বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নদী করতোয়া বর্তমানে মৃতপ্রায় অবস্থায় রয়েছে। নীলফামারী, রংপুর, দিনাজপুর ও বগুড়া জেলা দিয়ে প্রবাহিত এই নদীটি ৩৬টি ছোট নদীর পানি বহন করেও উজানের একটি স্লুইসগেটের কারণে পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। নদী রক্ষাবিষয়ক সংগঠন রিভারাইন পিপলের পরিচালক ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক তুহিন ওয়াদুদ এক কলামে এ তথ্য জানিয়েছেন।
করতোয়া নদীর উৎস ও প্রবাহ
করতোয়া নদী আসলে তিনটি নদীর সমন্বয়ে গঠিত। উজানের অংশটি দেওনাই, মধ্যবর্তী অংশ যমুনেশ্বরী এবং ভাটির অংশ করতোয়া নামে পরিচিত। নীলফামারী জেলার ডোমার উপজেলায় দেওনাই নদের উৎপত্তি। এর উৎস ভারতের পাংঘা ও খোড়ুয়া নদী, যা মিলিত হয়ে দেওনাই নাম ধারণ করে। রিভারাইন পিপলের সমন্বয়কারী আবদুল ওয়াদুদের গবেষণায় এ তথ্য প্রথম প্রকাশিত হয়।
প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে রংপুরের পীরগঞ্জ থেকে এই নদী করতোয়া নামে প্রবাহিত হয়। বগুড়ার ওপর দিয়ে প্রবাহিত করতোয়া নদী ঐতিহাসিক পুণ্ড্রনগরী সভ্যতার সাক্ষী। ১৭৮৭ সালের ভয়াবহ বন্যায় এর গতিপ্রকৃতি বদলে গেলেও ৩৬ নদীর পানি নিয়ে প্রবাহ স্বাস্থ্যবান ছিল।
স্লুইসগেট: নদী হত্যার মূল কারণ
প্রশ্ন হলো, এতগুলো নদীর পানি একসঙ্গে প্রবাহিত হওয়ার পরও বগুড়ায় করতোয়া নদীতে পানি নেই কেন? তুহিন ওয়াদুদের মতে, করতোয়া নদীটির হত্যাকারী প্রতিষ্ঠানের নাম পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার খুলসী নামক স্থানে ৮-১০ ফুট প্রস্থের একটি স্লুইসগেট দেওয়া হয়েছে। বাস্তবে সেখানে করতোয়া নদী ছিল অন্তত ৩০০ ফুট। ৩০০ ফুট নদীর পানি যখন মাত্র ৮-১০ ফুট স্লুইস গেট দিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, তখন কার্যত বগুড়ায় আর উজানের পানি যায় না। এই পানি কাটাখালী-বাঙালী নদী হয়ে প্রবাহিত হয়।
তিনি আরও বলেন, 'গলা টিপে একটি নদীকে মেরে ফেলে সেটিকে বাঁচানোর চেষ্টা ছাড়াই আবার সেই নদীতে প্রকল্প গ্রহণ যথাযথ মনে হয় না। পাউবোতে দেশের অসংখ্য মেধাবী আছেন। বুয়েটসহ দেশের নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে লেখাপড়া প্রকৌশলীদের প্রতিষ্ঠান যখন নদী হত্যাকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়, তখন এই দুঃখ বর্ণনার ভাষা থাকেন না।'
প্রকল্পের অকার্যকারিতা
বগুড়ায় করতোয়া নদী সুরক্ষার জন্য ১ হাজার ১৯৪ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। তবে তুহিন ওয়াদুদের মতে, এই প্রকল্প ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো কাজে আসবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত করতোয়ায় পানির প্রবাহ ফেরানো না যায়। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, কিন্তু তা আলোর মুখ দেখেনি। বর্তমান সরকার ১ হাজার ৯৪ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করেছে। স্লুইস গেট বর্তমান অবস্থায় রেখে নদীটির সুরক্ষা একেবারেই অসম্ভব বলে তিনি মন্তব্য করেন।
নদী বাঁচানোর উপায়
তুহিন ওয়াদুদ প্রশ্ন তুলেছেন, 'খুলসী স্লুইসগেট অপসারণ করে করতোয়া নদীর পানিপ্রবাহ সচল করতে কি হাজার হাজার কোটি টাকা লাগবে? নাকি এটি পাউবোর প্রকল্প গ্রহণের হাতিয়ার?' তিনি বলেন, 'করতোয়া নদীতে বড় প্রকল্প গ্রহণ করা না করার সঙ্গে স্লুইসগেট অপসারণ, কিংবা দখল-দূষণ রোধ করার কোনো সম্পর্ক নেই। আগে করতোয়া বাঁচানো হোক, পরে বড় প্রকল্প!'
বাংলাদেশে করতোয়া নদী একটি বড় দৃষ্টান্ত। উজানে প্রায় ৩৬টি নদীর পানি নিয়ে প্রবাহিত হলেও পাউবো কত সহজে সেই নদী মেরে দিতে পারে। এ রকম অসংখ্য নদীকে পাউবো মেরেছে। দীর্ঘদিন ধরে নদী নিয়ে অনেক কথা হলেও পাউবো, তথা সরকারের স্লুইসগেট অপসারণে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেই।



