ময়মনসিংহের খাল খনন প্রকল্প আটকে উদ্বোধনী ফলকে, কৃষকদের দুর্ভোগ বাড়ছে
ময়মনসিংহে খাল খনন প্রকল্প আটকে, উদ্বোধনী ফলকেই সীমাবদ্ধ

ময়মনসিংহের খাল খনন প্রকল্প: উদ্বোধনী ফলকেই সীমাবদ্ধ, কৃষকদের দুর্ভোগ বাড়ছে

ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার সিধলা ইউনিয়নের বলার বিল খাল পুনঃখনন প্রকল্পের কাজ আটকে আছে কেবল উদ্বোধনী ফলকেই। সম্প্রতি সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ময়মনসিংহে দুটি খাল খননকাজের উদ্বোধন করা হলেও, উদ্বোধনের পর প্রকৃত খননকাজ শুরু হয়নি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, বরাদ্দ না পাওয়ায় এখনো পুরোপুরি কার্যক্রম শুরু হয়নি, যা স্থানীয় কৃষকদের জন্য মারাত্মক সমস্যা সৃষ্টি করছে।

খাল খনন প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ময়মনসিংহের ১৩টি উপজেলা থেকে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তারা একটি কমিটির মাধ্যমে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে খননযোগ্য দুটি করে খালের তালিকা তৈরি করেছেন। এই তালিকা থেকে ২০২৫–২৬ অর্থবছরে ৯টি উপজেলার ১১টি খাল খনন ও পুনঃখননের কর্মসূচি হাতে নিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর। ‘নদী–নালা–খাল ও জলাধার খনন ও পুনঃখনন’ কর্মসূচির আওতায় এসব খালের ৫৫ কিলোমিটার খননে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১৭ কোটি টাকা।

খালগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো মুক্তাগাছার সিংড়া খাল, ভালুকার বাকা খাল, ফুলপুরের কারাইকান্দা খাল, হালুয়াঘাটের খরিয়া খাল ও কাচুন্দারা খাল, গৌরীপুরের বলার বিল খাল, তারাকান্দার রামপুর খাল, ঈশ্বরগঞ্জের বউগলা কোদাল ধাওয়া খাল, ময়মনসিংহ সদরের চকশ্যামপুর খাল এবং ফুলবাড়িয়ার দবরদস্তা মোলঙ্গী খাল।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

উদ্বোধন ও বাস্তবতার পার্থক্য

গত ১৬ মার্চ মুক্তাগাছার সিংড়ার খাল পুনঃখনন কাজের উদ্বোধন করেন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী। খালটির ৫ দশমিক ৮ কিলোমিটার খনন করার কথা আছে। একই দিন গৌরীপুর উপজেলার বলার বিল খাল পুনঃখনন কাজের উদ্বোধন করেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসেইন। খালটির পাঁচ কিলোমিটার খনন করা হবে বলে পরিকল্পনা করা হয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তবে ৭ এপ্রিল গৌরীপুর উপজেলার সিধলা ইউনিয়নের বলার বিল খালের পুনঃখনন প্রকল্পের অগ্রগতির কাজ দেখতে গিয়ে শুধু উদ্বোধনী ফলক পাওয়া যায়। সিধলা ইউনিয়নের মনাটি গ্রামের হযরত আলীর (৬৫) বাড়ির পাশে এই ফলকটি অবস্থিত। তিনি বলেন, ‘উদ্বোধন করে গাছ লাগিয়ে গেছেন। কিন্তু বাস্তবে খননকাজ এখনো শুরু হয়নি। খালটি দিয়ে পানিপ্রবাহ বন্ধ হওয়ায় এলাকার শত শত একর জমি বর্ষায় পানিতে তলিয়ে থাকে, ফসল উৎপাদন করা যায় না।’

