বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশের জনপ্রিয়তা ও চাহিদা দেশ-বিদেশে ক্রমশ বাড়ছে। তবে বাড়ছে দামও। ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি ও মা ইলিশ রক্ষায় বছরে তিনবার ভিন্ন ভিন্ন সময়ে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। এই সময়ে জেলেরা বেকার হয়ে পড়েন এবং অনেকে দুঃখ-কষ্টে জীবনযাপন করেন। কেউ কেউ প্রশ্ন করেন, নিষেধাজ্ঞার ফলে আসলে কতটা বেড়েছে ইলিশের উৎপাদন।
ইলিশ গবেষকদের বক্তব্য
ইলিশ গবেষকরা বলছেন, নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের ফলে দেশের নদী ও সাগরে গত দুই দশকে ইলিশ আহরণের পরিমাণ বেড়েছে দ্বিগুণ। এসব মৌসুমে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর ভূমিকা রেখেছে, ফলে উৎপাদন বেড়েছে এবং আগের চেয়ে মাছের ওজন ও আকার বেড়েছে। তবে তাদের পরিসংখ্যান বলছে, গত দুই বছরে ইলিশের উৎপাদন কমেছে ৭১ হাজার মেট্রিক টন। যদিও সামগ্রিকভাবে দুই দশকে উৎপাদন বেড়েছে।
প্রধান নিষেধাজ্ঞাগুলো
মা ইলিশ রক্ষায় ২২ দিন নিষেধাজ্ঞা
আশ্বিন মাসের পূর্ণিমার সময়কে ভিত্তি করে সাধারণত অক্টোবর মাসে সারা দেশে মা ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ থাকে। ২০২৫ সালে এটি ছিল ৪ অক্টোবর থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত। আশ্বিন মাসের পূর্ণিমার সময়ে মা ইলিশ নদী ও মোহনায় ডিম ছাড়তে আসে। এই সময় মাছ ধরা বন্ধ থাকায় তারা নিরাপদে বংশবিস্তার করতে পারে।
জাটকা সংরক্ষণে আট মাস নিষেধাজ্ঞা
প্রতি বছর ১ নভেম্বর থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত দেশব্যাপী ২৫ সেন্টিমিটারের (১০ ইঞ্চি) কম দৈর্ঘ্যের ইলিশ বা জাটকা আহরণ, পরিবহন ও বিক্রি নিষিদ্ধ থাকে। এই সময়ে ছোট মাছগুলো বড় হওয়ার সুযোগ পায়।
সাগরে মাছ ধরায় ৬৫ দিন নিষেধাজ্ঞা
বঙ্গোপসাগরে ইলিশসহ সব ধরনের মাছের বংশবৃদ্ধির জন্য প্রতি বছর ২০ মে থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্র জানায়, এবার জাটকা রক্ষা ও ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে ১ মার্চ থেকে আগামী ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত মেঘনা নদীর চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার ষাটনল থেকে হাইমচর উপজেলার চরভৈরবী পর্যন্ত ৭০ কিলোমিটার এলাকায় ও পদ্মা নদীতে সব ধরনের মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে পরিপত্র জারি করে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। পরিপত্রে জাটকা ও ইলিশ নিধন ছাড়া এগুলো বিক্রি, পরিবহন, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণও নিষিদ্ধ করা হয়।
কমেছে উৎপাদন
মৎস্য কর্মকর্তারা বলছেন, প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ ও ইলিশের পোনা জাটকা সংরক্ষণে অভয়াশ্রম, বঙ্গোপসাগরে মাছের সুষ্ঠু প্রজনন ও উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে নির্দিষ্ট সময়ে মাছ ধরা বন্ধ রাখা এবং এই সময়ে জেলেদের সচেতনতা ও সরকারি প্রণোদনা প্রদানসহ সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে প্রায় প্রতি বছরই ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে ইলিশের উৎপাদন। তবে সর্বশেষ দুই বছরে উৎপাদন কমেছে ৭ দশমিক ৩৩ শতাংশ।
জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্যমতে, ২০০৩-০৪ অর্থবছরে দেশে ইলিশের উৎপাদন হয়েছিল ২ লাখ ৫৫ হাজার ৮৩৯ মেট্রিক টন। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে উৎপাদন ছিল ৭১ হাজার ১ মেট্রিক টন, সামুদ্রিক জলাশয়ে ১ লাখ ৮৪ হাজার ৮৩৭ মেট্রিক টন। গত দুই দশকের মধ্যে একেক বছর উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে ১ থেকে ৮ শতাংশ পর্যন্ত। ২০২২-২৩ অর্থবছরে মোট উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় ৫ লাখ ৭১ হাজার ৩৪২ মেট্রিক টন। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে ২ লাখ ৭১ হাজার ৩৩০ মেট্রিক টন, সামুদ্রিক জলাশয়ে ৩ লাখ ১২ মেট্রিক টন।
তবে নদী দূষণ, শত শত ড্রেজারে অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনসহ নানা কারণে ইলিশ উৎপাদনের বৃদ্ধির ধারা ব্যাহত হচ্ছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৭ দশমিক ৩৩ শতাংশ ইলিশের উৎপাদন কমে উৎপাদন দাঁড়ায় ৫ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৭ মেট্রিক টন। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা আরও কমে ৫ লাখ মেট্রিক টনে নেমেছে।
মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট বলছে নানা পদক্ষেপের কথা
