আকাশে মেঘ। চারদিকে অন্ধকার হয়ে আসছে। মনে হচ্ছে, দূরে কোথাও বৃষ্টি হচ্ছে। ধেয়ে আসছে এদিকে। সেই মেঘের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দৌড়াচ্ছেন কল্পনা খালকো (২৫)। দুই হাতে ধানের দুটি আঁটি। সঙ্গে দৌড়াচ্ছে তাঁর ১০ বছর বয়সী মেয়ে বৃষ্টি কুজুর। বৃষ্টি আসার আগেই তাঁদের জমির ধান আলের ওপরে তুলতে হবে। তা ছাড়া শুকানো ধান সব ভিজে নষ্ট হয়ে যাবে।
গত বুধবার বিকেলে তানোর উপজেলার জোতগরীব মাঠে মা-মেয়ের এই দৌড় দেখা যায়। কল্পনার স্বামীর নাম পরিমল কুজুর। কাজের সঙ্গে সঙ্গে কল্পনা তাঁর জীবনের গল্পও শোনালেন। তাঁর বাবার বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলের রাজবাড়ী গ্রামে। তিনি পরিমলের দ্বিতীয় স্ত্রী।
সংসারের লড়াই
প্রথম পক্ষের একটি ছেলে ও একটি মেয়ে হওয়ার পর সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হন পরিমল কুজুর। তারপর আর কাজ করতে পারেন না। এ অবস্থা দেখে তাঁর প্রথম স্ত্রী দুই সন্তানসহ পরিবার ফেলে ভারতে চলে যান। সেখানে নতুন করে বিয়ে করে ঘর-সংসার শুরু করেন। তারপর কল্পনার সঙ্গে বিয়ে হয়। কল্পনারও এক ছেলে ও এক মেয়ে হয়েছে। ছেলেটা ছোট।
কল্পনা খালকো প্রথম আলোকে বলেন, আগের পক্ষের ছেলে–মেয়ে দুটিকে তিনি নিজেই মানুষ করেছেন। মেয়েটাকে বিয়ে দিয়েছেন। ছেলেটা একটু ভবঘুরে। কাজকাম করে না। ঘুরে বেড়ায়। তিনি মেয়েটাকে সঙ্গে করে মাঠে দৌড়াদৌড়ি করেন। নিজের কোনো জমি নেই। এক বিঘায় চার মণ ধান দেওয়ার শর্তে দুই বিঘা জমি ইজারা নিয়ে ধান চাষ করেছিলেন। এই ধান চাষ করতে ১০০ টাকা ঘণ্টা হিসাবে গভীর নলকূপ থেকে পানি নিয়ে সেচ দিয়েছেন। ধান লাগানোর সময় দুই বিঘা জমি ভেজাতে সারা রাত লেগেছে। সংসার চালাতে এই লড়াই করে যাচ্ছেন।
মেয়ের ভবিষ্যৎ
কল্পনার মেয়ে বৃষ্টি এখন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ছে। মেঘ দেখে সে মায়ের সঙ্গে দৌড়ে মাঠে এল। তাদের সম্প্রদায়ে ছোটবেলায় মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। কল্পনা তার মেয়েকে অল্প বয়সেই বিয়ে দেবেন কি না, জানতে চাইলে বলেন, তিনি মেয়েকে প্রাপ্তবয়স্ক হলেই বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবেন। অসুস্থ পরিমলকে বিয়ের কারণ জানতে চাইলে কল্পনা হেসে বলেন, ‘ও যখন বিহে করতে চাহাছে, তখন ওর সাহস আছে। মানে ভাত–কাপড় দিতে পারবে। আমি মনে কইরেছি ওইটাই ছিল আমার সাহস।’ কিন্তু এখন তাঁর স্বামী প্রায় প্রতিবন্ধী। ঠিকমতো কাজ করতে পারেন না। বাড়ির পাশে একটা চায়ের দোকান করে দিয়েছেন। আর তাঁরা মা-মেয়ে মাঠে ফসল ফলানোর জন্য লড়াই করে যাচ্ছেন।
ধান বাঁচানোর তাড়া
কয়েক দিন আগে ধান কেটে মাঠেই শুকাতে দিয়েছিলেন। সেই ধান শুকিয়ে গেছে। এখন বাড়িতে নিয়ে মাড়াই করার পালা। এর মধ্যে বৃষ্টি হলে অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে। সে জন্যই দৌড়াদৌড়ি করে ধানের আঁটিগুলো উঁচু আলের ওপরে স্তূপ করে রাখছেন। তিনি বলেন, জিরা ধানের ফলন ভালো হয়। এটা ব্রি-ধান ৭৬। ফলন ভালো হয় না। বড়জোর বিঘায় ১৫ মণ হতে পারে।
কথা বলার প্রায় ৪০ মিনিট পর বৃষ্টি নামল। ততক্ষণে মা-মেয়ে দুজনে মিলে ধানের আঁটিগুলো আলের ওপরে তুলে ফেললেন। এটা ছিল মা-মেয়ের এক রুদ্ধশ্বাস লড়াই।



