হাওরাঞ্চলে ফসল রক্ষা বাঁধ এখন কৃষকের জন্য অভিশাপ, দুর্নীতি ও অপরিকল্পনার বলি
হাওরাঞ্চলে ফসল রক্ষা বাঁধ এখন কৃষকের জন্য অভিশাপ

হাওরাঞ্চলে ফসল রক্ষা বাঁধ: কৃষকের জন্য এখন অভিশাপ

সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে প্রতিবছর শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ফসল রক্ষা বাঁধ এখন উপকারের চেয়ে অপকারই বেশি করছে—এমন এক রূঢ় বাস্তবতা সামনে এসেছে। যে বাঁধ দেওয়ার কথা ছিল কৃষকের সোনার ফসলকে অকালবন্যা থেকে বাঁচাতে, সেই বাঁধই এখন জলাবদ্ধতা তৈরি করে ধান ডুবিয়ে দিচ্ছে। মূলত বাঁধ নির্মাণে পরিকল্পনাহীনতা, অনিয়ম ও দুর্নীতি এবং অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পের কারণে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি হাওরের কৃষি ও কৃষকের নিরাপত্তার জন্য সত্যিই উদ্বেগজনক।

প্রাকৃতিক নিয়ম থেকে বাণিজ্যিকীকরণ: বাঁধের বিবর্তন

হাওরের কৃষি ভারতের মেঘালয় থেকে আসা পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল। একসময় কৃষকেরা প্রাকৃতিক নিয়ম মেনেই সাময়িকভাবে বাঁধ দিতেন এবং ফসল তোলা শেষে তা কেটে দিতেন। পরবর্তী সময়ে এ বাঁধ করা হতো ঠিকাদারদের মাধ্যমে। তাঁদের অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে কয়েকবার ফসল বিপর্যয় ঘটে। এরপর বাঁধ নির্মাণে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটিতে (পিআইসি) কৃষক প্রতিনিধিদেরও যুক্ত করা হয়। প্রায় ১০ বছর ধরে এমন প্রক্রিয়া অনুসরণ হয়ে এলেও সেই বাঁধ নিয়েই এখন হাওরের ফসল ঝুঁকির মুখে পড়েছে। কারণ, এই পিআইসি গঠন ও এর কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

কাবিটা প্রকল্প ও পরিবেশ উপেক্ষা

বর্তমানে ‘কাজের বিনিময়ে টাকা’ (কাবিটা) প্রকল্পের আওতায় যে বিশাল কর্মযজ্ঞ চলছে, তাতে হাওরের স্বাভাবিক পরিবেশ ও পানিপ্রবাহের বিষয়টি পুরোপুরি উপেক্ষিত। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে পানিনিষ্কাশনের জন্য কৃষককে নিজ হাতে বাঁধ কাটতে হচ্ছে, আবার মামলার ভয়ে সেই কাটা অংশ ভরাট করতে হচ্ছে। এই যে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য, এর মূলে রয়েছে কারিগরি অদূরদর্শিতা এবং বাঁধ নির্মাণের নামে চলা অপরাজনীতি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

স্লুইসগেট বনাম মাটির বাঁধ: অর্থনৈতিক স্বার্থ

গত কয়েক বছরে দেখা গেছে, হাওরের পানিপ্রবাহের মুখে স্লুইসগেট বা জলকপাট নির্মাণের যৌক্তিক দাবিকে পাশ কাটিয়ে কেবল মাটির বাঁধ দেওয়া হচ্ছে। কৃষকদের অভিযোগ স্পষ্ট—স্লুইসগেট দিলে একবারই খরচ হবে, কিন্তু মাটির বাঁধ দিলে প্রতিবছর পকেটে টাকা ঢোকানোর সুযোগ থাকে। এটি সরাসরি দুর্নীতির একটি উদাহরণ, যা কৃষকের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে।

অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প ও রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয়

প্রতিবেদনে উঠে এসেছে আরও এক ভয়াবহ তথ্য—ফসল রক্ষা বাঁধের নামে এখন তৈরি হচ্ছে গ্রামীণ রাস্তা। তদন্তে প্রমাণিত হওয়ার পরও অনেক ‘অপ্রয়োজনীয়’ প্রকল্প জেলা কমিটিকে ‘ম্যানেজ’ করে পাস করিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এটি সরাসরি রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় এবং দুর্নীতির বহিঃপ্রকাশ। ফসল রক্ষার সঙ্গে সম্পর্কহীন এসব অবকাঠামো কেবল প্রভাবশালী মহলের যাতায়াতের সুবিধা দিচ্ছে, কিন্তু হাওরের পানিনিষ্কাশনের ব্যবস্থাকে শ্বাসরোধ করে মারছে। নদী-নালা ও খালের মুখ ভরাট হয়ে যাওয়ায় হাওর এখন তার ধারণক্ষমতা হারিয়েছে। এর ওপর অপরিকল্পিত বাঁধের জাল হাওরকে কার্যত একটি বদ্ধ জলাশয়ে পরিণত করছে।

কারিগরি সমাধান ও ভবিষ্যৎ হুমকি

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড ৫৮টি রেগুলেটরের কথা বললেও তার সব কটি সচল নয়। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অতিবৃষ্টির ঝুঁকি বাড়ছে। গবেষকদের মতে, কারিগরি পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া যত্রতত্র বাঁধ দেওয়া বন্ধ করা এবং নদী খননের মাধ্যমে নাব্যতা ফিরিয়ে আনাই একমাত্র সমাধান। প্রতিবছর ১৪৫ কোটি টাকা খরচ করে মাটির স্তূপ তৈরি কোনো স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। প্রশাসনের দাবি অনুযায়ী ‘বেশি মানুষের মতকে’ প্রাধান্য দেওয়া হলেও সেই ‘মানুষগুলো’ কারা, তা খতিয়ে দেখা দরকার। তাঁরা কি প্রকৃত প্রান্তিক কৃষক, নাকি পিআইসি (প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি) নামধারী সুবিধাভোগী গোষ্ঠী?

হাওর রক্ষায় জরুরি পদক্ষেপ

হাওর বাঁচাতে হলে কেবল ধান নয়, মাছ ও জীববৈচিত্র্যের কথাও ভাবতে হবে। আমরা মনে করি, এখনই সময় হাওর রক্ষা বাঁধের পুরো প্রক্রিয়ায় আমূল পরিবর্তন আনা। মাটির বাঁধের এই বার্ষিক ‘বাণিজ্য’ বন্ধ করে পরিবেশবান্ধব স্থায়ী কাঠামো এবং নদী খননে জোর দিতে হবে। নতুবা বাঁধই একদিন হাওরকে মরুভূমি অথবা স্থায়ী জলাভূমিতে পরিণত করবে, যার মাশুল দিতে হবে এ দেশের কৃষক ও খাদ্যনিরাপত্তাকে।