হাওরের পানিতে পেতে রাখা জাল থেকে মাছ ধরছেন ফয়েজ আলী। সম্প্রতি মৌলভীবাজার সদর উপজেলার কাউয়াদীঘির বিরাইমাবাদে এই দৃশ্য দেখা গেছে। সময়টি হওয়ার কথা ছিল কৃষকদের ধান উৎসবের। কিন্তু অতিবর্ষণ ও ঢলের পানিতে পাকা ধান তলিয়ে যাওয়ায় কাউয়াদীঘি হাওরপারে এখন শুধুই হাহাকার। পানিতে তলিয়ে থাকা পচা ধান থেকে চাল ও খড় বের করার চেষ্টা করছেন অনেকেই। তবু এতে ক্ষতি পোষাতে পারবেন না তাঁরা।
উৎসবের পরিবর্তে নীরবতা
উৎসবের পরিবর্তে কাউয়াদীঘি হাওরপারের বিরাইমাবাদ এলাকায় এখন চাপা নীরবতা। সম্প্রতি দেখা যায়, পাকা সড়কে কয়েকজন পচে যাওয়া ধানের খড় শুকাচ্ছিলেন। বেলা পড়ে আসায় সেই খড় তাঁরা ‘উকইন’ (বাঁশের তৈরি খড় নাড়ার হাতিয়ার) দিয়ে জড়ো করছিলেন। যেখানে কিছুদিন আগেও মানুষ ভেজা ধান এনে রেখেছেন, যন্ত্রে ধান মাড়াই করেছেন, রোদে ধান শুকাতে দিয়েছেন—সেখানে এখন থই থই করছে পানি। হাওরের ওই সড়কটির ওপর দিয়ে এখন ছলছল করে চলছে নৌকা। যেটুকু শুকনা আছে—সেখানে পচা খড়, পচা ধানের অবশিষ্ট পড়ে আছে।
মাছ ধরছেন ফয়েজ আলী
বিরাইমাবাদের হাওরপারে গিয়ে দেখা যায়, বিকেলের সোনারঙা আলো এসে পড়ছে হাওরের জলের বুকে। কচুরিপানা, হিংরাই (সিংরাই) ফলের সবুজ পাতাদের সঙ্গে এতে ভাসছে পচা ধান ও খড়কুটো। এর মধ্যে নৌকায় জাল টেনে মাছ ধরছিলেন এক ব্যক্তি। টেনে তোলা জালের মধ্যে রুপালি আধুলির মতো একেকটি মখা (মলা) মাছ রোদে ঝিলিক দিয়ে উঠছিল।
কথায় কথায় জানা গেল, ওই ব্যক্তির নাম ফয়েজ আলী, বাড়ি সদর উপজেলার আখাইলকুড়া ইউনিয়নের হাওরপারের খইশাউড়ায়। ফয়েজ আলী বলেন, ‘নৌকা যেখানো দেখরা, এখানো পানির নিচে খালি ধান আর ধান। পানির নিচ থাকি মাইনসে ধান তুলত পারছে না। আমি নিজে ছয় কিয়ার (১ কিয়ার= ৩০ শতক) জমি করছিলাম। এক কিয়ার জমির ধান কাটছি। ১২ মণ ধান পাইছি। আমার পাঁচ কিয়ারই পানির তলে।’
ক্ষতির পরিমাণ
ফয়েজ আলীর নিজের কোনো জমি নেই। তিনি প্রতি কিয়ার দুই হাজার টাকা করে মোট ১২ হাজার টাকায় ৬ কিয়ার জমি বর্গা নিয়েছিলেন। জমির মালিককে এই টাকা আগাম পরিশোধ করতে হয়েছে। এরপর এই জমিতে চাষ দেওয়া, চারা রোপণ, শ্রমিকের মজুরিসহ তাঁর খরচ হয়েছে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। যখন খেত থেকে পাকা ধান কাটবেন—তখন অতিবর্ষণ ও ঢলে কাউয়াদীঘি হাওরের ফসল পানিতে তলিয়ে যায়। চোখের সামনে শুধু তাকিয়ে দেখেছেন, কিছু করার ছিল না।
ফয়েজ আলীর ভাষ্য, ‘খালি আমার ধানই ডুবছে না। আমরার এলাকার এমন কোনো মানুষ নাই, যারা ৮-১০ কিয়ার জমি খেত (চাষ) করছে না। প্রত্যেকের পাঁচ-সাত কিয়ার করি খেতর ধান পানির নিচে নষ্ট অইছে। অনেকে এক মুইট (মুঠো) ধান তুলতো পারছে না। অখন শুধু আমি না হকলকেই সারা বছর চাল কিনিয়া খাইতে অইবো।’
মাছের ওপর নির্ভরতা
নিজেদের মাছে-ভাতে বাঙালি দাবি করে ফয়েজ আলী বলেন, ‘আমরার ধানে-মাছে সংসার চলে। এবার ধান নাই, তাই খালি মাছের ওপর নির্ভর করতে অইবো। আওরে পানি যত দিন আছে—কিতা করমু? মাছ মারি চলমু।’ ফয়েজ আলীর দাবি, ধান পেলে আর খোরাকির চিন্তা করতে হতো না। এখন শুধু মাছ ধরে এবং বিক্রি করে ৬ সদস্যের সংসারের অন্য খরচ চালাতে হবে।
ফয়েজ জানান, রাতে ও সকালে—এই দুইবেলা হাওরে মলা (মখা) মাছের জাল পাতেন। প্রতিদিন ৫০০-৬০০ টাকার মাছ পান। কোনো দিন আরেকটু বেশি টাকার মাছ পাওয়া যায়। এখন এসব মাছই তাঁর ভরসা। এসব বলতে বলতে নৌকায় হাওরের ভেতরের দিকে যান ফয়েজ।
তখন প্রায় সন্ধ্যা নেমেছে। খইশাউড়ার ঘাটে ভিড়েছে সারি সারি নৌকা। এ সন্ধ্যায় সেখানে ফয়েজ আলীর সঙ্গে দ্বিতীয়বার দেখা। ফয়েজ আলী বলে ওঠেন, ‘রাইত তিনটায় আবার মাছ ধরতে যাইমু। গরিবর শান্তি নাই।’



