পেকুয়ায় স্লুইসগেট ভেঙে লবণের মাঠ তলিয়ে, হাজার চাষির স্বপ্ন ভেসে গেল
কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলায় পূর্ণিমার অস্বাভাবিক জোয়ারের পানির ধাক্কায় একটি স্লুইসগেট বিধ্বস্ত হয়েছে, যার ফলে অন্তত এক হাজার একর লবণের মাঠ তলিয়ে গেছে। এই ঘটনায় হাজারও লবণ চাষি কোটি টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন, এবং মৌসুমের শেষ সময়ে এসে তাদের সারা বছরের উপার্জনের স্বপ্ন নোনা জলে বিলীন হয়ে গেছে।
স্লুইসগেটের বিধ্বস্ততা ও প্রভাব
সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, মগনামা ইউনিয়নের সোনালী বাজারস্থ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) আওতাধীন ৬৪/২ বি পোল্ডারের ৪১ নম্বর স্লুইসগেটটি দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ছিল। রোববার সকালে ও দিবাগত রাতে জোয়ারের তোড়ে স্লুইসগেটটি সম্পূর্ণভাবে বিধ্বস্ত হয়, যার ফলে হু হু করে পানি লোকালয় ও লবণের মাঠে ঢুকে পড়ে। রাতে জোয়ারের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক ফুট বৃদ্ধি পায়, এবং স্থানীয় লোকজন কৃত্রিমভাবে পানি আটকানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন।
চাষিরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই মাঠের স্তূপ করা লবণ এবং উৎপাদনের অপেক্ষায় থাকা ‘বেড’গুলো তলিয়ে যায়। এতে শতাধিক ছোট বড় বিনিয়োগকারীসহ কয়েক হাজার প্রান্তিক চাষি সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। উত্তোলিত লবণের স্তূপ জোয়ারের তোড়ে গলে গেছে, এবং মাঠ প্লাবিত হওয়ায় পুনরায় উৎপাদন শুরু করাও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
চাষি ও ব্যবসায়ীদের বক্তব্য
লবণ চাষি গিয়াস উদ্দিন বলেন, “ঋণ নিয়ে লবণ মাঠের চাষ করছি। এমনিতে লবণের দাম কম, তার উপর কয়েক দফা জোয়ারের পানিতে লবণ তলিয়ে গেছে। চারদিকে অন্ধকার দেখছি।” আরেক চাষি নন্না মিয়া যোগ করেন, “২ একর জমিতে লবণ উৎপাদন করছি। বিক্রির জন্য প্রস্তুত শত শত মণ লবণ ছিল। পানিতে মাঠ ডুবে যাওয়ায় সব লবণ নষ্ট হয়ে গেছে। না খেয়ে মরতে হবে। স্লুইসগেটটি যেন আমাদের অভিশাপ।”
লবণ ব্যবসায়ী এয়ার মুহাম্মদ বলেন, “চাষিরা শেষ হয়ে গেছে। ধার কর্জ নিয়ে তারা লবণ চাষ করছে। লবণের দামও কম। শেষ সময়ে এসে পানিতে তলিয়ে গেছে লবণ মাঠ ও হাজার হাজার মণ উৎপাদিত লবণ। আমরা যারা বিনিয়োগকারী আছি আমাদেরও চরম ক্ষতি হয়েছে।”
স্থানীয় অভিযোগ ও দাবি
এলাকাবাসীর অভিযোগ, স্লুইসগেটটি দীর্ঘদিন জরাজীর্ণ থাকলেও সংস্কারে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি, যার মাশুল দিতে হচ্ছে সাধারণ চাষিদের। স্থানীয় চাষি হারুন, শফিউল করিম, কালু, আজিম মেম্বারসহ ভুক্তভোগীরা জরুরিভিত্তিতে সরকারি সহায়তা এবং স্লুইসগেটটির স্থায়ী সংস্কারের জোর দাবি জানিয়েছেন।
প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া
মগনামা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. ইউনুস চৌধুরী বলেন, “জোয়ারের তোড়ে স্লুইসগেটটি ভেঙে চাষিদের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, তা আমি নিজে সরেজমিন দেখে এসেছি। এটি এলাকার অর্থনীতির ওপর বড় আঘাত। পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দিতে একটি জরুরি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং দ্রুত বাঁধ সংস্কারের চেষ্টা চলছে।”
এই ঘটনা পেকুয়া উপজেলার লবণ চাষের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে, এবং স্থানীয় অর্থনীতির পুনরুদ্ধারে জরুরি পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।



