নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার মমিনপুর হাটে প্রতিদিন কোটি টাকার মরিচ বেচাকেনা হলেও সরকার রাজস্ব পাচ্ছে না। কৃষকরা বাধ্য হয়ে আড়তদারদের বেঁধে দেওয়া দামে এবং ৪২-৪৫ কেজিতে মণ হিসেবে মরিচ বিক্রি করছেন, ফলে ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সিন্ডিকেট করে প্রতিদিন লাখ টাকা ভাগবাটোয়ারা করে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে কয়েকজন প্রভাবশালীর বিরুদ্ধে। রহস্যজনক কারণে কর্তৃপক্ষ আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছে না, যদিও প্রশাসন বলছে তদন্ত চলছে।
হাটের পটভূমি ও বর্তমান অবস্থা
সফাপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের তথ্যমতে, ২০২২ সালে স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি মহাদেবপুর উপজেলার সফাপুর ইউনিয়নের মমিনপুর গ্রামে মরিচের হাটটি বসান। প্রতিবছর জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চালু থাকে এই হাট, যা ৫ বছর ধরে চলছে। মরিচের অফ সিজনে হাট বন্ধ থাকে। ২০২৪ সালের ২০ জুন ৪৮ নম্বর স্মারকে সফাপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিস থেকে মমিনপুর মোড়ে হাটের প্রস্তাব প্রেরণ করা হয়, যার মহাদেবপুর উপজেলা ভূমি অফিসের ২৪ জুন ২০২৪ তারিখের স্মারক নম্বর ১০৭৮। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় হাট সৃজনের প্রস্তাব এখনো আলোর মুখ দেখেনি; বিষয়টি সরকারি ফাইলে লাল ফিতায় বন্দি রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করেই চলছে এই অবৈধ হাট।
সিন্ডিকেটের কার্যক্রম ও অর্থলগ্নি
জানা গেছে, ২০২২ সাল থেকে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নিয়ে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পর্যন্ত নিজেকে সভাপতি দাবি করে হাটটি নিয়ন্ত্রণ করতেন পাহাড়পুর জিতেন্দ্রনাথ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সুলতানপুর এলাকার তারিকুল ইসলাম পলাশ। এ চক্রের সদস্য সংখ্যা ১৫-২০ জন। প্রতিবছর মরিচের সিজনে তাদের পকেটে যাচ্ছে ৪৫-৫০ লাখ টাকা। চক্রের সদস্যরা অত্যন্ত প্রভাবশালী হওয়ায় এদের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস করে না কেউই। অভ্যুত্থানের পর পলাশের বন্ধু সফাপুর ইউপি চেয়ারম্যানের ভাই সাদেকুল ইসলাম নিজেকে সভাপতি দাবি করে হাটটি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে পরিচালনা করছেন। আড়তদারদের কাছ থেকে অবৈধভাবে বস্তাপ্রতি ৪০ টাকা হারে খাজনা আদায় করা হচ্ছে।
কৃষকদের বক্তব্য ও ক্ষোভ
কৃষক আব্দুল আজিজ বলেন, "এটি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রিত হাট। বাধ্য হয়ে এখানে মরিচ বিক্রি করতে হয়। যে দামে মরিচ কেনা হচ্ছে, তাতে উৎপাদন খরচ উঠবে না।" হাটে মরিচ বিক্রি করতে আসা চকগড়া গ্রামের কৃষক ইয়াদ আলী বলেন, "গ্রামের পাশে হাট হওয়ায় মরিচ বিক্রি করতে আসা। প্রতি কেজি ১৮-২২ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া আড়তদাররা ৪২-৪৪ কেজিতে মণ হিসেবে ওজন নিচ্ছে। ব্যবসায়ীরা এক জোট হয়ে মরিচ ক্রয় করায় তারা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।"
আড়তদারদের দাবি ও প্রতিক্রিয়া
হাটের মুরাদ হোসেনসহ ৪-৫ জন আড়তদার বলেন, প্রতিদিন প্রায় ৮০-৯০ মেট্রিক টন মরিচ কেনাবেচা হয়। কৃষকদের কাছ থেকে কোনো খাজনা নেওয়া হয় না। তবে ৮০-৮২ কেজির প্রতি বস্তায় ৪০ টাকা করে খাজনা পলাশ ও তার সহযোগিদের দিতে হয়। এ কারণে কিছুটা বেশি ওজন নিতে হয়।
অভিযুক্তদের অবস্থান
শিক্ষক তারিকুল ইসলাম পলাশ দাবি করেন, এখন হাটটি তিনি পরিচালনা করছেন না; তার বন্ধু সফাপুরের সাদেকুল ইসলাম দায়িত্বে রয়েছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি অভিযুক্ত সাদেকুল ইসলাম সাদেক।
প্রশাসনের অবস্থান ও পদক্ষেপ
নওগাঁর কৃষি বিপণন কর্মকর্তা সোহাগ সরকার বলেন, প্রশাসনের মাধ্যমে ৪০ কেজিতে মণ বাস্তবায়নের চেষ্টা চালাচ্ছেন তারা। মহাদেবপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মানজুরা মুশাররফ বলেন, "ব্যক্তি মালিকানাধীন অবৈধ হাট পরিচালনা করে খাজনা আদায়ের সুযোগ নেই। তদন্ত চলছে। প্রতিবেদন পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।"
হাটের ইতিহাস ও রাজস্ব ফাঁকি
এর আগে ২০০৫ সাল থেকে হাটটি বসত একই ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রাম দক্ষিণ লক্ষীপুর। ২০২১ সালে অবৈধ মরিচের হাট ও সিন্ডিকেটের বিষয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে প্রশাসনের চাপে মমিনপুর মোড়ে নিয়ে আসা হয়। ভরা মৌসুমে প্রতিদিন ৮০-৯০ মেট্রিক টন মরিচ বিক্রি হয়। বাজার দর নিয়ন্ত্রণ করে ১০-১৫ জন আড়ত সিন্ডিকেট। প্রতিদিন সকালে আড়তদাররা মরিচের দাম ঘোষণা করেন; ওই দামেই চলে কেনাবেচা।
কৃষকদের দাবি, জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক। ব্যক্তিমালিকানাধীন এই হাটে প্রতিদিন কাঁচামরিচ ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন শহরে যাচ্ছে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে এ হাট।