চাঁদপুর মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট সূত্রে জানা গেছে, ইলিশ রক্ষা ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে গত দুই দশকে ধারাবাহিকভাবে নানা পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ২০০৩ সালে ছোট ইলিশ বা জাটকা সংরক্ষণ কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করে জাটকা ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। ২০০৫ সালে ইলিশের প্রধান প্রজনন ও বিচরণ এলাকাকে প্রথমবারের মতো অভয়াশ্রম ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকে জাটকা রক্ষায় চাঁদপুরের পদ্মা, মেঘনা নদীসহ দেশের চারটি অভয়াশ্রম এলাকায় মার্চ-এপ্রিল—এই দুই মাস মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন অব্যাহত রয়েছে। ২০০৮ সালে মা ইলিশ রক্ষায় আশ্বিন মাসের পূর্ণিমাকে কেন্দ্র করে নির্দিষ্ট সময় মাছ ধরা বন্ধ রাখার কর্মসূচি চালু হয়। ২০১১ সালে ইলিশ গবেষণা, বৈজ্ঞানিক জরিপ ও উৎপাদন তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম জোরদার করা হয়। ২০১২ সালে ক্ষতিগ্রস্ত জেলেদের জন্য ভিজিএফ খাদ্য সহায়তা সম্প্রসারণ করা হয়। ২০১৩ সালে অবৈধ কারেন্ট জাল ও নিষিদ্ধ জালবিরোধী বিশেষ অভিযান জোরদার করা হয়। ২০১৫ সালে মা ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞার সময়সীমা আরও বাড়ানো হয়। ২০১৬ সালে জেলা প্রশাসন, কোস্টগার্ড, নৌ-পুলিশ ও মৎস্য বিভাগের সমন্বয়ে টাস্কফোর্সের মাধ্যমে যৌথ অভিযানের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০১৮ সালে জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থান কর্মসূচি চালু করা, ২০১৯ সালে অভয়াশ্রম এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়। ২০২৩-২০২৪ সালে গবেষণা, প্রজনন ক্ষেত্র সংরক্ষণ, জেলেদের প্রণোদনা ও আইন প্রয়োগ কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়।
যা বলছেন ইলিশ গবেষকরা
চাঁদপুর মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও ইলিশ গবেষক ড. আনিছুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গবেষণার ফলে সরকারকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রকমের সুপারিশ করা হয়ে থাকে। সেগুলো সরকারও আন্তরিকভাবে বাস্তবায়ন করছে। আর সে কারণেই মা ইলিশ রক্ষা, জাটকা রক্ষাসহ সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। ফলে দেশে ইলিশ আহরণের পরিমাণ অনেক বেড়েছে।’
অক্টোবরে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে মা ইলিশ ঠিকমতো ডিম ছাড়ার সুযোগ পেলে বিপুল পরিমাণ জাটকা বাঁচবে উল্লেখ করে আনিছুর রহমান বলেন, ‘এরপরের ধাপ জাটকাগুলোকে লালন-পালন করে বড় হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া। সেজন্য জাটকা সংরক্ষণের জন্য মার্চ-এপ্রিল দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা। এই জাটকাই আগামী দিনের ইলিশ। জাটকাকে সুরক্ষা দেওয়া হলে বড় বড় ইলিশ মিলবে এটাই স্বাভাবিক। এরপর সাগরে ফিরে গিয়ে পরবর্তীতে মা-বাবা হওয়ার জন্য প্রস্তুতির সুযোগ দিতে ১৫ এপ্রিল থেকে ৫৮ দিন সাগরের মাছ ধরা বন্ধ রাখা হয়। ১ নভেম্বর থেকে ৩০ জুন জাটকা রক্ষা করতে ২৫ সেন্টিমিটারের ছোট ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ রাখা হয়। এজন্য জেলেদের জালের ফাঁস ৪.৫ সেন্টিমিটার থেকে বাড়িয়ে ৬.৫ করা হয়েছে। এই পদক্ষেপগুলো অত্যন্ত ভালো। এগুলো হলো তাদের জীবন চক্র সম্পন্ন করতে টেকনিক্যালি সহায়তা করে। নিষেধাজ্ঞাগুলো নদী ও সাগরে মাছের বীজ বপন ও পোনা ছাড়ার মতোই। ফেব্রুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত সময়টাই গুরুত্বপূর্ণ। তবে জেলেদের কথা বিবেচনা করে অধিক গুরুত্বপূর্ণ সময়টাতেই মাছ ধরা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নিষিদ্ধ সময়ে ছেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থানের অংশ হিসেবে খাদ্য সহায়তা দিচ্ছে সরকার। এরপরও মাঝেমধ্যে ইলিশ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এর মধ্যে জাটকা নিধন একটি কারণ। আরেকটি হলো দূষণ। যদি সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায় তাহলে উৎপাদন আগের মতোই বাড়বে।’
প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত সব মাছের পরিমাণ কমছে
গত দুই বছরে ইলিশের উৎপাদন কমার কারণ জানতে চাইলে ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্প পরিচালক মোল্লা এমদাদুল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত সব জাতের মাছের পরিমাণ কমছে। কারণ পানির সংকট। নাব্যতার সংকট। সঙ্গে নদী ও সাগর দূষণ তো আছেই। এর মধ্যেও নানামুখী উদ্যোগে ইলিশের উৎপাদন বাড়ছে। এখন যে উৎপাদন সেটি অনেক বড় অর্জন।’
তিনি বলেন, ‘অভিযানের ফলে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় নিষেধাজ্ঞার সময় বিভিন্ন সময় বাড়ানো হয়েছে। জেলেদের ভিজিএফ কার্ডের মাধ্যমে চাল সহায়তা দেওয়া হয়। এ ছাড়া ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন প্রকল্প থেকে প্রথমবারের মতো ৪০ হাজার জেলেকে খাদ্য সহায়তা হিসেবে ১০ লিটার সয়াবিন, ১২ কেজি আটা, ১৬ কেজি আলু, ৪ কেজি চিনি, ৪ কেজি লবণ ও ৮ কেজি মসুর ডাল দেওয়া হয়েছে।’