কৃষকদের দুর্ভোগ ও প্রত্যাশা

স্থানীয় বাসিন্দা নয়ন মিয়া বলেন, ‘১০ বছর ধরে এই এলাকায় পানি আটকে কৃষক ক্ষতির মুখে আছেন। বলার বিল খাল থেকে সিদলং বিল পর্যন্ত খালটি খনন করে দিলে ৮–১০ গ্রামের কৃষক উপকৃত হবেন।’ উদ্বোধনী ফলকে বলার বিল খাল পাঁচ কিলোমিটার খননের তথ্য থাকলেও গৌরীপুর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মোহাম্মদ আলাল উদ্দিন বলেন, খালটির ৫ দশমিক ৯ কিলোমিটার খনন করে সিদলং বিলের সঙ্গে সংযোগ করে দেওয়া হবে। এ জন্য প্রায় ৩৫ ফুট প্রস্থ ও ৭ ফুট গভীর করে খননের পরিকল্পনা আছে, যাতে প্রায় চার কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। তবে খালটির বেশির ভাগ জমি দখলে থাকায় সিএস রেকর্ড সংগ্রহ করে সীমানা নির্ধারণ করা হবে এবং বরাদ্দ পেলেই কাজ শুরু করা হবে।

মুক্তাগাছার সিংড়া খালের অবস্থা

অন্যদিকে মুক্তাগাছা উপজেলার বাঁশাটি ইউনিয়নের লাঙ্গুলিয়া কাজলকোঠা বিল থেকে বাদেকলমোহনা পর্যন্ত সিংড়া খাল এলাকায় গিয়ে শুধু উদ্বোধনী ফলক পাওয়া যায়। সেখানে খননের জন্য সীমানা নির্ধারণ করে বাঁশ পুঁতে রাখা হয়েছে, কিন্তু আর কোনো কাজ হয়নি বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন।

স্থানীয় কৃষক মো. নইম উদ্দিন বলেন, ‘এই খাল জিয়াউর রহমানের সময় খনন করা হয়েছিল। দীর্ঘদিন খনন না করায় ধীরে ধীরে সরু হয়েছে। এটি দিয়ে পানি নামতে না পারায় বর্ষায় কাজলকোঠা বিল এলাকায় প্রায় ৬০ একর জমিতে ফসল চাষ করা যায় না।’ আবদুল হক নামের এক কৃষক যোগ করেন, ‘খালের পানি এলাকার কৃষকেরা ধান চাষ ছাড়া সবজি আবাদে ব্যবহার করতেন। খালটি দ্রুত খনন করলে এলাকার কৃষকেরা উপকৃত হবেন।’

প্রশাসনের বক্তব্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

মুক্তাগাছা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী আতিকুর রহমান বলেন, খালটি ২০–২৫ ফুট প্রস্থ ও ১০–১২ ফুট গভীর করে খনন করা হবে, যাতে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১ কোটি ৯২ লাখ টাকা। খালটিতে কোনো অবৈধ দখলদার নেই এবং বরাদ্দ পেলেই পুরোদমে কাজ শুরু করা যাবে।

ময়মনসিংহ জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম বলেন, ‘গভীরতা ও প্রস্থের ওপর ভিত্তি করে প্রতি কিলোমিটারে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা খনন ব্যয় ধরা হয়েছে। বাজেট যেহেতু পাওয়া যায়নি, এ কারণে খনন শুরু হয়নি। তবে সীমানা নির্ধারণ ও দখলমুক্ত করার জন্য কাজ চলছে। বাজেট পেলে পুরোদমে কাজ শুরু করা হবে।’

ওই দুই খালের খননকাজ ৫০ শতাংশ হাতে ও ৫০ শতাংশ যন্ত্র দিয়ে করা হবে জানিয়ে জেলা প্রশাসক সাইফুর রহমান বলেন, ‘যেগুলোর খননকাজ উদ্বোধন করা হয়েছে, সেগুলোয় কাজ করা যায়নি। বরাদ্দ পেলেই কাজ শুরু হবে।’ এই অবস্থায় স্থানীয় কৃষকরা দ্রুত খননকাজ শুরু হওয়ার প্রত্যাশা করছেন, যা তাদের কৃষি উৎপাদন ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।