রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার কিসমত বগুড়া গ্রামে বিএমডির গভীর নলকূপের অপারেটর পানি না দেওয়ায় প্রায় ৪০ বিঘা জমি পতিত আছে। চাষিরা দেখাচ্ছেন সেই জমি। গত শুক্রবার সকালে কিসমত বগুড়া মাঠে এ চিত্র দেখা যায়।
পানি না পাওয়ায় বোরো আবাদ করতে পারেননি কৃষক
ইয়াসিন আলীর বাড়ি রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার কিসমত বগুড়া গ্রামে। গ্রামটিতে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) একটি গভীর নলকূপ আছে। তার আওতায় ইয়াসিনের তিন বিঘা জমি আছে। কিন্তু নলকূপের অপারেটরের সঙ্গে পানির উচ্চ দাম নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে তাঁকে পানি দেওয়া হয়নি। এ কারণে জমিতে বোরো আবাদ করতে পারেননি তিনি।
শুধু ইয়াসিন নন, এই নলকূপের আওতায় ৫৮ জন কৃষকের বোরো ধানের প্রায় ৪০ বিঘা জমি পতিত পড়ে আছে। এ নিয়ে অপারেটরের বিরুদ্ধে বিএমডিএতে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী কৃষকেরা। বিএমডিএ অপারেটরকে চিঠি দিয়ে ডেকেছে। কিন্তু তিনি যাননি। কেন যাননি, তার জবাব দিতে বলেছে; কিন্তু সেই জবাবও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তিনি দেননি।
অপারেটরের পরিচয় ও অভিযোগ
বিএমডিএর এই অপারেটরের নাম মো. গোলাম রাব্বানী। বাড়ি দুর্গাপুর উপজেলার কিসমত তেকাটিয়া গ্রামে। চব্বিশের পটপরিবর্তনের পর তিনি নিয়োগ পেয়েছেন। স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, গত মৌসুমে অপারেটর চার বিঘা জমির উঠতি শর্ষে পানি দিয়ে নষ্ট করে দেন। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মারামারি হয়। স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি এ নিয়ে সালিস করেন। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়, গভীর নলকূপের অপারেটর ইচ্ছেমতো আর পানি বিক্রি করতে পারবে না। নলকূপের আওতাধীন চাষিরা সমিতি করে পানি ব্যবহার করবেন। তাহলে সেচের খরচ অর্ধেকে নেমে আসবে। কিন্তু অপারেটর সেই সিদ্ধান্ত মানেননি। চাষিদের একাংশ ধানও চাষ করেননি। তাঁদের জমি পড়ে আছে।
এ নিয়ে গত ১১ মার্চ কৃষক ইয়াসিন আলী অপারেটরের বিরুদ্ধে বিএমডিএতে লিখিত অভিযোগ করেন। কৃষকেরা উচ্চহারে টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে ৪০ থেকে ৫০ বিঘা আবাদি জমি পতিত অবস্থায় ফেলে রাখেন অপারেটর। এতে কৃষকেরা আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হন। এতে বিএমডিএরও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে।
বিএমডিএর পদক্ষেপ
অভিযোগের পর গত ২২ এপ্রিল বিএমডিএর দুর্গাপুর অঞ্চলের সহকারী প্রকৌশলী মো. আহসান হাবীব অপারেটর গোলাম রাব্বানীকে একটি চিঠি দেন। এতে উল্লেখ করা হয়, ‘ইতিপূর্বে জটিলতা নিরসনে উভয় পক্ষকে মৌখিকভাবে উপস্থিত থাকার কথা বলা হলেও আপনি ওই সভায় উপস্থিত হননি। এ ছাড়া কৃষকদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আপনাকে চিঠি দেওয়া হয়। আপনি ১৪ এপ্রিল চিঠিটি গ্রহণ করেছেন। চিঠি প্রাপ্তির সাত কার্যদিবসের মধ্যে আপনাকে জবাব দিতে বলা হলেও আপনি কোনো জবাব দেননি। আপনার এ ধরনের কর্মকাণ্ড অপারেটর পদের শর্তাবলি তথা দেশের প্রচলিত আইনের পরিপন্থী। এ অবস্থায় অভিযোগের বিষয়ে আগামী ৩ কর্মদিবসের মধ্যে যথাযথ জবাব দিতে ব্যর্থ হলে অপারেটর পদ বাতিলসহ কর্তৃপক্ষ একতরফা সিদ্ধান্ত নেবে।’ পরে তিনি চিঠির জবাব দেন।
কৃষকদের বক্তব্য
গত শুক্রবার সকালে কিসমত বগুড়া গ্রামে গিয়ে গভীর নলকূপের কথা তুলতেই ভুক্তভোগী চাষিরা বেরিয়ে এলেন। কৃষক মুজিবুর রহমান বললেন, মাঠে তাঁর চার বিঘা জমি আছে। সব পড়ে আছে। সমিতির মাধ্যমে সেচ দিলে অর্ধেক খরচ। অপারেটর তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা নিচ্ছেন। সমিতির মাধ্যমে করলে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৮০০ টাকা খরচ পড়বে। তাঁরা সমিতি করার পক্ষে ছিলেন, এ জন্য তাঁদের পানি দেওয়া হয়নি। সেই পানি এখন অপারেটর পুকুরমালিকের কাছে বিক্রি করছেন।
