জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে ময়মনসিংহে মুদিদোকানের বিক্রি কমেছে ৪০%
ময়মনসিংহ নগরের আমলাপাড়া এলাকার মিল্ক পয়েন্ট অ্যান্ড ভ্যারাইটিজ স্টোরের মালিক মো. সারোয়ার হোসেনের দোকানে একসময় ক্রেতাদের ভিড় লেগে থাকত। কিন্তু জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর পরিস্থিতি বদলে গেছে। দোকানের বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিক্রিতে ভাটা পড়েছে। সারোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমার দোকানে আগে যা বিক্রি হতো, গত ঈদের পর থেকে ৪০ শতাংশ কমে গেছে। আগে ক্রেতার চাপ থাকলেও এখন বেশির ভাগ সময় বসে কাটাতে হয়।’
পণ্যমূল্য বৃদ্ধি ও ক্রেতাদের অস্বস্তি
সারোয়ার হোসেন উল্লেখ করেন, সাত দিন আগে ডিমের হালি ৩২ টাকা ছিল, যা এখন ৪২ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহও এক মাস ধরে বন্ধ রয়েছে। তিনি বলেন, ‘কোম্পানিগুলো তেল দিচ্ছে না, শুধু চাল ও আটার সঙ্গে অল্প তেল দেয়। এ কারণে বোতলের তেল আনা বন্ধ করে দিয়েছি।’ দোকানে আইসক্রিম কিনতে আসা অনামিকা রানী পালের মতো ক্রেতারা দাম বৃদ্ধিতে হতাশ। তিনি বলেন, ‘আমাদের আয় বাড়েনি, কিন্তু সব জিনিসের দাম বেড়ে যাচ্ছে। প্রয়োজনের তুলনায় কম কিনতে বাধ্য হচ্ছি।’
দুধের বিক্রি ও ব্যবসায়িক প্রভাব
জ্বালানিসংকটের ফলে সারোয়ার হোসেনের দৈনিক দুধের বিক্রিও কমেছে। আগে দৈনিক ৩০০ কেজি দুধ বিক্রি হতো, যা এখন ২০০ থেকে ২৫০ কেজিতে নেমে গেছে। তিনি বলেন, ‘জরুরি প্রয়োজন ছাড়া মানুষ কেনাকাটা করছে না।’ ময়মনসিংহের মেছুয়া বাজারের ফারুক স্টোরের মালিক অলিউর রহমানও একই সমস্যার কথা জানান। তাঁর দোকানে আগে দিনে ৫০ হাজার টাকা বিক্রি হতো, এখন তা ২০ থেকে ৩০ হাজারে নেমে গেছে।
বগুড়ায় সবজি বাজারে দামে ধস, কৃষকরা বিপাকে
বগুড়া সদর উপজেলার নুরইল গ্রামের কৃষক আবদুল মোমিনের জন্য পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। তিনি এক বিঘা জমিতে করলা, ঝিঙা, কাঁচা মরিচসহ নানা সবজি চাষ করেছেন। কিন্তু এক সপ্তাহের ব্যবধানে সবজির দাম অর্ধেকে নেমে এসেছে। আবদুল মোমিন বলেন, ‘এক সপ্তাহ আগে হাটে প্রতিমণ করলার দাম ছিল ২ হাজার ৮০০ টাকা। তেলের দাম বাড়ার পর এখন করলার দাম ৮০০ টাকায় নেমেছে।’ একইভাবে ঝিঙার দাম ২ হাজার টাকা থেকে ৫০০ টাকায় নেমে গেছে।
উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি ও কৃষকের দুর্ভোগ
শুধু দাম কমাই নয়, উৎপাদন খরচও বেড়ে গেছে। আবদুল মোমিনের হিসাব অনুযায়ী, সবজিখেতের প্রতি শতক জমিতে একবার সেচের খরচ ছিল ১০ টাকা, যা এখন ১৫ থেকে ২০ টাকা। সারের দাম প্রতি কেজিতে চার থেকে পাঁচ টাকা বেড়েছে। পলিথিনের দাম কেজিতে পাঁচ হাজার থেকে ছয় হাজার টাকা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘খরচ তোলাই কঠিন হয়ে পড়েছে।’ বগুড়ার মহাস্থান হাটে সবজির রেকর্ড সরবরাহ থাকলেও ব্যাপারিরা সস্তায় কিনছেন, ফলে কৃষকরা ক্ষতির মুখে।
পরিবহন খরচ ও বাজার পরিস্থিতি
মহাস্থান হাটের আড়তদার মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটে সবজি পরিবহনে ট্রাকের ভাড়া ছয় থেকে সাত হাজার টাকা বেড়েছে। এতে ব্যাপারিদের আগ্রহ কমে গেছে। বগুড়া সদর উপজেলার কৃষক নুরুল ইসলাম বলেন, ‘২০ শতক জমিতে করলা আবাদ করছি। এক সপ্তাহ আগে করলার কেজি ৫০ টাকায় বিক্রি করতাম, আজ ২৫ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে।’
শ্রমিকদের চাকরি হারানোর আশঙ্কা ও দৈনন্দন জীবনের সংকট
ঢাকার সাভার উপজেলার আশুলিয়ার একটি গার্মেন্টস কারখানার শ্রমিক মো. সামিউল ইসলামের কথায় উঠে এল আরেক দিক। তিনি বলেন, ‘আমি ওভারটাইম নিয়ে ২০-২৫ হাজার টাকা বেতন পাই। এই টাকা দিয়ে আগেই সংসার চালাতে পারতাম না, এখন দাম বাড়ায় বিপদ আরও বেড়েছে।’ ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রভাবে অনেক কারখানায় নতুন ক্রয়াদেশ না আসায় উৎপাদন কমছে, শ্রমিকরা চাকরি হারানোর আশঙ্কায়।
নারী শ্রমিকের উদ্বেগ ও ভবিষ্যৎ চিন্তা
আশুলিয়ার ভার্চুয়া বটম লিমিটেডের এক নারী শ্রমিক বলেন, ‘সাড়ে ১৪ হাজার টাকা বেতন পাই, স্বামী রিকশা চালায়। দুজনের আয় দিয়ে চলা কঠিন। যুদ্ধের কারণে বাজারে সবকিছুর দাম বাড়ছে। কারখানা বন্ধ হলে খাবো কী?’ লোডশেডিং ও জ্বালানি সংকটে কারখানার কাজ বন্ধ থাকায় মালিকরা ফ্যাক্টরি বন্ধের হুমকি দিচ্ছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সরকারি পদক্ষেপ ও সমাধানের দাবি
সামিউল ইসলামের মতো শ্রমিকরা সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। তিনি বলেন, ‘গার্মেন্টস যাতে বন্ধ না হয়, আগে থেকে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে সমস্যা সমাধানের ব্যবস্থা করা উচিত।’ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপরিচালক সোহেল মো. শামসুদ্দীন ফিরোজের মতে, বগুড়া অঞ্চলে গ্রীষ্ম মৌসুমে ৩ হাজার ৫১০ হেক্টর জমিতে ১০ হাজার ১৭০ মেট্রিক টনের বেশি সবজি উৎপাদিত হয়েছে, কিন্তু দাম কমায় কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত।
জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির এই প্রভাব শুধু মুদিদোকান বা সবজি বাজারেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি সমগ্র অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে। ব্যবসায়ী, কৃষক ও শ্রমিকসহ সাধারণ মানুষ চরম সংকটে পড়েছেন। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল করতে জরুরি পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে এই প্রতিবেদনে।



