ফরিদপুরের সালথা ও নগরকান্দা উপজেলায় অব্যাহত বিদ্যুৎ–সংকটের কারণে এয়ারফ্লো মেশিন ঠিকমতো কাজ করছে না। ফলে কৃষকের ঘরে মজুত করে রাখা পেঁয়াজ পচে যাচ্ছে। একদিকে বাজারে পেঁয়াজের দাম কম, অপরদিকে মজুত পেঁয়াজ পচে যাওয়ায় দ্বিমুখী সংকটে পড়েছেন স্থানীয় পেঁয়াজচাষিরা। তাঁরা বলছেন, দ্রুত বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি না হলে বড় ধরনের লোকসান গুনতে হবে।
কীভাবে সংকট তৈরি হলো
ফরিদপুরে বাণিজ্যিকভাবে সবচেয়ে বেশি পেঁয়াজ আবাদ হয় সালথা ও নগরকান্দা উপজেলার ১৮টি ইউনিয়নে। যুগ যুগ ধরে এখানকার কৃষকেরা পেঁয়াজ চাষের মাধ্যমে জীবনমানের উন্নয়ন করে আসছেন। প্রতিবছরের মতো এবারও তাঁরা বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ আবাদ করেছেন। এবার পেঁয়াজের আকারও বড় হয়েছে। এ কারণে অল্প গরমে পেঁয়াজ দ্রুত পচে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন কৃষকেরা। লাভের স্থলে তাঁদের সামনে এখন লোকসান উঁকি দিচ্ছে।
কৃষকের বক্তব্য
নগরকান্দা উপজেলার কৃষক কবির শেখ বলেন, ‘পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য আমাদের পর্যাপ্ত হিমাগার বা আধুনিক গুদাম নেই। তাই বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। সংরক্ষণের সুযোগ থাকলে আমরা ভালো দামের জন্য অপেক্ষা করতে পারতাম।’
সালথার দাউদ মাতুব্বর নামের এক কৃষকের ভাষ্য, বর্তমানে প্রতি মণ পেঁয়াজ ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, অথচ উৎপাদন খরচই ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা। সংরক্ষণ ব্যয় যোগ হলে পুরোপুরি লোকসান গুনতে হচ্ছে। আবুল মাতুব্বর নামের আরেক কৃষক বলেন, কৃষকের এ দুর্দশার কার্যকর উদ্যোগ নিতে দেখা যাচ্ছে না। ন্যায্যমূল্য না পেলে পেঁয়াজ চাষ থেকে সরে যেতে বাধ্য হবেন অনেক কৃষক। বাজারে যে দাম, তাতে শ্রমিকের মজুরিও ওঠে না। অনেক কৃষক ঋণ নিয়ে চাষ করেছেন। তাঁরা এখন কিস্তি পরিশোধ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন।
বিদ্যুৎ সরবরাহ ও এয়ারফ্লো মেশিনের সমস্যা
সালথা ও নগরকান্দা উপজেলার একাধিক কৃষক জানিয়েছেন, এবার নানা জাতের বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে। তবে এর মধ্যে বেশির ভাগ হাইব্রিড জাতের পেঁয়াজ। এই হাইব্রিড পেঁয়াজ কোনোভাবে ঘরে রাখা যাচ্ছে না। এমনকি সংরক্ষণের জন্য সরকারিভাবে যে ঘরগুলো তৈরি করে দেওয়া হয়েছে, পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকায় সেখানেও পেঁয়াজ সংরক্ষণ করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। অতিরিক্ত গরম আর সংরক্ষণব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে পেঁয়াজ পচে যাচ্ছে। আর বাজারে পেঁয়াজের যে দাম, তাতে উৎপাদন খরচও ঘরে তোলা যাচ্ছে না।
সালথার কৃষক মোহাম্মদ আলী জানান, সরকারি এয়ারফ্লো মেশিন ব্যবহারের পর পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল না হওয়ায় প্রতিদিন সংরক্ষণ করা পেঁয়াজ পচে নষ্ট হয়ে যায়। পরে বাধ্য হয়ে পচা পেঁয়াজ ফেলে দিতে হচ্ছে।
আটঘর ইউনিয়নের খোয়াড় গ্রামের কৃষক মাফিকুল ইসলাম জানান, পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য এয়ারফ্লো মেশিন সার্বক্ষণিক চালু থাকার দরকার। কিন্তু সম্প্রতি বিদ্যুতের লোড শেডিং যে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে, তাতে ওই যন্ত্রগুলো ঠিকমতো কাজ করছে না। এ ছাড়া এবার বিগত বছরগুলোর তুলনায় পেঁয়াজের ফলন হয়েছে মাত্রাতিরিক্ত। এসব পেঁয়াজ সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে না পারায় পচন দেখা দিয়েছে।
কৃষকদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ–সংকটের কারণে সরকারিভাবে দেওয়া এয়ারফ্লো মেশিন অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত ফল দিচ্ছে না। রাত-দিন ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিদ্যুৎ থাকে মাত্র ২ থেকে ৩ ঘণ্টা। এই বিদ্যুৎ দিয়ে কোনোভাবেই পেঁয়াজ সংরক্ষণ করে রাখা সম্ভব নয়। বিদ্যুৎ না থাকায় বাতাস চলাচল বন্ধ হয়ে পচন দ্রুততর হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের অবস্থা
সালথা উপজেলার পাইকারি ক্রেতা সুজন মাতুব্বর বলেন, পেঁয়াজের দাম কম হওয়ায় কৃষকদের পাশাপাশি ব্যবসায়ীদেরও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। কম দামে কিনলেও অন্যান্য বাজারে বিক্রি করতে গিয়ে ভালো মূল্য পাওয়া যাচ্ছে না। দাম কিছুটা বাড়লে কৃষক যেমন লাভবান হতেন, তেমনি ব্যবসায়ীরাও ব্যবসা সচল রাখতে পারতেন।
সরকারি উদ্যোগ ও তথ্য
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এবার ফরিদপুরে পেঁয়াজের আবাদ বেশি হয়েছে। ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে জেলায় পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়েছিল ৫ লাখ ৯৩ হাজার ২৩৯ টন, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে পেঁয়াজের উৎপাদন হয়েছে ৭ লাখ ৫১ হাজার ৬৩৫ টন। পেঁয়াজ সংরক্ষণে কৃষকদের সহায়তায় ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে জেলায় পেঁয়াজচাষিদের ১ হাজার ৪৩০টি এয়ারফ্লো মেশিন বিতরণ করা হয়েছে। প্রতিটি মেশিনে ১০ টন পেঁয়াজ সংরক্ষণ করা যায়। চলতি বছর ইতিমধ্যে আরও ৭০০টি মেশিন বিতরণ করা হয়েছে। এ ছাড়া আগামী দিনে আরও প্রায় আড়াই হাজার মেশিন সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংরক্ষণ সুবিধা বাড়ানো গেলে কৃষকেরা তাৎক্ষণিকভাবে কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হবেন না, এ লক্ষ্যেই উদ্যোগটি নিয়েছে কৃষি বিভাগ।
কৃষি কর্মকর্তাদের মতামত
ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. শাহাদুজ্জামান জানান, এয়ারফ্লো মেশিন কার্যকর রাখতে বিদ্যুতের সরবরাহ নিশ্চিত হওয়া জরুরি। এ মেশিনগুলোর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে একনাগারে তিন–চার ঘণ্টা বিদ্যুৎ প্রবাহ নিশ্চিত করার পর এক ঘণ্টা বন্ধ রাখা। আধুনিক যে মেশিনগুলো সরবরাহ করা হয়েছে, সেগুলো সময় ঠিক করে অটো সেন্সর যুক্ত করা। বিদ্যুতের সরবরাহ নিশ্চিত করা এসব মেশিনের কার্যকারিতা রক্ষার জন্য অপরিহার্য বলে তিনি জানান।
কৃষি কর্মকর্তা শাহাদুজ্জামান আরও বলেন, চলতি বছর পেঁয়াজের আকার স্বাভাবিক পেঁয়াজের তুলনায় বড় হয়েছে। পেঁয়াজ বড় হলে তাতে স্বাভাবিকভাবেই পানির পরিমাণ বেশি থাকে, আর পানির পরিমাণ বেশি হলে পেঁয়াজের সংরক্ষণক্ষমতাও কম থাকে।
ফরিদপুরের জ্যেষ্ঠ কৃষি বিপণন কর্মকর্তা সাহাদাত হোসেন বলেন, পেঁয়াজ কত দিন সংরক্ষণ করা যাবে, তা নির্ভর করে পেঁয়াজের জাতের ওপর। চলতি বছর পেঁয়াজের জাতের কারণে পেঁয়াজের আকার বড় হয়েছে, যা বেশি দিন সংরক্ষণ করা যায় না। পাশাপাশি পেঁয়াজ উত্তোলনের সময় বৃষ্টির কারণে পেঁয়াজে পানির উপস্থিত বেশি ছিল, ফলে পেঁয়াজ সংরক্ষণ করতে সমস্যা হচ্ছে।



