সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে ধান কাটার মৌসুমে চরম বিপাকে পড়েছেন কৃষকেরা। উৎপাদন খরচ বাড়লেও ধানের দাম কম, অন্যদিকে শ্রমিক সংকট ও বন্যায় অনেক জমির ধান তলিয়ে গেছে। এই অবস্থায় কৃষকেরা লোকসানে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।
শ্রমিক সংকট ও বন্যা
মধ্যনগর উপজেলার কৃষক শফিক মিয়া বলেন, ‘ধান কাটার শ্রমিক নিয়ে বিপাকে পড়েছি। না পারছি কাটাতে, না পারছি ফেলতে। সবকিছুর দাম বাড়ে কিন্তু ধানের দাম বাড়ে না। এক মণ ধান উৎপাদনে খরচ এক হাজার ১০০ টাকার বেশি পড়েছে, অথচ বিক্রি করতে হচ্ছে ৬০০ টাকায়। আবার ধান কাটার শ্রমিককে দিতে হচ্ছে এক হাজার টাকা। এ অবস্থায় হারভেস্টর মেশিনের পেছনে ঘুরতে ঘুরতে বন্যা চলে এলো। অধিকাংশ জমির ধান ডুবে গেলো। এখন সবই গেলো।’
একই অবস্থা জেলার হাওরাঞ্চলের অন্যান্য কৃষকেরও। তাদের ভাষ্যমতে, সরকার প্রতি কেজি ধানের দাম ৩৬ টাকা নির্ধারণ করলেও ক্ষেতে কাঁচা ধানের মণ বিক্রি করতে হচ্ছে ৬০০ টাকা। আধা শুকনো মোটা জাতের ধানের মণ ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকা, আর শুকনো চিকন জাতের ধানের মণ ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা দরে বিক্রি করছেন কৃষকেরা।
আড়তদারদের বক্তব্য
সদর, মধ্যনগর, দিরাই, মোহনগঞ্জ ও ধর্মপাশার ধানের আড়তদারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এখনও পুরোদমে ধান কেনাবেচা শুরু হয়নি। বেশিরভাগ ধান কাটা এখনও বাকি। তবে কিছু কৃষক ধান কাটার শ্রমিক মজুরি ও নিজেদের খরচের জোগান দিতে ভেজা ধান বিক্রি করছেন। এজন্য দাম কম পাচ্ছেন।
মধ্যনগর গ্রামের কৃষক মানিক মিয়া বলেন, ‘গত বছরের চেয়ে এবার ফলন অনেক কম হয়েছে। মধ্যনগর উপজেলার আড়তে গতবার এই সময়ে যে পরিমাণ ধান ওঠতো এখন সেই পরিমাণ উঠেনি। ধান কাটা শ্রমিকের মজুরি দিতে ভেজা ধানের মণ বিক্রি করছি ৬০০ টাকায়। এর বেশি দাম পাচ্ছি না। বাধ্য হয়ে বিক্রি করছি।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মধ্যনগর উপজেলার ধানের আড়তদার মজিবুর রহমান বলেন, ‘আমাদের আড়তে ভেজা ধান কেনা হয় না। তবে গতবারের চেয়ে এবার ধান কম আসছে আড়তে। উপজেলার বেশিরভাগ জমির ধান কাটা শেষ হয়নি। যারা কেটেছেন, তারা কম দামে ভেজা ধান বিক্রি করছেন।’
একই উপজেলার আরেক আড়তদার মহসিন আহমেদ বলেন, ‘সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের ধান নিয়ে প্রতি বছর কৃষকেরা বিপদে পড়েন। তবে এ বছরের মতো এত বড় বিপদে পড়েননি। ধান কাটার শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না, আবার পেলেও মজুরি লাগছে এক হাজার টাকা। এরপর বৃষ্টির কারণে ধান মাড়াই ও শুকানো যাচ্ছে না। সবশেষে পরিবহন খরচ দিয়ে বাজারে আনতে প্রতি মণ ধানে কৃষকের খরচ হচ্ছে এক হাজার ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা। আড়তে এনে বিক্রি করার পর কৃষক পাচ্ছেন সর্বোচ্চ এক হাজার ৪০০ টাকা।’
উৎপাদন খরচ ও লোকসান
