সম্পাদকীয়ভোলায় প্রায় ১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দুটি সামুদ্রিক মৎস্য অবতরণকেন্দ্রের সংবাদ বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পের কাঠামোগত দুর্বলতা, সমন্বয়হীনতা ও পরিকল্পনার অভাবকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। সরকারি অর্থে সামুদ্রিক মাছ সংরক্ষণ, জেলেদের মাছের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ এবং আধুনিক বিপণনব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে নির্মিত স্থাপনা দুটির কার্যক্রম শুরু হওয়া তো দূরের কথা, উল্টো পুরো প্রকল্প অকেজো হয়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, মৎস্য অবতরণকেন্দ্রটি নির্মাণের সময় লবণাক্ত পানি ব্যবহারের কারণে কার্যক্রম শুরু হওয়ার আগেই দেয়ালে ফাটল দেখা দিয়েছে, পলেস্তারা খসে পড়ছে। সিঁড়ির পিলার ২৫ ফুট হওয়ার কথা থাকলেও করা হয়েছে মাত্র ৫ ফুট। আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই অবতরণকেন্দ্রের পাশে কোনো মাছঘাটই নেই। যে খালটি খনন করা হয়েছে, সেটির ভবিষ্যৎ উপযোগিতা নিয়েও স্থানীয় বাসিন্দাদের মনে যৌক্তিক সংশয় রয়েছে।
নির্মাণজনিত ত্রুটির সঙ্গে অবকাঠামোগত অব্যবস্থাপনা স্থাপনা দুটিকে কার্যত অকেজো বানিয়ে রেখেছে। প্রকল্পের পরিকল্পনায় বরফকল, হিমাগার ও জেনারেটরের মতো গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশের উপস্থিতি থাকলেও বাস্তবে এর অধিকাংশই স্থাপন করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। সরকারি অর্থের এমন অপচয় ও অনিয়ম কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবও ফুটে উঠেছে এ ঘটনা থেকে। প্রকল্পের নকশা, বরাদ্দ, মান ইত্যাদি বিষয়ে ভোলা জেলা মৎস্য অফিসের কাছে বিস্তারিত তথ্য নেই। ঢাকায় বসে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে বলে অভিযোগ তোলা হয়েছে। স্থানীয় অংশীজন ও মাঠপর্যায়ের দপ্তরের মতামতকে উপেক্ষা করে প্রকল্প বাস্তবায়নের যে আমলাতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, এটা যেন তারই প্রতিফলন।
বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশে বিপুল ব্যয়ে বাস্তবায়িত বহু উন্নয়ন প্রকল্প দিন শেষে ‘সাদা হাতি’তে পরিণত হওয়ার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, ভোলার এ ঘটনা তারই ধারাবাহিকতা মাত্র। আমরা মনে করি, ভোলার মৎস্য অবতরণকেন্দ্র নির্মাণের ত্রুটি ও অব্যবস্থাপনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের তদন্তের মাধ্যমে জবাবদিহির অধীনে নিয়ে আসা উচিত। পাশাপাশি সরকারের উচিত অবিলম্বে একটি কারিগরি তদন্ত কমিটির মাধ্যমে ভবনের দুর্বলতা পরীক্ষা করা এবং দ্রুততম সময়ে বরফকল ও হিমাগার স্থাপন করে কেন্দ্র দুটিকে মৎস্যজীবীদের জন্য কার্যকর করা।
এ ধরনের জনগুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প গ্রহণের আগে যথাযথ সম্ভাব্যতা যাচাই বাধ্যতামূলক করা আবশ্যক। কেবল রাজধানীতে বসে সিদ্ধান্ত না চাপিয়ে, স্থানীয় প্রশাসন ও অংশীজনদের পরিকল্পনা প্রক্রিয়ায় যুক্ত করতে হবে। উন্নয়ন প্রকল্পের নামে জনগণের অর্থের অপচয় রোধে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।



