টে সবচেয়ে বেশি ভোক্তা রয়েছে, যা রাজস্ব আয় এবং জনস্বাস্থ্য উভয় লক্ষ্যের জন্যই ক্ষতিকর।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতামত
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন, অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের সাথে সামঞ্জস্য রেখে সিগারেটের দাম না বাড়ানোর মাধ্যমে সরকার নিম্নস্তরের সিগারেটকে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রেখেছে। এই পণ্যগুলো অত্যন্ত সাশ্রয়ী থাকায়, বিশেষ করে নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য, রাষ্ট্রের তামাক নিয়ন্ত্রণ লক্ষ্য অর্জন করা অনেক কঠিন হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি গবেষণা ব্যুরোর (বিইআর) তামাক কর প্রকল্পের সিনিয়র প্রকল্প ও যোগাযোগ কর্মকর্তা ইব্রাহিম খলিল বলেন, “জীবনযাত্রার ব্যয় ও সাধারণ খরচ বাড়লেও নিম্নস্তরের সিগারেটের দাম স্থির থাকায় এগুলো প্রকৃত অর্থে আরও সাশ্রয়ী হয়ে উঠছে। এটি ধূমপায়ীদের নিরুৎসাহিত না করে বরং ব্যবহার বাড়াবে, যা তামাক নিয়ন্ত্রণ প্রচেষ্টা এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর আঘাত হানবে। আমার মতে, এই বাজেটে সিগারেটের মূল্য নির্ধারণ মৌলিকভাবে জনবিরোধী।”
জনস্বাস্থ্য কর্মী ও অর্থনীতিবিদরা একমত যে তামাক সস্তা থাকলে ধূমপান কমানো প্রায় অসম্ভব। তারা যুক্তি দেন যে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়লেও সস্তা সিগারেট সহজলভ্য থাকায় এটি দ্বৈত বাধা সৃষ্টি করে: এটি নতুন ধূমপায়ীদের নিরুৎসাহিত করতে ব্যর্থ হয় এবং বিদ্যমান ধূমপায়ীদের ধূমপান ছাড়তে নিরুৎসাহিত করে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নিম্নস্তরের তামাকের দাম বাড়ানোই জনস্বাস্থ্য রক্ষার একমাত্র কার্যকর উপায়। তারা ৩০ জুন বাজেট চূড়ান্ত হওয়ার আগে সরকারকে নিম্নস্তরের সিগারেটের মূল্য পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন।