কৃষকেরা জানিয়েছেন, এবার ধান উৎপাদনে খরচ বেড়েছে। সার, ডিজেল, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি বাড়ায় গত বছরের চেয়ে উৎপাদন খরচ বেড়েছে ২৫ শতাংশ। এতে প্রতি মণ উৎপাদনে খরচ পড়েছে এক হাজার ১০০ টাকার বেশি। কিন্তু ৬০০-৭০০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে মণ। ফলে লোকসানে আছেন কৃষকেরা। অনেক এলাকায় বর্গা চাষিদের প্রতি মণ ধান উৎপাদনে খরচ পড়েছে এক হাজার ৪০০ টাকার মতো।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে এক মণ ধান উৎপাদনে বীজ রোপণ, চারা উত্তোলন, জমি চাষ, চারা রোপণ, সার, সেচ, শ্রমিকের মজুরি, নিড়ানি, ধান কাটা, মাড়াই-ঝাড়াই, শুকানো, পরিবহন ও শ্রমিকের মজুরিসহ এক হাজার ২০০ টাকা লাগে। এ বছর মণ প্রতি আরও ১০০ টাকা বেশি লেগেছে। এর সঙ্গে ধান কাটা শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে ২০০-৩০০ টাকা, যা আগে ৭০০ টাকা ছিল। মোট উৎপাদন খরচ এক হাজার ৫০০-৬০০ টাকা পড়েছে। গতবার এমন দিনে ভেজা ধানের মণ ৭০০-৮০০ টাকা ও শুকনো ১১০০-১২০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।
এ বছর আবহাওয়ার কারণে শুকাতে না পারায় ধানের রঙ নষ্ট হয়েছে। সময়মতো বৃষ্টিপাত না হওয়ায় ফলন কমেছে। পাশাপাশি সেচ সংকটে জ্বালানি খরচ বেশি লেগেছে। ধর্মপাশার কৃষকেরা জানিয়েছেন, এবার ধান উৎপাদনে খরচ বেশি পড়েছে। শুরুতে হাওরের পানি দেরিতে নামায় চাষাবাদে ১০ দিন পিছিয়ে যান তারা। পরে দেরিতে চাষাবাদ শুরু করেন। তখন উঁচু জমিতে সেচ সংকটের কারণে শ্যালো মেশিনে সেচ দিয়ে ধান রোপণ করতে হয়। এপ্রিলের শুরুতে বৃষ্টিতে নিচু জমি তলিয়ে যায়। এর মধ্যে জ্বালানি সংকট ও দাম বাড়ায় সেচ খরচ বেড়েছে। সবমিলিয়ে সরকারি দামে ধান বিক্রি করলেও লোকসান হবে কৃষকদের।
বৃষ্টি ও বজ্রাঘাতের প্রভাব
একাধিক কৃষক জানান, প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ধান শুকাতে পারছেন না তারা। এজন্য ভেজা ধান ৬০০ টাকায় বিক্রি করছেন। আবার বজ্রাঘাতের কারণে হাওরে ধানকাটা শ্রমিকের সংকট দেখা দিয়েছে। কোনও শ্রমিক রাজি হলে তাকে এক হাজার টাকা মজুরি দিতে হচ্ছে। একেক শ্রমিক ছয়-সাত ঘণ্টা ধান কাটেন। সর্বোচ্চ একজন শ্রমিক দুই মণ ধান কাটতে পারেন। হিসাবে প্রতি মণে মজুরি ৫০০ টাকা পড়ছে।
ইতিমধ্যে সোমবার রাত ও মঙ্গলবার সকালের ভারী বৃষ্টিতে অনেক হাওরের জমির ধান তলিয়ে গেছে। আবার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেকের শুকানোর খলায় রাখা ধানও নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে বড় লোকসানে পড়েছেন কৃষকেরা।
কৃষকদের বক্তব্য
সুনামগঞ্জ হাওর ও নদীরক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক বলেন, ‘চোখের সামনে অনেক কৃষকের ধান তলিয়ে যাচ্ছে। কৃষকেরা কাঁদছেন। অনেক কৃষক আধা ভাগিতেও ধান কাটা শ্রমিক পাচ্ছেন না। হাওরে কৃষকের অসহায়ত্ব ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। সত্যিকার অর্থে কৃষকের পাশে কেউ নেই।’
