কুমিল্লায় কৃষকের আঙুর চাষে সাফল্য, বদলে যাচ্ছে ধারণা
কুমিল্লায় আঙুর চাষে সাফল্য, বদলে যাচ্ছে ধারণা

কুমিল্লার সীমান্তবর্তী এলাকায় এক কৃষকের আঙুর চাষের সাফল্য এখন সবার নজর কেড়েছে। লাল ও কালো রঙের আকর্ষণীয় এই আঙুর দেখতে যেমন সুন্দর, তেমনি স্বাদেও অত্যন্ত মিষ্টি। স্থানীয়রা এখন এই সুমিষ্ট আঙুর চাষের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন।

দীর্ঘদিনের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশে আঙুর চাষের কথা উঠলেই অনেকের মনে বিদেশের বিস্তীর্ণ আঙুর বাগানের ছবি ভেসে ওঠে। দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ধারণা ছিল যে দেশের আবহাওয়া ও মাটি আঙুর চাষের জন্য খুব একটা উপযোগী নয়। ফলে বাজারে পাওয়া আঙুরের প্রায় পুরোটাই বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। কিন্তু সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে কুমিল্লার সীমান্তবর্তী কৃষক আক্তারুজ্জামান সেকুল এখন আঙুর চাষে সাফল্যের নতুন গল্প লিখছেন।

ভারতে প্রশিক্ষণ নিয়ে শুরু

কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার ভারতীয় সীমান্তঘেঁষা শরিফপুর গ্রামের কৃষক সেকুল দীর্ঘদিন ধরেই ব্যতিক্রমধর্মী কৃষিকাজে আগ্রহী। আঙুর উৎপাদনের আধুনিক পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে তিনি ভারতে প্রশিক্ষণ নেন। সেখান থেকে অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে নিজ গ্রামের ৮২ শতক জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে আঙুরের বাগান গড়ে তোলেন। বাগানে তিনি তিনটি উন্নত জাতের আঙুরের চারা রোপণ করেন, যার মধ্যে রয়েছে বাইনুকুর, রাশিয়ান ভ্যারাইটি ও তুরস্কের জনপ্রিয় সিডলেস ভ্যারাইটি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

১০ মাসেই ফলন

শুরুতে অনেকেই সেকুলের এই উদ্যোগকে কৌতূহলের চোখে দেখলেও তিনি আত্মবিশ্বাস হারাননি। বাগানের নিয়মিত পরিচর্যা, সঠিক ছাঁটাই, সেচ ও রোগবালাই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে গাছগুলোকে বড় করে তোলেন তিনি। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, চারা রোপণের মাত্র ১০ মাসের মধ্যেই গাছে ফল ধরতে শুরু করে। শত শত থোকা আঙুরে ভরে যায় পুরো বাগান। তবে সেকুল প্রথম বছরেই বেশি ফলনের দিকে না গিয়ে গাছের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য ও উৎপাদন সক্ষমতার কথা বিবেচনা করে অনেক কুঁড়ি ও ফলের থোকা ছেঁটে ফেলেন। শেষ পর্যন্ত প্রায় ২০০টি থোকা রেখে দেন, যার প্রতিটির ওজন প্রায় আধা কেজি। সে হিসেবে বর্তমানে প্রায় ১০০ কেজির মতো আঙুর গাছে রয়েছে।

গুণগত মানে বিদেশি আঙুরের সমান

লাল ও কালো রঙের আকর্ষণীয় আঙুরগুলো দেখতে যেমন সুন্দর, তেমনি স্বাদেও বেশ মিষ্টি। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ফল হলেও এর গুণগত মান বিদেশি আঙুরের সঙ্গে তুলনীয় বলে মনে করছেন অনেকে। কৃষক আক্তারুজ্জামান সেকুল বলেন, অনেকেই বলেছিলেন বাংলাদেশে ভালো আঙুর হবে না। কিন্তু আমি বিশ্বাস করতাম, সঠিক প্রযুক্তি ও পরিচর্যা জানলে অবশ্যই সফল হওয়া সম্ভব। প্রথম ফলনেই যে সাড়া পেয়েছি, তাতে আমি আশাবাদী। ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে আঙুর উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।

স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক সাড়া

সেকুলের আঙুর বাগানের কথা ছড়িয়ে পড়ার পর আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিদিনই মানুষ বাগান দেখতে আসছেন। কেউ কৌতূহলবশত, কেউ আবার নতুন সম্ভাবনা খুঁজতে। ছোট-বড় সবার কাছেই বাগানটি এখন আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। দর্শনার্থী মুনজেরিন চৌধুরী বলেন, আমাদের এলাকায় আঙুরের বাগান আছে শুনে দেখতে এসেছি। আগে শুধু বাজার থেকে আঙুর কিনে খেয়েছি। কিন্তু গাছ থেকে পেড়ে তাজা আঙুর খাওয়ার অনুভূতি একেবারেই আলাদা। এই আঙুরগুলোর স্বাদও অসাধারণ। আরেক দর্শনার্থী মাসুদা ইসলাম বলেন, আমি সব সময় শুনেছি দেশে আঙুর চাষ করলে ফল টক হয়। কিন্তু এখানে এসে আমার সেই ধারণা বদলে গেছে। এই বাগানের আঙুরগুলো বেশ মিষ্টি, রসালো ও সুগন্ধযুক্ত।

উদ্যোক্তাদের আগ্রহ

কুমিল্লার উদ্যোক্তা ও লালমাই লেক ল্যান্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর মফিজুল ইসলাম বাগানটি পরিদর্শন করে মুগ্ধতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, আমি বাগানটি দেখে সত্যিই অনুপ্রাণিত হয়েছি। আমাদের দেশে আঙুর চাষ এভাবে সফল হতে পারে, তা আগে কল্পনাও করিনি। লালমাই পাহাড় এলাকায় আমার কিছু জমি রয়েছে। সেখানে আমিও আঙুরের বাগান করার পরিকল্পনা করছি। এ বিষয়ে আক্তারুজ্জামান সেকুল ভাইয়ের পরামর্শ ও সহযোগিতা চেয়েছি। তিনি সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।

কৃষি বিভাগের সহায়তা

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরও বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা এ কে এম আরিফুজ্জামান রহমান বলেন, আমরা শুরু থেকেই কৃষক আক্তারুজ্জামান সেকুলের আঙুর বাগান নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দিয়ে আসছি। এখন পর্যন্ত বাগানটির ফলনের অবস্থা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। কুমিল্লার সীমান্তবর্তী এলাকার মাটি ও জলবায়ু আঙুর চাষের জন্য সম্ভাবনাময় বলে মনে হচ্ছে। বিশেষ করে উঁচু জমি ও টিলাভূমিতে এ ফসলের ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। কেউ আঙুর চাষে আগ্রহী হলে কৃষি বিভাগ প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহায়তা দিতে প্রস্তুত।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

সেকুল চান এই অঞ্চলের কৃষকরা প্রচলিত ফসলের পাশাপাশি আঙুর চাষেও এগিয়ে আসুক। বাজারে আঙুরের চাহিদা অনেক বেশি। সঠিক পরিকল্পনায় চাষ করলে এটি অত্যন্ত লাভজনক একটি ফসল হতে পারে। স্থানীয়দের বিশ্বাস, সঠিক পরিকল্পনা ও প্রযুক্তিগত সহায়তা পেলে কুমিল্লার সীমান্তবর্তী এলাকায় আঙুর চাষ ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করতে পারে, যা কৃষকদের জন্য নতুন আয়ের উৎস তৈরি করবে এবং বিদেশি ফল আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা কমাবে।