বৃষ্টির সঙ্গে যোগ হয়েছে উজানের ঢল। আত্রাই নদী ও কয়েকটি খাল দিয়ে সেই পানি হু হু করে ঢুকছে চলনবিলে। বিস্তীর্ণ ধানখেতে এভাবে পানি ঢুকে পড়ায় বোরো ধান নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকেরা। তবে ফসল রক্ষায় খালের মুখে মাটির বাঁধ দিয়ে পানি আটকানোর প্রাণপণ চেষ্টা করছেন চাষিরা। বাঁধ দিয়ে পানি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে নাটোরের সিংড়ার ২৬ হাজার হেক্টর এবং গুরুদাসপুরের নিমাঞ্চলের কিছু ধানখেত তলিয়ে যাওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করেছে কৃষি বিভাগ। আশার কথা, গতকাল রোববার নতুন করে আর বৃষ্টি হয়নি। তবে নদীর পানির উচ্চতা বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় বিলে পানি প্রবেশ রোধে একসঙ্গে কাজ করছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, কৃষি কর্মকর্তা ও স্থানীয় কৃষকেরা।
পানির উৎস ও প্রভাব
নাটোর কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েকদিন ধরে নাটোরে থেমে থেমে বৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টির পানিতেই অপেক্ষাকৃত নিচু এলাকার ধানের জমি ইতিমধ্যে ডুবতে শুরু করেছে। এছাড়া উজানের উত্তর ভারত থেকে নেমে আসা পানি চলনবিলের বুক চিরে বয়ে যাওয়া আত্রাই নদী হয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এই নদীর পানি সিংড়ার জোড়মল্লিকা, সারদানগর, হুলহুলিয়া, কতুয়াবাড়ি, রাখালগাছা, পৌর শ্মশানঘাট খাল এবং বিলদহর হয়ে গুরুদাসপুরের বিলহরিবাড়ি, যোগেন্দ্রনগর, বিলশা ও রুহাই বিলে প্রবেশ করছে। স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় বিভিন্ন খালের মুখে মাটির বাঁধ নির্মাণ করে পানি আটকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছেন চাষিরা। বৃষ্টি আর নদীর পানি অব্যাহত থাকলে মাটির তৈরি এসব বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ চলনবিলে পানি প্রবেশ করে ধানখেত ডুবিয়ে দিতে পারে।
ফসলের অবস্থা
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিংড়ায় চাষ হওয়া ৬ হাজার ৬১০ হেক্টরের মধ্যে ৩০ শতাংশ ধান কাটা হলেও বাকি প্রায় ২৬ হাজার হেক্টর জমির ধান মাঠেই রয়েছে। এছাড়া গুরুদাসপুরে ৪ হাজার ৪৩৫ হেক্টর জমির ধান এখনো কাটাই শুরু হয়নি। এসব ধান কেটে ঘরে তুলতে আরও প্রায় ১৫ থেকে ২০ দিন সময় প্রয়োজন।
স্থানীয় প্রতিক্রিয়া ও উদ্যোগ
স্থানীয় লোকজন জানান, আত্রাই নদীর পানি শুক্রবার রাত থেকে সিংড়ার জোড়মল্লিকা সেতুর নিচ দিয়ে জোড়মল্লিকা বিলে প্রবেশ করতে শুরু করে। সেই পানি প্রবেশ করছে গুরুদাসপুরের বিলগুলোতেও। কৃষকেরা খবর পেয়ে শুক্রবার রাত থেকেই সেখানে মাটি কাটার যন্ত্র ব্যবহার করে সেতুর নিচে মাটির বাঁধ নির্মাণ করেছেন। বাঁধ দেওয়ার পর থেকে নদীর পানির উচ্চতা আরও বাড়ায় শঙ্কাও বাড়ছে। বাঁধ ভেঙে পানি প্রবেশ করলে এই বিলেই ২৫০ থেকে ৩০০ হেক্টর জমির ধান তলিয়ে যাবে। সারদানগর-হুলহুলিয়া খাল হয়ে আত্রাই নদীর পানি চলনবিলের মূল অংশ সিংড়া, গুরুদাসপুর ও তাড়াশে প্রবেশ করছে বৃহস্পতিবার রাত থেকে। খবর পেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও কৃষি কর্মকর্তা শুক্রবার সেখানে ছুটে যান। প্রশাসনের আর্থিক সহযোগিতায় কৃষকেরা সেখানেও মাটির বাঁধ দিয়ে পানি আটকান। তবে পানির চাপ পড়লে যেকোনো সময় বাঁধ ভেঙে ধানখেত তলিয়ে যেতে পারে।
ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা
স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্যমতে, সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে কতুয়াবাড়ি, উত্তর দমদমা, জোলারবাতা স্লুইসগেট এলাকা। এখানে স্লুইসগেটের এক অংশ আগে থেকেই ভাঙা থাকায় আত্রাই নদীর পানি এদিক দিয়েও বিলে প্রবেশ করছে। স্লুইসগেটের এই অংশে বালুর বস্তা ফেলে পানি আটকানোর চেষ্টা করছেন কৃষকেরা। এ ছাড়া রাখালগাছা ও পৌর শ্মশানঘাট খালের মুখ দিয়েও আত্রাই নদীর পানি বিলে ঢুকছে। গুরুদাসপুরের বিলহরিবাড়ি, যোগেন্দ্রনগর, বিলশা ও রুহাই এলাকার ধান চাষিরা জানান, সিংড়ার কয়েকটি বিলের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত এসব বিল। ধান চাষে দেরি হওয়ায় গুরুদাসপুরে ধান এখনো কাটার উপযোগী হয়নি। এখানে ধান কাটা শুরু হতে এখনো ১৫ থেকে ২০ দিন সময় প্রয়োজন। অথচ বিলে হু হু করে পানি প্রবেশ করছে। এভাবে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে অন্তত পাঁচটি বিলের ধান তলিয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
কৃষি বিভাগের বক্তব্য
নাটোর জেলা কৃষি কর্মকর্তা বলেন, বিলের ধান এখনো দুই-তৃতীয়াংশ কাটাই হয়নি। উজানের পানি নদী হয়ে বিলে পড়ছে। এতে ধান কাটা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় কৃষকদের নানা পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে এবং আধুনিক যন্ত্রে ধান কাটতে উৎসাহিত করা হচ্ছে।



