উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে হাওর অঞ্চলে কমপক্ষে তিন হাজার বিঘা জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। এই অবস্থায় কৃষকরা তাদের স্বপ্নের সোনালী ফসল ধান পানির নিচ থেকে ডুবন্ত অবস্থায় কাটছেন। বছরের একমাত্র ফসল হারিয়ে নির্বাক কৃষকদের কষ্ট ও হতাশা যেন পিছু ছাড়ছে না।
হাওর অঞ্চলের বর্তমান অবস্থা
শনিবার (২ মে) নাসিরনগরের মেদির হাওর অঞ্চল ঘুরে দেখা গেছে, হাওরে আগাম বানের পানি আসায় কৃষকদের সোনালী আধাপাকা ধানগুলো পানির নিচে তলিয়ে আছে। দৈনিক ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা মজুরি দিয়ে শ্রমিক ভাড়া করে কৃষকরা তলিয়ে থাকা আধাপাকা ধান কাটছেন। ইতিমধ্যে ডুবে থাকা আধাপাকা ধানে পচন ধরতে শুরু করছে, যা হাওরের কৃষকদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করেছে।
কৃষকদের বক্তব্য
নাসিরনগরের মহাকাল পাড়ার কৃষক আবু লাল মিয়া জানান, তিনি ২০ কানি (৪০ শতকে এক কানি) জমিতে ধান চাষ করেছিলেন। মাত্র পাঁচ কানি জমির ধান পানির নিচ থেকে কেটে আনতে পেরেছেন, বাকি ১৫ কানি জমির ধান এখনও পানির নিচে তলিয়ে আছে। কী করবেন বুঝতে পারছেন না।
আক্ষেপ করে আবু লাল বলেন, "দাদন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে উচ্চ মূল্যে সুদের টাকা এনে জমিতে চাষ করেছিলাম। আশা ছিল, ধান বিক্রি করে দেনা পরিশোধ করবো। কিন্তু আশা এখন নিরাশায় পরিণত হয়েছে। বছরে একটি মাত্র ফসল নষ্ট হয়ে গেলো। এখন খাবো কী? আর চলবো কীভাবে, বুঝতে পারছি না।" তিনি এ বিষয়ে সরকারের সহযোগিতা কামনা করেছেন।
শ্রীপুর গ্রামের নারায়ণ দাস আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলেন, "পানির নিচে আমার ধান ডুবে আছে। চার কানি জমিতে বিআর-২৯ জাতের ধান লাগিয়েছিলাম। আর দুই সপ্তাহ সময় পেলে ধান বাড়িতে নিতে পারতাম। কিন্তু ধান কাটার আগ মুহূর্তে অকাল বন্যার দেখা দেওয়ায় এখন পানির নিচে তলিয়ে আছে। একটি মাত্র ফসলের ওপর পুরো বছর আমার পরিবারের বেঁচে থাকার একমাত্র ভরসা। কিন্তু সেই ফসল এখন পানি নিয়ে গেলো।"
হতাশাগ্রস্ত নারায়ণ দাস আরও বলেন, "পানির নিচ থেকে কেটে আনা একমণ ধানের দাম বর্তমান বাজারে ৬০০ টাকা। আর একজন ধান কাটার শ্রমিককে দিতে হয় দৈনিক ১৪০০ টাকা। পানির নিচ থেকে ধান কেটে এনে কী করবো? তাই ধানের জমির দিকে তাকিয়ে আছি আর ভাবছি, পানি যদি কমে, তাহলে কিছু ধান পাবো হয়তো।"
শ্রমিক মজুরি বেশি, লোকসানে কৃষক
নাসিরনগর পশ্চিম পাড়া এলাকার কৃষক বাবুল মিয়া বলেন, "২০ বিঘা ধান পানির নিচে। ধান কাটবো কী? ধানের চেয়ে শ্রমিকের মজুরি মূল্য বেশি।" নির্বাক চোখে হাওরে তাকিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক বাবুল বলেন, "সরকারের পক্ষ থেকে সহযোগিতা না করলে আমরা না খেয়ে মরবো।" তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "কৃষি বিভাগের কেউ এসে খবর নেয় না। জনপ্রতিনিধিও কৃষকের পাশে নেই। কী করবে হাওরের কৃষকরা, কান্না শোনার কেউ নেই।"
কৃষি বিভাগের বক্তব্য
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মোস্তফা এমরান হোসেন জানান, উজান থেকে নেমে আসা বানের পানিতে হাওরে প্রায় ৩০ ভাগ জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ বছর জেলায় এক লাখ ১১ হাজার ৭৭০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করা হয়েছে। নতুন জাতের ধানের আবাদ করার কারণে ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। হাওরের পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি বলেন, "অকাল বন্যায় লক্ষ্যমাত্রায় তেমন কোনও প্রভাব পড়বে না।"
অপরদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সহকারী খাদ্য নিয়ন্ত্রক নুর আলী জানান, এ বছর সরকার ৩৬ টাকা কেজি দরে ১১ হাজার ৫৫ মেট্রিক টন ধান সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে সংগ্রহ করবে। এতে কৃষকরা লাভবান হবেন।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বোরো মৌসুমে ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলে চার লাখ ৯০ হাজার মেট্রিক টন ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যার বাজার মূল্য ১৭৬৪ কোটি টাকা।



