সুনামগঞ্জের দেখার হাওরে বাঁধ ভেঙে ফসল তলিয়ে, হাজারো কৃষকের প্রাণপণ চেষ্টায় রক্ষা
সুনামগঞ্জের হাওরে বাঁধ ভেঙে ফসল তলিয়ে, কৃষকদের চেষ্টায় রক্ষা

সুনামগঞ্জের দেখার হাওরে বাঁধ ভেঙে ফসল তলিয়ে যাওয়ার ঘটনা

সুনামগঞ্জ জেলার বিখ্যাত দেখার হাওরে একটি বাঁধ ভেঙে ফসল তলিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। শনিবার সকালে মেলানি হাওর অংশে অবস্থিত উজাউনি বাঁধটি ভেঙে যায়, যার ফলে হাওরের কিছু জমির ফসল পানিতে তলিয়ে যায়। তবে, হাজারো কৃষকের টানা চার ঘণ্টার প্রাণপণ চেষ্টায় বাঁধটি রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে।

বাঁধ ভাঙনের কারণ ও স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া

স্থানীয় কৃষকদের মতে, অতিবৃষ্টির কারণে দেখার হাওরের বিভিন্ন অংশে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। উতারিয়া বাঁধের কারণে জলাবদ্ধতার পানি নদীতে নামতে না পারায় মেলানি হাওরে পানির চাপ বাড়তে থাকে। গত বুধবার স্থানীয় কৃষকেরা উতারিয়া এলাকার বাঁধের কিছু অংশ কেটে দেন পানি নিষ্কাশনের জন্য, কিন্তু পরে প্রশাসনের নির্দেশে আবার বাঁধটি মাটি দিয়ে ভরাট করা হয়।

এতে করে মেলানি হাওরের বাঁধে আবার পানির চাপ সৃষ্টি হয়। শনিবার সকালে প্রথমে বাঁধে ছোট নালার সৃষ্টি হয়, যা কয়েকজন কৃষক রক্ষার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। একপর্যায়ে ভাঙা অংশটি আরও বড় হয়ে হাওরে ব্যাপক পরিমাণে পানি ঢুকে ফসল তলিয়ে যায়।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা

স্থানীয় বাসিন্দা আমিন উদ্দিন জানান, তারা তাৎক্ষণিকভাবে এলাকাবাসীকে বাঁশ ও বস্তা নিয়ে জড়ো হওয়ার আহ্বান জানান। তবে, বাঁধটি হাওরের গভীরে অবস্থিত হওয়ায় লোকজন জড়ো হতে ঘণ্টাখানেক সময় লেগে যায়। এরপর স্থানীয় হাজারো কৃষক জড়ো হয়ে চার ঘণ্টার চেষ্টায় বাঁধে কাজ করে সেটি রক্ষা করেন।

আস্তমা গ্রামের কৃষক মহিব মিয়া (৫০) বলেন, মেলানি হাওরে তাঁর ১২ কেদার (৩০ শতকে এক কেদার) জমি আছে এবং এই বাঁধ ভাঙায় সব ধান তলিয়ে গেছে। তিনি অভিযোগ করেন, উতারিয়া বাঁধের পানি নিষ্কাশনের নালাটি খোলা থাকলে এই বাঁধ ভাঙত না এবং তাদের ফসলের ক্ষতি হতো না।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পাউবো ও প্রশাসনের বক্তব্য

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) সুনামগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন হাওলাদার দাবি করেন, যে বাঁধটি দিয়ে পানি প্রবেশ করেছে, সেটি পাউবোর আওতাধীন কোনো বাঁধ নয় এবং তারা এখানে কোনো কাজও করেননি। তিনি বলেন, স্থানীয়রা প্রয়োজনে এখানে কাজ করেন এবং বৃষ্টি পানির চাপে বাঁধটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে শুনেছেন।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেছেন, তিনি বিষয়টি শুনেছেন এবং বাঁধটির যাতে আর ক্ষতি না হয় সেই ব্যবস্থা করা হবে।

হাওরের কৃষি পরিস্থিতি ও ক্ষয়ক্ষতি

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেখার হাওরে সদর, শান্তিগঞ্জ, দোয়ারাবাজার ও ছাতক উপজেলার মানুষের জমি আছে। এই হাওরে মোট জমির পরিমাণ ৪৫ হাজার ৮৫৯ হেক্টর, যার মধ্যে আবাদি জমি আছে ২৪ হাজার ২১৪ হেক্টর। এবার অতিবৃষ্টিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় ঝাওয়া, শেয়ালমারা, গুমরাসহ কয়েকটি জায়গায় ফসলের ক্ষতি হয়েছে।

এছাড়া, জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এবার সুনামগঞ্জের ১৩৭টি হাওরে দুই লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন, এবং সপ্তাহখানেক পর থেকে হাওরে ধান কাটা শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এই ঘটনা হাওর অঞ্চলের কৃষকদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে, যেখানে স্থানীয় উদ্যোগ ও প্রশাসনের সমন্বয়হীনতা ফসল রক্ষায় বাধা সৃষ্টি করছে।