রংপুরের তারাগঞ্জে আশিকুর রহমানের গড়া 'গ্রামীণ সাহায্য সংস্থা' গ্রামের বাসিন্দাদের রক্তের গ্রুপ নির্ণয়সহ নানা কল্যাণমূলক কাজ করে যাচ্ছে। প্রায় দেড় যুগ আগে এক দিনমজুরের পাশে দাঁড়ানোর ঘটনা থেকে শুরু হয় তাঁর মানবসেবার পথচলা।
শুরুটা এক দিনমজুরের কান্না থেকে
গ্রামের বাজারে মাটিতে শুয়ে কান্নাকাটি করছিলেন চল্লিশোর্ধ্ব এক দিনমজুর। তাঁকে দেখে এগিয়ে যান এক তরুণ। জানতে পারেন অর্থাভাবে নিজের চিকিৎসা করতে না পেরে কাঁদছেন। এরপর তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করান ওই তরুণ। অস্ত্রোপচারের পর সুস্থ হয়ে ফিরে তরুণকে জড়িয়ে ধরে দোয়া করেন ওই দিনমজুর। ঘটনাটি প্রায় দেড় যুগ আগের। সেদিনের তরুণ এখন মধ্যবয়স্ক। কিন্তু সেই দিনমজুরের ভালোবাসার কথা ভোলেননি তিনি। তাই ওই ঘটনার পর থেকে সুখে-দুঃখে মানুষের পাশে দাঁড়ান তিনি। কেউ অনাহারে থাকলে বা অর্থাভাবে চিকিৎসা করতে না পারলে তিনি ছুটে যান। শিক্ষার্থীদের দেন শিক্ষা উপকরণ। দরিদ্র নারীদের হাঁস-মুরগি, ছাগল কিনে দেন। গরিব ঘরের মেয়েদের বিয়েতেও করেন সহযোগিতা। নিজের সামর্থ্যে না কুলালে ধনী ও দানশীল ব্যক্তিদের কাছে হাত পাতেন।
পরোপকারী মানুষটির নাম আশিকুর রহমান
পরোপকারী মানুষটির নাম আশিকুর রহমান (রিপন)। বাড়ি রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলায় খোর্দ্দ বেলাইচণ্ডী গ্রামে। নিজ গ্রামসহ আশপাশের এলাকায় তিনি 'গরিবের বন্ধু' হিসেবে পরিচিত। এক যুগ আগে শতাধিক মানুষ নিয়ে তিনি 'গ্রামীণ সাহায্য সংস্থা' নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গঠন করেন। ওই সংগঠনের সদস্যদের নিয়ে বিনা মূল্যে রক্তদান, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, নিরক্ষরকে অক্ষর শেখানোর পাশাপাশি বিভিন্ন কল্যাণমুখী কাজ করে যাচ্ছেন আশিকুর।
টিফিনের টাকায় সহায়তার শুরু
তারাগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে খোর্দ্দ বিলাইচণ্ডী গ্রাম। কাঁচাপাকা পথ ধরে আশিকুরের বাড়িতে গিয়ে তাঁকে পাওয়া গেল না। খোঁজ করতেই একজন জানালেন, বাড়ির পাশে বয়স্ক ব্যক্তিদের অক্ষর লেখা শেখাচ্ছেন। তিন ভাইবোনের মধ্যে সবার বড় আশিকুর। বাবা আজিজ সরদার এলাকার বড় কৃষক। ২০১৬ সালে আশিকুর এমবিএ পাস করার পর এখন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। সপ্তাহে এক দিন সংগঠনের কাজে সময় দেন।
আশিকুরের মা লাইলী বেগম বলেন, স্কুলে পড়ার সময় টিফিনের টাকা জমিয়ে দরিদ্র মানুষকে সহযোগিতা করত আশিকুর। গ্রামের কাউকে অনাহারে থাকার কথা শুনলে খাবার নিয়ে ছুটে যেত। এ জন্য বোনদের কাছে বকুনি খেত। কিন্তু আশিকুরের এসব কাজ ভালো লাগত তার বাবার। বাবাই তাকে এমন কাজ করতে অনুপ্রাণিত করেছেন।
আশিকুর রহমান বলেন, 'মানবসেবা করার ইচ্ছাটা ছোটবেলায় মনে বপন করেছিলেন বাবা। তখন আমি কলেজে পড়ি। এক রাতে বাবা আমাকে বাড়ির উঠানে গল্প শুনিয়ে বললেন, "মানবসেবার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করা যায়।" তখন থেকেই মানুষের কল্যাণে কাজ করার ইচ্ছাটি মনে পুষিয়ে রেখেছিলাম।' তাঁর কার্যক্রমে অনুপ্রাণিত হয়ে বন্ধুবান্ধব ও এলাকার লোকজন এগিয়ে আসেন। ২০১২ সালে শতাধিক মানুষ নিয়ে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গঠন করেন। নাম দেন গ্রামীণ সাহায্য সংস্থা।
আশিকুরের জন্য এত কিছু পাইছি
