এক হারিয়ে যাওয়া ভূদৃশ্যের প্রতিধ্বনি
তবু ভূমি ভুলে যায়নি। এখনো কোথাও কোথাও প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে আছে বয়স্ক শালসদৃশ গাছ, ঝোপঝাড়ে ঢাকা জমি, এলোমেলো গুল্ম আর নীরবে জায়গা দখল করে নেওয়া ঘাসের আস্তরণ। পুরোনো উইয়ের ঢিবিগুলো এখন ছেয়ে গেছে বুনো উদ্ভিদের আচ্ছাদনে। কাছেই একটি মৃতপ্রায় নদী, যা এখন চওড়া খালের রূপ নিয়ে ধীরে ধীরে বয়ে চলেছে কালের সাক্ষী হয়ে। জমে থাকা নিচু জলাশয়গুলো গবাদি পশুর তৃষ্ণা মেটায়। আর সেই পানির টানে পাখি ও ব্যাঙরা সেখানে জড়ো হয়।
বৃষ্টি যখন ভূমিকে নতুন করে লেখে
রাতের স্বল্পস্থায়ী তবে প্রবল বৃষ্টি এই শান্ত ভূদৃশ্যকে একলহমায় বদলে দিল। নিচু তৃণভূমি ভরে উঠল অস্থায়ী জলে। তৈরি হলো ক্ষুদ্র, ঝিকিমিকি জলাশয়, যাদের জীবন ক্ষণিকের। কিন্তু সেই অল্প সময়েই সেখানে শুরু হলো প্রকৃতির এক বিস্ময়কর জীবনের উৎসব।
স্বর্ণসমাবেশ
এই জলাশয়গুলো মুহূর্তেই পরিণত হলো প্রণয়ক্ষেত্রে। প্রায় এক শ কোলাব্যাঙ প্রজননের উচ্ছ্বাসে ভরপুর হয়ে একত্র হলো সেখানে। পুরুষ ব্যাঙগুলো বৃষ্টিপাতে দীপ্ত স্বর্ণবর্ণ ধারণ করেছে। ওদের গায়ে উজ্জ্বল হলুদের নানা আভা, আর গলার দুই পাশে ফুলে ওঠা গাঢ় নীল স্বরথলি, যা দেখতে দুটি বেলুনের মতো। ওদের শব্দ প্রায় অনেকটাই রাবারের ভেঁপুর মতো। প্রতিটি ডাকের সঙ্গে সঙ্গে সেই থলিগুলো ফুলে উঠে সৃষ্টি করছিল গভীর, অনুরণিত 'ঘ্যা ঘু' বা 'ঘ্যা গু' ধ্বনি। এই গম্ভীর ডাক ভেজা বাতাসে ভেসে অন্তত আধা কিলোমিটার দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ছিল। আমি এলাকায় ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে কান ভরে ওঠে ব্যাঙের ডাকে।
শব্দের প্লাবন, কথার অবসান
সেই অস্থায়ী প্রজননমঞ্চে যখন পৌঁছালাম, তখন আমার সহযোগীর সঙ্গে কথা বলা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠল। চারপাশে শুধু ডজন ডজন পুরুষ ব্যাঙের ডাক, যেন এক সিম্ফনি। প্রতিটি কণ্ঠে একটাই চেষ্টা—নিজেকে শোনানো, নিজের অস্তিত্বের জানান দেওয়া এবং স্ত্রী কোলাব্যাঙের কাছে আকর্ষণীয় প্রমাণিত হওয়া এবং শেষে নির্বাচিত মিলনসঙ্গী হওয়া। এটা আদতেই প্রকৃতির এক অমোঘ নিয়ম।
কণ্ঠস্বরের লড়াই, সঙ্গী পাওয়ার লড়াই
