আঙুর চাষে সাফল্য-ব্যর্থতার গল্প: কৃষকের আর্থিক ক্ষতি ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
আঙুর চাষে সাফল্য-ব্যর্থতা: কৃষকের আর্থিক ক্ষতি ও অনিশ্চয়তা

নওগাঁর সালাহ উদ্দিন ২০১২ সালে আঙুর চাষ শুরু করে সাফল্য পান। ক্রিমসন সিডলেস ও মেনিন্ডি সিডলেস জাতের আঙুরের থোকায় ৯০০ গ্রাম পর্যন্ত ফল ধরেছিল। স্বাদ ভালো থাকায় তিনি দুবার জাতীয় পুরস্কার পান। কিন্তু চার বছর পর মাটিবাহিত নেমাটোডের আক্রমণে গাছে ফল ধরা বন্ধ হয়ে যায়। নানা চেষ্টা করেও সমস্যা সমাধান করতে পারেননি। স্ট্রবেরি চাষ করে সাত লাখ টাকা আয় করলেও তা আঙুর চাষে বিনিয়োগ করে হারান। এখন মশার কয়েলের ডিলারশিপ করছেন। তাঁর আক্ষেপ, ‘কৃষি বিভাগ কৃষকের হাতে একটা জাত তুলে দেবে, এরপর কৃষকেরা উৎপাদনে যাবে—এটাই হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু আমাদের দেশে আবহাওয়ার উপযোগী একটা টেকসই জাত ও চাষপদ্ধতি খুঁজতেই কৃষকের জীবন শেষ।’

ইউটিউবের গল্পে বিভ্রান্ত কৃষক

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইউটিউবে সাফল্যের গল্প দেখে অনেক কৃষক যথাযথ পদ্ধতি না জেনেই আঙুর চাষে বিনিয়োগ করেছেন। ভালো জাতের সন্ধান না পাওয়া বা প্রযুক্তিগত সহায়তার অভাবে অনেকেই মাঝপথে থেমে গেছেন। বেশির ভাগ কৃষক কৃষি বিভাগের কার্যকর সহযোগিতা পাননি। ফলে নিজেদের অভিজ্ঞতা ও অন্যের পরামর্শের ওপর নির্ভর করে এগিয়েছেন। এতে দেশের বিভিন্ন এলাকা নতুন জাতের আঙুর চাষের পরীক্ষাগারে পরিণত হয়েছে।

সফলদের আয়ের উৎস চারা বিক্রি

যাঁদের সফলতার গল্প বেশি শোনা যাচ্ছে, তাঁদের অনেকের আয়ের বড় অংশ এসেছে ফলের চেয়ে চারা বিক্রি থেকে। ফল গবেষণার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব জাত নিয়মতান্ত্রিকভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অবমুক্ত করা হয়নি। ফলে এগুলোর উৎপাদন, রোগবালাই বা অভিযোজন সম্পর্কে সরকারি কোনো নিয়ন্ত্রণ বা নিশ্চিত তথ্য নেই।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নানা ফসলের অভিজ্ঞতা

মাঠপর্যায়ের কৃষকেরা বলছেন, উচ্চ মূল্যের নতুন ফসলের আশায় তাঁরা আগে ত্বিন ফল, সৌদি খেজুর, ভিয়েতনামের ডাব, পাম, চিয়াসিড, ব্ল্যাক রাইস, মাল্টাসহ বিভিন্ন ফসল চাষ করেছেন। কোথাও বাজার মেলেনি, কোথাও পোকামাকড়ের আক্রমণ হয়েছে, কোথাও প্রত্যাশিত ফলন আসেনি। কিন্তু ইউটিউবে সাফল্যের গল্প এত বেশি প্রচার হয়েছে যে অনেক কৃষক চারা কিনতে হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন।

সফল ও ব্যর্থ কৃষকের গল্প

কুড়িগ্রামের রুহুল আমিন ২০২০ সালে আঙুর চাষ শুরু করে দুই বছরের মধ্যে বাণিজ্যিক উৎপাদনে সফল হন। বর্তমানে তাঁর কাছে শতাধিক জাতের আঙুর আছে। তিনি বলেন, ২০২২ সাল থেকে প্রতিবছর প্রায় পাঁচ লাখ টাকার আঙুর বিক্রি করছেন। একই পরিমাণ অর্থ আসে চারা বিক্রি থেকেও। রাজশাহীর ইমাম হাসান সাগর এক বছরে চারা বিক্রি করেছেন প্রায় ১৫ লাখ টাকার এবং আঙুর বিক্রি করেছেন ১০ লাখ টাকার।

অন্যদিকে রাজশাহীর মনিরুজ্জামান ২০২৪ সালে এক বিঘা জমিতে ১০০টি চারা লাগান। ডাল ছাঁটাইয়ের সময় সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকায় প্রথম বছর ফুল আসেনি। পরের বছর প্রতিটি গাছে আট কেজি ফল আসলেও ঝড়ে মাচা ভেঙে পড়ে এবং পাখির আক্রমণে ফল নষ্ট হয়। দুই বছরে প্রায় চার লাখ টাকা ব্যয় করেও কোনো আয় করতে পারেননি। তাঁর অভিমত, ‘সরকারের কৃষি বিভাগ থেকে দেশের আবহাওয়া উপযোগী জাত ও চাষপদ্ধতি জানতে পারলে আঙুর নিয়ে কৃষকের এই দুর্ভোগ হতো না। বিশ্বাস করেন, দেশে মিষ্টি জাতের আঙুর চাষ করা সম্ভব। তবে এই করতে করতে সারা দেশই গবেষণার মাঠ হয়ে যাবে।’

কোনো যাচাই-বাছাই নেই

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) সদ্য বিদায়ী মহাপরিচালক মুহাম্মদ আতাউর রহমান বলেন, ‘আমাদের তো নির্দিষ্ট প্রটোকল আছে, বাইরের কোনো জিনিস যদি ভালো করে সেটা দেশে চাষ করার ও দেশের ভেতরে রিলিজ দেওয়ার নির্দিষ্ট পন্থা আছে। নিয়ম হচ্ছে, যদি কোনো জাতের সম্ভাবনা থাকে তাহলে আমাদের সংশ্লিষ্ট ফল বিভাগের মাধ্যমে আমদানি ও অভিযোজন করার জন্য বিভিন্ন আঞ্চলিক কেন্দ্রে ট্রায়াল করে রোগবালাই, পোকামাকড়ের আক্রমণ, পুষ্টিগুণ ইত্যাদি বিচার–বিশ্লেষণ করে আমরা সিদ্ধান্ত নেব যে জাতটা কোন এলাকায় চলবে। এখন যা হচ্ছে কোনোটাই যাচাই-বাছাই হয়নি।’

এভাবে আঙুর চাষের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এখন জুয়াখেলার মতো হবে। কেউ লাভবান হবে, কেউ পথে বসে যাবে। আমাদের দেশে তো ওই ধরনের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। অন্য দেশে ধান আবাদ করতে গেলেও সরকারি অনুমতি লাগে। জাপান সরকার এক বছর যদি কাউকে ধান আবাদ করতে দেয়, আরেক বছর তাঁকে দেয় না। বসিয়ে রাখে।’