নেত্রকোনায় বন্যায় তলিয়ে যাচ্ছে বোরো ফসল, হাজারো কৃষক ক্ষতির মুখে
নেত্রকোনায় বন্যায় তলিয়ে যাচ্ছে বোরো ফসল, হাজারো কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত

টানা বৃষ্টি ও উজানের পাহাড়ি ঢলে নেত্রকোনার হাওর, সমতল ও পাহাড়ি অঞ্চলে একের পর এক বোরো ফসলের জমি পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। এতে হাজার হাজার কৃষক পড়েছেন চরম ক্ষতির মুখে। নদ-নদীর পানি বেড়ে নিচু এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কাঁচা ঘরবাড়ি, ঘটছে প্রাণহানিও।

বৃষ্টিপাত ও নদীর পানি বৃদ্ধি

এপ্রিলের শুরু থেকেই বজ্রসহ বৃষ্টিপাত শুরু হলেও রবিবার বিকাল থেকে ভারি বৃষ্টি পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ১০১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে আবহাওয়া অধিদফতর।

জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা পর্যন্ত ভোগাই-কংস নদীর পানি জারিয়া-ঝানজাইল পয়েন্টে বিপদসীমার এক মিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। যা আগের দিন ছিল ৯৩ সেন্টিমিটার ওপরে। উপদাখালি নদীর পানিও বিপদসীমার ৭৩ সেন্টিমিটার ওপরে রয়েছে। তবে সোমেশ্বরী, মগড়া ও ধনু নদীর পানি এখনও বিপদসীমার নিচে থাকলেও পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ফসলের ক্ষতি ও কৃষকের দুর্ভোগ

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যমতে, এ বছর জেলায় এক লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৭ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়। এর মধ্যে ইতোমধ্যে ৯ হাজার হেক্টরের বেশি জমির ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে।

কলমাকান্দা উপজেলার কৃষক আবুল মিয়া বলেন, ‘১৫ কাঠা জমির ধান পানিতে তলায়া গেছে। আর কিছু করার নাই— চোখের সামনে সব শেষ অইতাছে।’ মদন উপজেলার কৃষক গফুর মিয়া বলেন, ‘১২০ কাঠার মধ্যে ২০ কাঠা পানিতে গেছে। কাটার পর ধানও শুকাইতে পারতাছি না, বিক্রিও করতে পারতাছি না।’

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বৃষ্টির কারণে ধান কাটার গতি কমে গেছে। যেখানে প্রতিদিন হাওরে আড়াই হাজার হেক্টর জমির ধান কাটা হতো, তা কমে এখন এক হাজার হেক্টরের নিচে নেমে এসেছে। শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় ৬ হাজার শ্রমিক চেয়ে ঢাকায় আবেদন করা হয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ঘরবাড়ির ক্ষতি ও প্রাণহানি

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের তথ্যমতে, টানা বৃষ্টিতে ১০ উপজেলার ৭৪১টি ঘরবাড়ি আংশিক ও সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১৫ পরিবারের ৬০ জন মানুষ সরাসরি ক্ষতির শিকার হয়েছেন। এপ্রিল মাসে বজ্রাঘাতে অন্তত ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন আরও একজন।

ত্রাণ ও প্রশাসনের প্রস্তুতি

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মুহাম্মদ রুহুল আমীন জানান, ‘১৭ হাজার ৭১৭ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় নৌযানসহ উদ্ধার টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে।’ ত্রাণ সহায়তার জন্য চাহিদাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে– ২৭০ টন জিআর চাল; ৭ লাখ টাকা নগদ সহায়তা; ২ হাজার ৩৪০ বান্ডিল ঢেউটিন; কৃষকদের পুনর্বাসনে প্রায় ১৯ কোটি ৬৫ লাখ টাকা প্রয়োজন।

জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, ‘কৃষকের বোরো ধান কাটাসহ বন্যা মোকাবিলায় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। উপজেলা পর্যায়ে ইউএনওদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় ত্রাণ-সামগ্রী রয়েছে। আরও চাহিদাপত্র পাঠানো হচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘জনপ্রতিনিধিসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষদের সহযোগিতায় দুর্যোগ মোকাবিলা করা হবে। আশা করছি, সবাই মিলে সংকট কাটিয়ে উঠতে পারবো।’