ইলিশ উৎপাদন সংকটে সরকারের হাজার কোটি টাকার ড্রেজিং পরিকল্পনা
নদীর মোহনায় পলি জমে ক্রমেই বন্ধ হয়ে আসছে ইলিশের স্বাভাবিক চলাচলের পথ, আর এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে উৎপাদনে। সাত বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসা উৎপাদন ঘুরে দাঁড় করাতে এবার হাজার কোটি টাকার ড্রেজিং উদ্যোগের কথা ভাবছে সরকার। তবে এত বড় বিনিয়োগে আদৌ কাঙ্ক্ষিত ফল মিলবে কিনা—সেই প্রশ্নও তুলছেন বিশেষজ্ঞরা।
ইলিশ উৎপাদনের নিম্নমুখী প্রবণতা
ইলিশ বাংলাদেশের অন্যতম অর্থকারী মাছ, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইলিশের উৎপাদনে নিম্নমুখী প্রবণতায় দেখা গেছে। আবহাওয়ার ধারবাহিকতা না থাকা, অতিরিক্ত আহরণ, নৌ-চলাচলের প্রতিবন্ধকতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে এর জন্য দায়ী করা হচ্ছে। মৎস্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ মৌসুমে ইলিশ উৎপাদন সাত বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে নেমে এসেছে। এ সময় উৎপাদন দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ২৯ লাখ টন, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪২ হাজার টন কম।
এর আগে কয়েক বছরে ইলিশ উৎপাদনে ধীরগতির ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা ছিল। ২০২২-২৩ অর্থবছরে উৎপাদন ৫ দশমিক ৭১ লাখ টন, ২০২১-২২ সালে ৫ দশমিক ৬৬ লাখ টন, ২০২০-২১ সালে ৫ দশমিক ৫৫ লাখ টন, ২০১৯-২০ সালে ৫ দশমিক ৫০ লাখ টন এবং ২০১৮-১৯ সালে ৫ দশমিক ৫২ লাখ টন ছিল। তবে প্রবৃদ্ধির হার ছিল সীমিত, যা বর্তমান সংকটকে আরও তীব্র করেছে।
ড্রেজিং উদ্যোগের বিশদ বিবরণ
ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে মৎস্য অধিদফতর প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকার একটি বৃহৎ ড্রেজিং উদ্যোগ বিবেচনা করছে, যার লক্ষ্য ব্যাহত অভিবাসন পথ পুনরুদ্ধার করা। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় নৌপরিবহন ও পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে মেঘনা ও তেতুলিয়া নদীর মোহনায় প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার এলাকায় ড্রেজিংয়ের প্রস্তাব দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিপক্ব ইলিশ ডিম ছাড়ার মৌসুমে সাগর থেকে নদীতে উঠে আসে এবং ডিম ছাড়ার পর আবার সাগরে ফিরে যায়। কিন্তু এই যাতায়াতের পথ—সাগর থেকে নদী এবং নদী থেকে সাগরে ফেরার পথ—ক্রমেই পলিতে ভরাট হয়ে যাচ্ছে, ফলে পানির নিচে চর তৈরি হচ্ছে। এর ফলে ইলিশ আর স্বাভাবিকভাবে উজানে উঠতে পারছে না, যা তাদের প্রজনন চক্রে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নদীপথে গড়ে ওঠা অন্তত ২৫টি চর এখন এই প্রজাতির জীবনচক্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রস্তাবিত ড্রেজিং পথ ও ব্যয়
প্রস্তাবে ইলিশের চারটি প্রধান অভিবাসন পথ চিহ্নিত করে ড্রেজিংয়ের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মেঘনা মোহনায় ২০ কিলোমিটার (ভোলা, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, পটুয়াখালী); তেতুলিয়া মোহনায় ১০ কিলোমিটার (পটুয়াখালী, রাঙ্গাবালী); আন্ধারমানিক নদীতে ১০ কিলোমিটার (পটুয়াখালী, কলাপাড়া); উজানের মেঘনায় ১০ কিলোমিটার (বরিশাল, চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর)।
বিশেষজ্ঞদের হিসাবে, মেঘনা মোহনার ২০ কিলোমিটার ড্রেজিংয়ে প্রায় ৪ হাজার ৭৬০ কোটি টাকা ব্যয় হবে এবং প্রায় ৪৭ দশমিক ৬ কোটি টন পলি অপসারণ করতে হবে। তেতুলিয়া অংশে আরও প্রায় ২ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে। মৎস্য অধিদফতরের ‘ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্প’র পরিচালক মোল্লা এমদাদুল্লাহ বলেন, “ইলিশের অভিবাসনের জন্য ন্যূনতম ৫ থেকে ১০ মিটার গভীরতা প্রয়োজন। কিন্তু মোহনা অঞ্চলে পলি জমে অনেক জায়গায় তা ২ থেকে ৩ মিটারে নেমে এসেছে।”
বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা
তবে যথাযথ মূল্যায়ন ছাড়া ড্রেজিং করলে তা উল্টো ক্ষতির কারণ হতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা। মৎস্যবিজ্ঞানী ড. মো. আনিসুর রহমান বলেন, “ড্রেজিংয়ের ক্ষেত্রে সুবিধা ও ঝুঁকি—দুটিই বিবেচনায় নিতে হবে। তা না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। ইলিশ বাধার মুখে পড়লে অনেক সময় উজানে না গিয়ে আবার সাগরে ফিরে যায়।” তিনি জানান, দেশের মোট ইলিশ উৎপাদনের প্রায় ৩৫ শতাংশই ভোলা অঞ্চল থেকে আসে, ফলে এই রুটগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নদী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ড্রেজিং না থাকলে এ উদ্যোগের সুফল দীর্ঘস্থায়ী হবে না। চাঁদপুরের মেঘনা-তেতুলিয়া মোহনায় এসব চর এলাকায় প্রায় ৮৮ কোটি টন পলি জমেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা অপসারণে বিশাল চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। সরকারের এই পরিকল্পনা ইলিশ উৎপাদন পুনরুদ্ধারে কতটা কার্যকর হবে, তা এখন সময়ই বলবে।



