চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার রাধানগর ইউনিয়নের বিলকুজাইন বিল এলাকায় ভারতের পুনর্ভবা নদী থেকে নেমে আসা পানিতে হাজার হাজার বিঘা বোরো ধান তলিয়ে গেছে। ধান কাটা, পরিবহন ও বাড়তি খরচের চাপে বিপাকে পড়েছেন কৃষকেরা। স্থানীয় বাসিন্দারা ব্যাপক এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করলেও কৃষি বিভাগ বলছে, ক্ষতির পরিমাণ তুলনামূলক কম।
পানিবন্দী জমি থেকে ধান উদ্ধারে নৌকার অভাব
গতকাল মঙ্গলবার বিলকুজাইন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, পানিবন্দী জমি থেকে ধান তুলতে নৌকা না পেয়ে অনেক কৃষক মোটা পলিথিন দিয়ে অস্থায়ী নৌকা বানিয়ে ধান পার করছেন। কৃষক তরিকুল ইসলামের ২০ বিঘা জমির মধ্যে অধিকাংশই পানিতে তলিয়ে গেছে। পাঁচ বিঘা নিজের, বাকিটা বর্গা নেওয়া। ছয় বিঘার ধান কাটতে পারলেও শ্রমিকসংকটে বাকিটা কাটতে পারেননি।
কৃষকের ব্যথা
তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘এই দুর্দিনে দিনে হাজার টাকা মজুরিতেও ধান কাটা শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। ধান বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য নৌকাও পাওয়া যাচ্ছে না। তাই বাধ্য হয়ে পলিথিনের নৌকা বানিয়ে ধান লিয়া যাছি। নদীর ওপারে গিয়া ট্রাক্টরে কইর্যা বাড়িতে লিয়া যাব। খরচও পড়বে অনেক বেশি। খরচ তো উঠবেই না। ক্ষতির হিসাব এখনো বুঝতি পারছি না। ধারদেনা করে আবাদ কইরাছিলাম। মাথায় আমার বাজ পড়ার মতো অবস্থা।’
ধরা গলায় কৃষক তরিকুল বলেন, ‘তিন-চার বচ্ছর আগেও এ রকমভাবে ধান ডুইবাছিল। ওই ক্ষতি এখুনো পোষাইতে পারিনি। আবারও ডুবনু। এই ডাহি (সংকট) আর ভাল্লাগে না। মনে হোইছে সব ছাইড়্যা পালিয়্যা যায়। দুই লাখ টাকা লোন লিয়া আবাদ কইরাছি। ধান তুইল্যা শোধ করা কথা। এখুন তো নিজের খাবার সমান জুটবে না। লোন কী দিয়া শোধ করব? কৃষি পেশা ছাইড়্যা পালিয়্যা যাওয়া ছাড়া উপায় নাই দেখছি না।’
শ্রমিকদের দুর্ভোগ
ধান কাটতে গিয়ে দুর্ভোগের কথা জানিয়েছেন শ্রমিকেরাও। দান্দিপুর গ্রামের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর রতন তিগগ্যা জানান, চার দিন কোমরপানিতে দাঁড়িয়ে জোঁকের কামড় সহ্য করে কাজ করেও কাঙ্ক্ষিত মজুরি না পাওয়ায় তাঁরা কাজ ছেড়ে দিয়েছেন।
স্থানীয় উদ্যোগ ব্যর্থ
স্থানীয় লোকজনের উদ্যোগে নদীর পানি ঠেকাতে তিন দিন ধরে মাটির বাঁধ নির্মাণ করা হলেও তা ভেঙে আরও নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে নদীর এপারের জমিও ডুবে যেতে শুরু করেছে।
বারবার একই পরিণতি
কৃষকেরা জানান, দুই-এক বছর পরপর ভারত থেকে নেমে আসা পানিতে একই দুর্ভোগ তৈরি হয়। নদীর নাব্যতা সংকট, খননের অভাব ও সেতু না থাকায় ক্ষতি আরও বাড়ছে। তাঁদের ভাষ্য, একটি সেতু হলে দ্রুত ধান সরানো যেত, আর নদী খনন হলে জলাবদ্ধতাও কমত।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের মত
পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী সুমন আলী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের কাছে এটি পুনর্ভবার উপনদী। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে পরিদর্শনে এসেছি। এখানে নদী খনন দরকার। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে এটা জানাব।’
স্থানীয় সরকার ও কৃষি বিভাগের বক্তব্য
রাধানগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মতিউর রহমান জানালেন, বিলকুজাইন ও সিংগাবাদ পাথার মিলিয়ে কয়েক হাজার বিঘা জমির ধান ঝুঁকিতে পড়েছে। তবে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সাকলাইন বলেন, এলাকায় ২০৫০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে, এর মধ্যে ৬০ হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, সাত দিন আগে পানি আসায় অনেক কৃষক ধান কাটার পর্যাপ্ত সময় পাননি।
সরকারের নজরদারির অভাব
স্থানীয় কৃষকেরা বলছেন, ২০১৭, ২০২২, ২০২৪ ও ২০২৬ সালে একইভাবে ভারতীয় পানির ঢলে হাজার হাজার বিঘা জমির ধান নষ্ট হয়ে তাঁদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে, কিন্তু সরকার বিষয়টিতে নজর দিচ্ছে না।



