রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার ঈশ্বরীপুর গ্রামে একটি মুরগির খামারকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ মাছির উপদ্রব ও দুর্গন্ধে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে স্থানীয় জনজীবন। গ্রামবাসীদের অভিযোগ, খামারে জমে থাকা মুরগির বর্জ্য থেকে ছড়িয়ে পড়া দুর্গন্ধ ও মাছির কারণে স্বাভাবিক জীবনযাপন কঠিন হয়ে উঠেছে। এমনকি অনেক মেয়ে-জামাইও এখন আর শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে আসতে চান না।
খামারের বর্জ্যে গ্রামজুড়ে মাছির উৎপাত
খামারটির মালিক মো. স্বপন। মঙ্গলবার (২৩ জুন) খামারটিতে গিয়ে দেখা যায়, জমে থাকা মুরগির বিষ্ঠার স্তূপ থেকে ছড়াচ্ছে তীব্র দুর্গন্ধ। খামারের ভেতর ও আশপাশে উড়ছে অসংখ্য মাছি। এসব মাছি উড়ে যাচ্ছে গ্রামের বাড়িতে বাড়িতে। গ্রামবাসী বলছেন, মাছির উপদ্রবে খাবার সংরক্ষণ, রান্নাবান্না কিংবা স্বাভাবিকভাবে খাওয়াদাওয়া করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
দেওপাড়া ইউনিয়নের এই গ্রামে প্রায় ১২০টি পরিবারের ৬৪২ জন মানুষ বসবাস করেন। স্থানীয়দের দাবি, গত তিন মাস ধরে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। খামারের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অবহেলার কারণে মাছির সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে এবং পুরো গ্রামজুড়ে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে।
প্রশাসনের তদন্তে সত্যতা পেলেও ব্যবস্থা নেয়নি কর্তৃপক্ষ
গ্রামবাসীর অভিযোগের ভিত্তিতে গত মে মাসে তদন্ত করে উপজেলা প্রশাসন। এতে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়। আইনি ব্যবস্থা নিতে তদন্ত প্রতিবেদন পরিবেশ অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাই খামারের দুর্গন্ধ ও মাছির উপদ্রবে বিপর্যস্ত রয়েছে স্থানীয় জনজীবন। খামারে দীর্ঘদিন ধরে মুরগির বিষ্ঠা জমিয়ে রাখা এবং দুর্গন্ধনাশক ব্যবহার না করায় গ্রামে এখন টেকা মুশকিল হয়ে পড়েছে।
গ্রামের বাসিন্দা রোহেনা বেগম বলেন, ‘তরকারি রান্না করে রাখার উপায় নেই। খাবার পরিবেশন করলেই ভাতের প্লেট-তরকারিতে মাছি এসে পড়ে। কিছুদিন আগে মেয়ে-জামাই এসেছে। তাদের খেতে দিয়েছি। প্লেটে চারটা-পাঁচটা করে মাছি এসে বসছে। এই দেখে জামাই খেতেই পারল না। আমার চোখ দিয়ে পানি বের হয়ে গেল। এখন মেয়ে-জামাই আসেই না।’
অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান জন্ম দেওয়া গৃহিণী লিপি খাতুন বলেন, ‘ছোট বাচ্চার শরীর ও মুখে সব সময় মাছি বসে থাকে। বাধ্য হয়ে সারাক্ষণ মশারি টাঙিয়ে রাখতে হচ্ছে। ঘরে কোনো খাবার রাখলেই মাছি ভিড় করে। বাচ্চাকে নিয়ে খুবই দুশ্চিন্তায় আছি।’
আত্মীয়স্বজনের আসা-যাওয়া বন্ধ, রোগের আশঙ্কা
স্থানীয় বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম জানান, মাছির উপদ্রবে গত কয়েক মাস ধরে আত্মীয়স্বজনদের আসা-যাওয়া কমে গেছে। খাবারের ওপর মাছি বসে যাওয়ায় স্বাভাবিক খাওয়াদাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। অস্বস্তির কারণে গ্রামের মেয়ে-জামাইও এখন আর শ্বশুরবাড়িতে আসেন না। একই সঙ্গে রোগবালাই ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও বাড়ছে।
গ্রামবাসীরা জানান, বিষয়টি নিয়ে তারা জেলা প্রশাসন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং পরিবেশ অধিদপ্তরে একাধিকবার অভিযোগ করেছেন। অভিযোগের পর সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের প্রতিনিধিরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং উপজেলা প্রশাসন তদন্ত পরিচালনা করে। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার নেতৃত্বে করা তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খামারের বর্জ্য থেকে ছড়ানো দুর্গন্ধ ও মাছির কারণে স্থানীয় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। নিয়মিত দুর্গন্ধনাশক ব্যবহার না করায় পরিবেশদূষণ আরও বেড়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তর আইনি ব্যবস্থার আশ্বাস
তদন্ত শেষে প্রতিবেদনটি পরিবেশ অধিদপ্তরের রাজশাহী কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক তাছমিনা খাতুন বলেন, ‘গোদাগাড়ী উপজেলা প্রশাসনের তদন্ত প্রতিবেদন আমরা পেয়েছি। ইতিমধ্যে খামারের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, দুর্গন্ধ নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশগত অনুমোদনের বিষয়গুলো যাচাই করা হয়েছে। সেখানে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ও বিধিমালা লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। চলতি সপ্তাহের মধ্যেই খামারমালিকের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত খামারের জমে থাকা বর্জ্য অপসারণ, মাছি ও দুর্গন্ধ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা না হলে এলাকায় বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সংকট দেখা দিতে পারে। তবে অভিযোগের বিষয়ে খামারমালিক মো. স্বপনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।



