ঈদুল আজহায় সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে ব্যস্ততা, চ্যালেঞ্জ লবণ ও রাসায়নিকের দাম
ঈদুল আজহায় সাভারের চামড়া শিল্পে ব্যস্ততা, চ্যালেঞ্জ দাম

ঈদুল আজহা ঘিরে প্রস্তুতি চলছে সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে। তবে ব্যবসার জাঁকজমকপূর্ণ এ সময়েও দুশ্চিন্তায় ব্যবসায়ীরা। এবারও চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বর্জ্য শোধন ও লবণ-রাসায়নিকের বাড়তি দাম। সবমিলিয়ে এই শিল্প নিয়ে উদ্বেগ এখনও কাটছে না বলেই জানাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

কোরবানির পশুর সংখ্যা ও চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, দেশে এবার কোরবানিযোগ্য পশুর সংখ্যা এক কোটি ২৩ লাখের বেশি। এর মধ্যে গরু ও মহিষ প্রায় ৫৭ লাখ এবং ছাগল ও ভেড়া ৬৬ লাখের বেশি। সম্ভাব্য কোরবানির সংখ্যা এক কোটির ওপরে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই চামড়ার সিংহভাগই ধারাবাহিকভাবে ঢুকবে সাভারের হেমায়েতপুরের হরিণধরা এলাকার চামড়া শিল্পনগরীতে (ট্যানারি)। আর মৌসুমের গুরুত্বপূর্ণ সময়কে কেন্দ্র করে ট্যানারিগুলোতে চলছে কর্মব্যস্ততা।

প্রস্তুতি ও অবকাঠামো উন্নয়ন

মঙ্গলবার (২৬ মে) হরিণধরা এলাকায় বিসিক চামড়া শিল্প নগরীতে গিয়ে দেখা গেছে, ঈদের বর্জ্যের অতিরিক্ত চাপ সামলাতে সিইটিপি সংস্কারের কাজ চলছে। এ ছাড়া বিসিক এলাকার জমে থাকা বিভিন্ন আবর্জনা সরিয়ে ফেলা হচ্ছে, পরিষ্কার করা হচ্ছে পানি নিষ্কাশনের নালা। বিভিন্ন কারখানা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করা হচ্ছে। নির্দেশনা মেনে অনেক কারখানার সামনেই লাগানো হয়েছে গাছ। বর্জ্য ফেলতে খনন করা হয়েছে দুটি পুকুর।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

শিল্প মালিকরা জানিয়েছেন, ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে প্রস্তুতি এরই মধ্যে নেওয়া হয়েছে। রাসায়নিক সংগ্রহ, লবণ মজুত, শ্রমিক নিয়োগ এবং মাঠপর্যায়ে সংগ্রহের যোগাযোগ করা হয়েছে। এ ছাড়া চামড়া প্রক্রিয়ার সোডিয়াম সালফাইড, হাইড্রেটেড লাইম ও বেসিক ক্রোমিয়াম সালফেটসহ প্রয়োজনীয় রাসায়নিক সংগ্রহ করা হয়েছে। চামড়া সঠিকভাবে সংগ্রহ করতে প্রচারণাও চালাচ্ছেন কেউ কেউ। যদিও চামড়া সংরক্ষণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান লবণের দাম নিয়ে অসন্তোষ জানিয়েছেন ট্যানারি মালিকরা।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

লবণের দাম ও সরবরাহ সংকট

সূত্র বলছে, এ বছর চামড়া শিল্পে ৮০-৮৫ হাজার মেট্রিক টন লবণের চাহিদা রয়েছে। সরকার এরইমধ্যে মাদ্রাসা, এতিমখানা ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা দিতে প্রায় ১১ হাজার ৫০০ টন বিনামূল্যের লবণ বিতরণ করছে। বর্তমানে বাজারে প্রতি ৭৪ কেজির লবণের বস্তার দাম ২৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে বর্তমানে ৯৩০ থেকে ৯৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

