টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে তলিয়ে গেছে কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম হাওরের কয়েক হাজার হেক্টর বোরো ধানের জমি। অনবরত নদী উপচে পানি ঢুকছে হাওরে। পানির নিচ থেকে আধাপাকা ধান কাটলেও দুই দিনের বৈরী আবহাওয়ায় ধান কাটা বন্ধ পুরো হাওরে। কিন্তু ধান কেটে শেষ করতে না পারলে, হাওরের অবশিষ্ট একমাত্র ফসল বোরো ধান পুরোপুরি পানিতে তলিয়ে যাওয়ার শঙ্কায় কৃষকরা।
বৃষ্টিপাতের রেকর্ড ও পূর্বাভাস
নিকলী আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ১৬০ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী আরও কয়েকদিন এমন ভারী বৃষ্টি থাকবে। আর বৃষ্টির এমন ধারাবাহিকতায় বড় ক্ষতির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, হাওরের বোরো ধানের। কখন বৃষ্টি থামবে, আর কখন এই ধান গোলায় তুলবে। আবার বৃষ্টির সঙ্গে রয়েছে বজ্রাঘাতে মৃত্যুর ঝুঁকি। সবমিলিয়ে হাওরের কৃষকদের চোখে মুখে এখন হাহাকার।
কৃষক ফুল মিয়ার স্বপ্ন ভঙ্গ
হাওরের পানিতে তলিয়ে গেলো অষ্টগ্রাম উপজেলার আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়নের কৃষক ফুল মিয়ার সারা বছরের স্বপ্ন। তিনি এবার ধানের আবাদ করেছিলেন, ১০ একর জমিতে। জমির সোনালি বোরো ধান আজ হাওরের করাল গ্রাসে নিমজ্জিত। যে ধান কয়েকদিন পর ঘরে তোলার কথা ছিল, যে ধান আমার পরিবারের সারা বছরের আহার আর বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন ছিল, তা আজ পচা পানির নিচে ডুবে আছে। বুক সমান পানিতে নেমেও শেষ রক্ষা করতে পারেননি। তিনি প্রশাসনের কাছে এই বিশাল আর্থিক ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে আর্থিক প্রণোদনা ও সরকারি সহযোগিতা চেয়েছেন।
অন্যান্য কৃষকদের দুর্দশা
অষ্টগ্রাম হাওরের কৃষক কামরুল ইসলাম বলেন, দেড় একর জমিতে এবার ব্রি-৮৮ ধান চাষ করেছিলাম। ধান পেকে যাওয়ায় কাটতেও শুরু করেছি। মাত্র ৪০ শতাংশ ধান কাটা শেষ করেছি। এরই নদীতে পানি চলে আসায় আমার বেশির ভাগ ধান পানির নিচে চলে গেছে। এখন আধাপাকা ধান কোনোভাবে কেটে নিয়ে যাচ্ছি। হয়তো রোদ পেলে শুকিয়ে নিজের জন্য খাওয়া যাবে। কিন্তু বাজারে বিক্রির কোনও উপায় নেই। এদিকে রয়েছে ঋণের বোঝা। কীভাবে এতসব সামলাবো ভেবেই কুল কিনারা পাচ্ছি না।
আরেক কৃষক বেলাল ভূঁইয়া এ বছর ধান চাষ করেছিলেন প্রায় ৩ একর জমিতে। তিনি বলেন, এই হাওরে আমার মতো অনেক কৃষকের একরের পর একর ধানি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। আমাদের জমি তলিয়ে যাওয়ার কারণ হলো শিবপুর নদী। এ ছাড়াও আরও কিছু নদী আছে সেগুলোতে যদি হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করে দেওয়া হয়, তাহলে হয়তো আমরা ভবিষ্যতে এমন দুর্যোগ থেকে বাঁচতে পারবো। নয়তো কৃষকরা না খেয়ে মারা যাবে।
কৃষি বিভাগের পরামর্শ ও বাস্তবতা
এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক ডা. সাদেকুর রহমান জানান, ইতিমধ্যে জেলার হাওরাঞ্চলে আবাদ করা এক লাখ ৪ হাজার হেক্টর বোরো ধানের ৫০ শতাংশ কাটা শেষ হয়েছে। আগেই কৃষকদেরকে ৮০ ভাগ ধান পাকলেই কাটার পরামর্শ দেয় কৃষি বিভাগ। এখন ৫০ শতাংশ ধান আধাপাকা অবস্থায় কাটতে রীতিমতো মাইকিং করা হচ্ছে। কিন্তু কৃষকরা চেষ্টা করলেও তাতেও আর কোনও লাভ হচ্ছে না। কারণ বৃষ্টির প্রভাবে কাটা যাচ্ছে না হাওরের ধান। আসলে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে কারও কিছুই করার থাকে না। তবুও যদি আবহাওয়া একটু ভালো হয়, দ্রুত বাকি ধানগুলোও কেটে ফেলতে হবে।