কৃষকেরা ঘুরে ঘুরে দেখালেন, গভীর নলকূপের আওতাধীন বেশির ভাগ জমিই পড়ে আছে। পাশে কিছুসংখ্যক চাষি অপারেটরের সিদ্ধান্ত মোতাবেক বোরো চাষ করেছেন। সেই ধানের চেহারাও ভালো নয়। বেশির ভাগ চাষিদের পতিত জমিতে গরু-ছাগল চরছে। এই ধানের জমির মধ্যেই একটি নতুন পুকুর খনন করা হয়েছে। দেখা গেল, নলকূপের নালার সঙ্গে পাইপ দিয়ে পুকুরের সঙ্গে একটা সংযোগ তৈরি করা হয়েছে। চাষিদের অভিযোগ, তাঁদের ধানের জমিতে পানি না দিয়ে রাতে অপারেটর এই পুকুরে পানি দেন।
কৃষক সমশের আলী বলেন, এই ধানের মৌসুম যাচ্ছে। কিন্তু তিনি এক মুঠ ধান ধরে তুলতে পারলেন না। তাঁর সব জমি পড়ে আছে। বিএমডিএর দুজন কর্মকর্তা এসে তাঁর কথা শুনে বলেছেন, ‘আপনি তো পাগলা হইয়্যা গিছেন। এখানে লককরে বইসে থাকেন। আমরা দেখিচ্ছি।’ তিনি বলেন, তারপরও তাঁদের জমি পড়েই আছে।
পাশেই মীরপুর গ্রামে আরেকটি গভীর নলকূপ আছে। সেই নলকূপের আওতায় এবার বোরো চাষ করেছেন শহিদুল ইসলাম। তিনি বললেন, তাঁরা সমিতির মাধ্যমে সেচের পানি ব্যবহার করেন। সেচের যে বিদ্যুৎ বিল আসে তা ভাগ করা হয় কোন কৃষক কত শতাংশ জমিতে ধান লাগিয়েছেন তা দিয়ে। তিনি বলেন, গত বছর তাঁদের এক বিঘা জমির পানি ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬৫০ টাকার মধ্যে হয়ে গেছে। এবার এখনো হিসাব হয়নি।
অপারেটরের বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে অপারেটর গোলাম রব্বানী বলেন, তিনি পানি দিতে চেয়েছেন। কিন্তু কৃষকেরাই পানি নেননি। তিনি স্বীকার করেন, তাঁর কাছ থেকে এক বিঘা ধানের সেচ খরচ প্রায় তিন হাজার টাকা। পুকুরে পানি দেওয়ার বিষয়ে বলেন, ‘পুকুরে পানি দেওয়ার জন্য পাইপ বসানো হয়েছে। পুকুরমালিকদের মধ্যে ঝামেলা হওয়ায় এখনো চুক্তি হয়নি।’ পুকুরে পানি দেওয়ার প্রমাণ মিলেছে জানালে তিনি বলেন, ‘মাছ চাষ তো কৃষির মধ্যেই পড়ে। খুব খরার মধ্যে মাছ মারা যাচ্ছিল। তাই ঘণ্টা চারেক পানি দেওয়া হয়েছে।’
তদন্ত ও কর্তৃপক্ষের অবস্থান
ঘটনা তদন্তে গিয়েছিলেন বিএমডিএর উপসহকারী প্রকৌশলী আবদুল হালিম। গত ২৯ এপ্রিল তিনি বলেন, সর্বশেষ তিন দিনের সময় দিয়ে যে চিঠি দেওয়া হয়েছিল, তার জবাব অপারেটর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই দিয়েছেন। সমিতি করার ব্যাপারে তিনি বলেন, কৃষকেরা সমিতির মাধ্যমে করতে চাইলে তো অপারেটরকে অবশ্য করতে হবে।
জানতে চাইলে বিএমডিএর দুর্গাপুর অঞ্চলের সহকারী প্রকৌশলী আহসান হাবীব বলেন, ‘চাষিরা সব পাট বুনেছে। মাত্র সাত থেকে আট বিঘা জমি পড়ে আছে। চাষিদের অভিযোগের ভিত্তিতে অপারেটরকে বাদ দিতে চাই; কিন্তু বিএনপি নেতারা বাদ দিতে দিচ্ছেন না। এটাই এখন সমস্যা।’
সরেজমিনে কোনো জমিতে পাট দেখা যায়নি, বরং পানি পুকুরে দেওয়া হচ্ছে—জানালে আহসান হাবীব বলেন, পুকুরে পানি দিলে অপারেটরকে তিনি বাদ দেবেন। বিএনপির নেতাদের কারণে বাদ দিতে পারছেন না উল্লেখ করলে তিনি বলেন, ‘বিএনপির মধ্যে দুই ভাগ আছে। যাদের দিয়ে হয়, তাদের মাধ্যমেই বাদ দেব।’
দুর্গাপুর উপজেলার পানানগর ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি আলী হোসেন সালিসে উপস্থিত ছিলেন। জানতে চাইলে আলী হোসেন বলেন, পাকা শর্ষেখেত পানি দিয়ে নষ্ট করা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মারামারি হয়েছিল। এ নিয়ে সালিস ছিল। তাঁরা সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন, এবার সমিতির মাধ্যমে নলকূপ চলবে। সমিতির সদস্যরা জমির পরিমাণ অনুযায়ী সেচের খরচ দেবে। কিন্তু পরে সমিতি করার জন্য অপারেটরের পক্ষ আর উপস্থিত হয়নি। অপারেটরকে বাদ দেওয়ার কথা উঠেছিল, তখন তাঁরা বলেছিলেন, ধান লাগানোর মৌসুম এসে গেছে। এখন অপারেটর বদলাতে গেলে ঝামেলা হবে। পরের মৌসুম থেকে তাঁকে বাদ দেওয়া হবে।



