শেরপুরের শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী—সীমান্তবর্তী এই তিন উপজেলার গারো পাহাড়ের ঢালে এখন এক অপূর্ব দৃশ্য। দিগন্তজোড়া সবুজের সমারোহ আর ধানের শিষে বাতাসের দোলা কৃষকের মনে সোনালি স্বপ্নের বীজ বুনেছে। চলতি মৌসুমে প্রায় ৯ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চমৎকার ফলন হয়েছে, যা কেবল কৃষকের শ্রমের ফসল নয়, বরং দেশের খাদ্যনিরাপত্তার অংশও। তবে প্রতিবছরের মতো বন্য হাতির উপদ্রবে সেই ফসল ঘরে তোলা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
কৃষকের নিয়তি বন্য হাতির আক্রমণ
বিগত কয়েক দশক ধরে গারো পাহাড়ের কৃষকদের জন্য নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে এক অদ্ভুত নিষ্ঠুর পরিহাস। যখনই ধান পাকে বা ফসল ঘরে তোলার সময় হয়, তখনই পাহাড় থেকে নেমে আসে বন্য হাতির দল। বন বিভাগের তথ্যমতে, শতাধিক হাতি এখন কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে লোকালয়ের কাছাকাছি অবস্থান করছে। ফসল রক্ষা করতে এখন কৃষকদের কাটাতে হচ্ছে নির্ঘুম রাত। মশাল জ্বালিয়ে বা পটকা ফাটিয়ে হাতি তাড়ানোর এই আদিম ও ঝুঁকিপূর্ণ লড়াইয়ে প্রতিবছরই যেমন প্রাণ হারাচ্ছেন সাধারণ মানুষ, তেমনি মারা পড়ছে বিলুপ্তপ্রায় বন্য প্রাণীও।
ক্ষতিপূরণের প্রশ্ন
বন বিভাগ ও কৃষি দপ্তরের ভাষ্যমতে, হাতির আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ক্ষতিপূরণ কি ফসলের প্রকৃত মূল্যের সমান? একজন কৃষকের হাড়ভাঙা খাটুনি আর ফসল ঘরে তোলার যে আবেগ, তা কি সামান্য কয়েক টাকা দিয়ে মেটানো সম্ভব? তা ছাড়া ক্ষতিপূরণ পাওয়ার দীর্ঘসূত্রতা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কথা সর্বজনবিদিত। ফলে অনেক কৃষকই বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে কৃষিবিমুখ হয়ে পড়ছেন।
সরকারি উদ্যোগের কার্যকারিতা
বন্য হাতির এই সংকট নিরসনে সরকারের পক্ষ থেকে সোলার ফেন্সিং (সৌরবিদ্যুৎ–চালিত বেড়া) বা বায়ো-ফেন্সিংয়ের মতো কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও তার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। হাতির বিচরণক্ষেত্রে পর্যাপ্ত খাদ্যের অভাবই তাদের লোকালয়ে টেনে আনে। পাহাড়ের বনাঞ্চল উজাড় হওয়া এবং হাতির করিডরগুলো দখল হয়ে যাওয়ার ফলে এই মানুষ-হাতির দ্বন্দ্ব আজ প্রকট আকার ধারণ করেছে।
দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের প্রয়োজনীয়তা
আমরা মনে করি, কেবল ধান পাকার সময় ‘এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম’ গঠন করে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। কৃষকের ফসল রক্ষা এবং বন্য প্রাণীর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। পাহাড়ে হাতির পর্যাপ্ত খাদ্যের সংস্থান করা, করিডরগুলো পুনরুদ্ধার করা এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে ফসলি জমি ও বসতি রক্ষা করতে হবে। কৃষি, কৃষক ও বন্য প্রাণী—সবার সুরক্ষার কথাই আমাদের ভাবতে হবে।



