প্রধানমন্ত্রী তারিক রহমান বুধবার সংসদে ঢাকাকে 'পরিচ্ছন্ন ও সবুজ শহর' হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সরকারের ১২ দফা কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেছেন।
পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতা বৃদ্ধি
প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীনে রাজধানী ঢাকাকে পরিচ্ছন্ন ও সবুজ শহর হিসেবে গড়ে তোলার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।' তিনি সংসদে ট্রেজারি বেঞ্চের সদস্য আবুল কালামের (কুমিল্লা-৯) এক প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন। সাপ্তাহিক সচেতনতামূলক কর্মসূচির মাধ্যমে নাগরিক সচেতনতা ও সম্পৃক্ততা বাড়ানোর পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে। সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (বর্জ্য ফেলার স্থান) আধুনিকীকরণের মাধ্যমে ল্যান্ডস্কেপিং, সবুজায়ন ও সচেতনতামূলক গ্রাফিতি দিয়ে পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
মাতুয়াইল ল্যান্ডফিল থেকে জিরো ওয়েস্ট
প্রধানমন্ত্রী জানান, কোরিয়ার একটি বেসরকারি কোম্পানির বিনিয়োগে মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলকে একটি সমন্বিত সার্কুলার ইকোনমি-ভিত্তিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও শক্তি উৎপাদন কেন্দ্রে রূপান্তরের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যার লক্ষ্য জিরো ওয়েস্ট অর্জন। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, এসব কার্যক্রম ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ধীরে ধীরে একটি পরিচ্ছন্ন ও সবুজ ঢাকা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
বৃক্ষরোপণ ও সবুজায়ন
ঢাকাকে পরিচ্ছন্ন ও সবুজ শহর হিসেবে গড়ে তোলার অন্যান্য উদ্যোগের অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) আওতায় রোড মিডিয়ান, রোড আইল্যান্ড ও খোলা জায়গায় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। একইভাবে, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) আওতায় বিভিন্ন এলাকায় নগর বনায়ন (মিয়াওয়াকি বন) বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, এবং খোলা মিডিয়ানগুলোকে জিরো-সয়েল ও সবুজ আচ্ছাদিত স্থানে রূপান্তর করা হচ্ছে। আগামী পাঁচ বছরে ডিএনসিসির আওতায় ৫ লাখ গাছ লাগানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। মিরপুর-১২ থেকে মিরপুর ডিওএইচএস পর্যন্ত মেট্রোরেল লাইনের নিচে এবং আব্দুল্লাহপুর থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নিচের খালি জায়গায়ও গাছ লাগানো হবে।
পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ
লিখিত বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পরিচ্ছন্ন ও সবুজ ঢাকা গড়তে পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তর ও ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) যৌথভাবে আধুনিক বাস সার্ভিস চালু ও ২৫০টি বৈদ্যুতিক বাস পরিচালনার কাজ করছে। বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ঢাকার বায়ুদূষণের প্রধান উৎস চিহ্নিত করা হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তর শহরে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে। কালো ধোঁয়া নির্গত যানবাহন ও নির্মাণ সামগ্রী এবং নির্মাণকাজের কারণে দূষণের বিরুদ্ধে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। ঢাকার আশেপাশে অবৈধ ইটভাটা বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং সাভার উপজেলাকে বায়ুদূষণ সংকটাপূর্ণ এলাকা ঘোষণা করে সেখানে ইটভাটা পরিচালনা ও খোলা জায়গায় বর্জ্য পোড়ানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
নদী ও খাল দূষণ রোধ
ঢাকা ও এর আশেপাশের নদী, খাল ও জলাশয় দূষণ রোধে তরল বর্জ্য নিঃসরণকারী শিল্পের জন্য ইটিপি স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত ২৪৮টি প্রতিষ্ঠান ইটিপি স্থাপন করেছে এবং এসব ট্রিটমেন্ট সিস্টেমের রিয়েল-টাইম মনিটরিংয়ের জন্য ক্যামেরা স্থাপন চলছে। পরিবেশ অধিদপ্তর ইতিমধ্যে বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালু ও তুরাগ নদীর দূষণের উৎস ও প্রকৃতি চিহ্নিত করেছে। একইসঙ্গে ঢাকা শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ১৯টি প্রধান খালের দূষণের উৎস ও প্রকৃতিও চিহ্নিত করা হয়েছে।
বন বিভাগের উদ্যোগ
ঢাকা শহরকে আরও সবুজ করতে, পরিবেশ দূষণ কমাতে ও সামগ্রিক সৌন্দর্য বাড়াতে বন বিভাগ ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগের যৌথ উদ্যোগে বৃক্ষরোপণ ও জিরো-সয়েল কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এই উদ্যোগের অধীনে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে রোড মিডিয়ান, ইউ-লুপ, পন্ডিং এলাকা ও খালের পাড়ে বৃক্ষরোপণ করা হয়েছে। এ পর্যন্ত ফলবান, বনজ, ঔষধি ও শোভাবর্ধনকারী গাছের মোট ৪১,৫৬৫টি চারা রোপণ করা হয়েছে। ঢাকা শহরের দূষণ কমাতে মাটি বিভিন্ন ধরনের লতা, গুল্ম ও ঘাস দিয়ে আচ্ছাদিত করা হচ্ছে। আগামী পাঁচ বছরে সারা দেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর জাতীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে ঢাকাকে পরিচ্ছন্ন ও সবুজ শহর হিসেবে গড়ে তোলার জন্য উপলব্ধ খালি জায়গা ও বনায়নের উপযোগী জমিতে গাছ লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।