সদর উপজেলার মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের ইচাগরি গ্রামের আতাহার আলী দুই লাখ টাকার বেশি খরচ করে ২৪ বিঘা জমিতে উফশী ও হাইব্রিড ধান আবাদ করেন। এরই মধ্যে বৃষ্টিতে চার বিঘার ধান কাঁচাই তলিয়ে যায়। এ ছাড়া চাষের শুরুতে শিলাবৃষ্টি ও বৈরী আবহাওয়ায় ধানের ফলন অনেক কম হয়েছে। এরপরও আশা করছিলেন ৩৫০ মণ পাবেন। বৃষ্টিতে ডুবে যাওয়ায় এখন দেড় থেকে ২০০ মণের আশা করছেন। এসব ধান কাটাতে শ্রমিকের মজুরি লাগবে অন্তত এক লাখ টাকা। সবমিলিয়ে এবার তার খরচই উঠবে না।
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার পলাশ ইউনিয়নের মুক্তিখলা গ্রামের কৃষক আব্দুল মালিক বলেন, ‘গেলো চার বছর ফসল ভালো হয়েছিল। এবার ভালো হয়নি। ধান কাটার পর মাড়াই করা ও শুকানো যাচ্ছে না। প্রতি রাতে বৃষ্টি হচ্ছে। দিনের বেলায় আকাশ মেঘলা থাকে। তাই কাটা ধান শুকাতে পারছি না। সংরক্ষণও করতে পারছি না। এজন্য অনেকে ভেজা ধান ৬০০ টাকা মণ দরে বিক্রি করে দিচ্ছেন। অথচ একেক মণ ধান উৎপাদনে খরচ পড়েছে এক হাজার ১০০ টাকা, শ্রমিক দিয়ে কাটাতে লাগছে ৫০০ টাকা, মাড়াই করতে ও আড়তে নিতে লাগছে আরও ১০০ টাকা। সবমিলিয়ে প্রতি মণে খরচ পড়েছে এক হাজার ৭০০ টাকা।’
মধ্যনগর উপজেলার চামরদানী ইউনিয়নের ঢুলপশি গ্রামের কৃষক নিহার রঞ্জন বলেন, ‘ধান চাষ করতেই সব টাকা শেষ হয়ে যায়। কাটার সময় হাতে টাকা থাকে না। ক্ষেতের ধানই নগদ টাকা। ধান কাটার মজুরি ও মাড়াই খরচ নগদ দিতে হয়। তাই পাইকার ডেকে ৬০০ টাকা দরে বিক্রি করে খরচ দিতে হচ্ছে।’
ঘাসি গ্রামের কৃষক সুদিন দাস বলেন, ‘দুর্যোগের সময় সরকার যদি ভেজা ধান কিনে মিলিংয়ের ব্যবস্থা করতো তাহলে কম দামে বিক্রি করতে হতো না। আমাদেরও ভেজা ধান নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হতো না।’
কৃষি বিভাগের তথ্য
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যমতে, জেলায় এবার ১৩৭টি হাওরে দুই লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন। জেলায় এ পর্যন্ত ৯৯ হাজার ৪৮৩ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে। সবমিলিয়ে হাওর ও নন হাওরে ৪৪ শতাংশ জমির ধান কাটা হয়েছে।
হাওরে বোরো ধান কাটায় এখন কৃষকেরা হারভেস্টর মেশিনের ওপর বেশি নির্ভর করেন। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে হাওরে পানি থাকায় অনেক স্থানে মেশিন চালানো যাচ্ছে না। শিলাবৃষ্টিতে ৫৩৮ হেক্টর ও জলাবদ্ধতায় ১ হাজার ৫০৯ হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানি না নামলে আরও কিছু জমির ধান পচে নষ্ট হবে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, ‘সংকটময় পরিস্থিতির মধ্যেও কৃষকেরা মাঠে আছেন। চেষ্টা করছেন ধান তোলার জন্য। আমরাও প্রয়োজনীয় পরামর্শ, সহযোগিতা করার চেষ্টা করছি। কিন্তু গত দুই দিনের বৃষ্টি ও ঢলে অধিকাংশ জমির ধান ডুবে গেছে। জেলার সব উপজেলায় ধান কাটা চলছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আগামী ১৫ মে’র মধ্যে ধান কাটা শেষ হবে।’