স্ত্রী ও দুই বছর বয়সী সন্তানকে রেখে ছয় বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান হাজিপাড়া গ্রামের রিকশাচালক মমিনুল ইসলাম। অথই সাগরে পড়েন স্ত্রী রেহেনা খাতুন। তখন তাঁর বাড়িতে ছুটে যান আশিকুর। সংগঠনের তহবিল থেকে তাঁকে একটি সেলাই মেশিন কিনে দেন। এখন বাড়িতে বসে পোশাক তৈরি করে রেহেনা মাসে ১০ হাজার টাকা আয় করছেন। ছয়টি ছাগল ও দুটি গাভিও আছে তাঁর। মেয়ে মনিরা স্কুলে পড়ছে।
আশিকুরের সহায়তায় জীবিকা খুঁজে পেয়েছেন তেঁতুলতলা গ্রামের মাজেদা বেগম। ছেলে নেই, দুই মেয়ের বিয়ে হয়েছে। পাঁচ বছর আগে দিন কাটত অনাহারে। খবর পেয়ে আশিকুরের সংগঠনের সদস্যরা তাঁকে ২০টি হাঁস-মুরগি কিনে দেন। সেগুলো লালন করে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন মাজেদা। ছোট্ট একটি মুরগির খামার করেছেন। মাজেদা বলেন, 'সেই কষ্ট আর নেই। আল্লায় দিলে শান্তিতে আছি।'
অর্থাভাবে চিকিৎসা করাতে পারেন না এমন লোকদের সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রতি মাসে ১ থেকে ৩ হাজার টাকা দেওয়া হয় বলে জানালেন 'গ্রামীণ সাহায্য সংস্থার' স্বাস্থ্য সম্পাদক নিলয় সরদার। তিনি বলেন, হাসপাতালে নেওয়ার প্রয়োজন হলে সংগঠনের সদস্যরা তাঁদের হাসপাতালে নিয়ে যান। এ পর্যন্ত ১৫০ জনকে চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া হয়েছে। পাঁচজন প্রতিবন্ধীকে হুইলচেয়ার, দেড় শতাধিক নারীকে হাঁস-মুরগি, ১২ জনকে সেলাই মেশিন দেওয়ার পাশাপাশি দুই শতাধিক শিক্ষার্থী শিক্ষা উপকরণ পেয়েছেন।
আছে সচেতনতা কার্যক্রমও
গ্রামের নিরক্ষর ব্যক্তিদের অক্ষর শেখানোর জন্য একটি বয়স্ক শিক্ষাকেন্দ্র চালু করা হয়েছে। তেঁতুলতলা বাজারের মোড়ে ওই শিক্ষাকেন্দ্রে প্রতি শুক্রবার তাঁদের অক্ষর লেখা শেখানো হয়। এ ছাড়া সেখানে প্রতি শনিবার গ্রামের নারী-পুরুষদের আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ, হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল পালনের ব্যাপারে পরামর্শ দেন সংগঠনের সদস্যরা।
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান বলেন, শিক্ষক, ইমাম, জনপ্রতিনিধি ও সংগঠনের সদস্যদের নিয়ে একটি সামাজিক কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই কমিটি প্রতি মাসে সভা করে বাল্যবিবাহ বন্ধ, স্বাস্থ্য সচেতনসহ বিভিন্ন বিষয়ে গ্রামবাসীকে সচেতন করে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে এ পর্যন্ত চারটি বাল্যবিবাহ বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে। দরিদ্র পরিবারের ১৮টি মেয়ের বিয়েতে সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
সংগঠনের খরচ চলে কীভাবে জানতে চাইলে কোষাধ্যক্ষ মাহামুদুল সরদার বলেন, তহবিলে ২ লাখ টাকা জমা আছে। সংগঠনের অধীনে একটি পুকুর ইজারা নিয়ে মাছ চাষ চলছে। ১৫০ জন সদস্য প্রতি মাসে ২০০ টাকা করে চাঁদা দেন। গ্রামের বিত্তশালীরাও তহবিলে টাকা দেন। এভাবেই সংগঠনের ব্যয় নির্বাহ করা হয়। বছরে দুবার সংগঠনের সদস্যেদের ডেকে আয়-ব্যয়ের হিসাব করা হয়।
ছেলে আশিকুরের কাজে গর্বিত বাবা আজিজ সরদার। তিনি বলেন, হাটবাজার, শহর-বন্দরে যখন অপরিচিত লোকজন ছেলের কাজের প্রশংসা করেন, তখন গর্ব হয়। আনন্দে বুক ভরে যায়। আলমপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম বলেন, মানবসেবাই মানুষের প্রকৃত ধর্ম। আশিকুর তা-ই করছেন। তাঁর মতো নিঃস্বার্থ মানুষ সমাজে বিরল।