কিন্তু কণ্ঠস্বরই শেষ কথা নয়। সেই তীব্র ডাকের মধ্যেই চলছিল অবিরাম স্ত্রী ব্যাঙ নির্বাচনের প্রতিযোগিতা। পুরুষেরা ধাক্কাধাক্কি করছে, লড়াই করছে, এমন জায়গা দখলের চেষ্টা করছে, যেখান থেকে ওদের ডাক আরও দূরে পৌঁছাবে। স্ত্রী ব্যাঙের সংখ্যা কম, তাই একটি সঙ্গিনী পাওয়ার প্রতিযোগিতাও তীব্র। ভুলবশত একে অপরকে আঁকড়ে ধরা, ব্যর্থ সঙ্গমচেষ্টা যেন সবই এই বিশৃঙ্খলার অংশ। শেষ পর্যন্ত জয় নির্ভর করে একটা দক্ষতার ওপর—একটি সোমত্ত ডিম্বাণুভরা স্ত্রী ব্যাঙকে শক্ত করে ধরে রেখে যৌনমিলনের ক্ষমতা।
অ্যামপ্লেক্সাস—টিকে থাকার আঁকড়ে ধরা
পুরুষটি ব্যাঙটি অবশেষে স্ত্রী ব্যাঙকে আঁকড়ে ধরে (প্রক্রিয়াটিকে বলে 'অ্যামপ্লেক্সাস')। আর আঁকড়ে ধরার মুহূর্ত থেকে ও হয়ে ওঠে অন্য সবার লক্ষ্যবস্তু। চারদিক থেকে সঙ্গীহীন পুরুষেরা ছুটে আসে। ওকে ছাড়ানোর জন্য সজোরে লাথি মারে, ধাক্কা দেয় বা আঘাত করে—সবই তখন চলে চারদিকে। তবু আঁকড়ে ধরা পুরুষটি অসাধারণ শক্তিতে অটল থাকে। স্ত্রী ব্যাঙের পিঠে চেপে তাকে দারুণভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে জাপটে ধরে রাখে। স্ত্রী ব্যাঙটি এ অবস্থায় অগভীর জলে ঘুরে বেড়ায়, খুঁজে বেড়ায় এমন একটি নিরাপদ স্থান, যেখানে ও ডিম পাড়তে পারবে। ওর চারপাশে তখনো চলছে লড়াই, লাফালাফি ও ধস্তাধস্তি।
ক্ষণস্থায়ী জলে জন্ম
অবশেষে নিরাপদ স্থান খুঁজে পেলে স্ত্রী ব্যাঙটি জেলির মতো ডিম ছাড়ে, গুচ্ছাকারে। পুরুষটি তখনো ওকে আঁকড়ে ধরে থেকে সেই ডিমগুলো নিষিক্ত করে। অগভীর ও ক্ষণস্থায়ী পানিতে শুরু হয় এক নতুন জীবনের যাত্রা।
ঝড়ের পরের নীরবতা
যেভাবে হঠাৎ এই দৃশ্য ও কোলাব্যাঙের মিলনমেলা শুরু হয়েছিল, সেভাবে হঠাৎ করেই যেন তা মিলিয়ে যেতে লাগল। মেঘ সরে গেল এবং সূর্যের আলো ছড়িয়ে পড়ল। নতুন কোনো স্ত্রী ব্যাঙ না আসায় পুরুষেরা হাঁকডাক বন্ধ করে ধীরে ধীরে সরে যেতে লাগল। তাদের উজ্জ্বল রং ম্লান হলো এবং ডাক স্তিমিত হলো। আর একসময়ের ব্যাঙের ডাকাডাকির 'গর্জন'ময় প্রান্তর ধীরে ধীরে ফিরে গেল আগের নীরবতায়।
এক বিলীয়মান সিম্ফনি
এ অভিজ্ঞতা কেবল একটি দৃশ্য নয়, এক গভীর উপলব্ধি। এমন দৃশ্য হয়তো এখনো গ্রামবাংলার কোথাও দেখা যায়, কিন্তু দ্রুত বদলে যাওয়া ভূদৃশ্যের সঙ্গে সঙ্গে তা ক্রমেই বিরল হয়ে উঠছে। ঠিক সময়ে, ঠিক জায়গায় উপস্থিত থাকতে পারলে তবেই দেখা মেলে এই প্রাকৃতিক মহড়ার। বর্ষার বুকে জীবনের এক অপূর্ব সিম্ফনি, যা আমাদের চারপাশেই ঘটে, অথচ প্রায় অদেখাই থেকে যায় আমাদের জীবনের কোনো দিন শেষ না হওয়া ব্যস্ততার মধ্যে।