সাভারের চামড়া শিল্পনগরীর একটি ট্যানারির কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলম বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে আমরা আশা করছি, এই সরকার চামড়া শিল্পের প্রতি খুবই আন্তরিক। সিইটিপির কাজেও অনেক অগ্রগতি হয়েছে। পাশাপাশি চামড়া সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও বর্তমান সরকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আমরা আশা করছি, এর ফলে দেশের এই গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হবে। সরকার বর্তমানে প্রান্তিক পর্যায়ে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে, কীভাবে সঠিকভাবে চামড়া সংরক্ষণ করতে হয়। বিশেষ করে বর্তমান প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও যাতে চামড়া ভালোভাবে সংরক্ষণ করা যায়, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন করা হচ্ছে। তবে কেমিক্যালের দাম আগের তুলনায় অনেক বেড়ে গেছে। বৈশ্বিক বিভিন্ন সমস্যার কারণে কেমিক্যালের মূল্য প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। আমাদের অ্যাসোসিয়েশন এবং সরকারের পক্ষ থেকে চামড়ার একটি মূল্য ঠিক করা হয়েছে। আশা করছি, যদি সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও লবণজাত করা হয় এবং চামড়ার গুণগত মান ঠিক থাকে, তাহলে কাঙ্ক্ষিত মূল্য পাওয়া যাবে।

চামড়ার দাম ও আন্তর্জাতিক বাজার চ্যালেঞ্জ

তবে চামড়ার দাম নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে মাহফুজ ইসলাম নামে এক ট্যানারি কর্মকর্তা বলেন, বর্তমানে চামড়ার পরিস্থিতি খুবই কঠিন। চীনের বাজারে ৪০ সেন্টের বেশি দামে চামড়া কেনা হয় না। অথচ শুধু কেমিক্যাল, শ্রমিক, বিদ্যুৎ বিলসহ অন্য খরচ মিলিয়ে উৎপাদন ব্যয় অনেক বেশি। এর মধ্যেও সরকার ৬০ থেকে ৭০ টাকা পর্যন্ত দাম নির্ধারণ করেছে। কিন্তু বাস্তবে সেই দামে ব্যবসা করা সম্ভব কি না, সেটা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। চামড়া শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে আন্তর্জাতিক বাজার, বিশেষ করে চীনের বাইরে নতুন বাজার তৈরি করতে হবে। তবেই আমরা ভালো কিছু আশা করতে পারি। বর্তমানে ট্যানারি মালিকদের চামড়া কেনার আগ্রহও কমে গেছে।

রিপন চৌধুরী নামে আরেক ট্যানারি মালিক বলেন, বর্তমানে চামড়া শিল্পের অবস্থা খুবই খারাপ। সরকার টেলিভিশন ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ৬২ টাকা প্রতি বর্গফুট দাম নির্ধারণ করেছে বলে জানিয়েছে। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো—সরকার কি নিজে চামড়া কিনবে? যদি কিনে, তাহলে আমাদের সঙ্গে ব্যবসায় আসুক, দেখি কীভাবে ৬২ টাকা দামে চামড়া কেনা ও বিক্রি সম্ভব হয়। আমরা তো ৩৫ থেকে ৪০ টাকার বেশি দামে চামড়া বিক্রি করতে পারি না। অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে দাম ৪০ সেন্টের আশপাশে। সেখানে দ্বিগুণ খরচ বহন করে কীভাবে সরকার নির্ধারিত দামে চামড়া কেনা সম্ভব?

এনজেলা ট্যানারির কর্মকর্তা জাকির হোসেন বলেন, কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে এবার আমাদের তেমন কোনও প্রস্তুতি নেই। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে, বিশেষ করে চীনের বাইরে আমাদের কোনো চাহিদা নেই। আমরা পুরোপুরি চীনের বাজারের ওপর নির্ভরশীল। চীন যেভাবে দাম নির্ধারণ করে, সেভাবেই আমাদের বিক্রি করতে হয়। ১০ টাকায় কিনে চার টাকায় বিক্রি করার মতো অবস্থা। ব্যবসায়ীরা বাড়িঘর, গাড়ি, জমিজমা বিক্রি করে এই শিল্পে টিকে থাকার চেষ্টা করছে। কিন্তু উঠে দাঁড়ানোর পথ খুঁজে পাচ্ছে না। যতক্ষণ পর্যন্ত ইউরোপীয় বাজারে প্রবেশ করা না যাবে, ততক্ষণ এই শিল্প ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন। আমরা সবসময় চাই ইউরোপের বাজার খুলুক। কিন্তু হাজারীবাগ থেকে সাভারে স্থানান্তরের সময় যেসব আধুনিক ব্যবস্থা থাকার কথা ছিল, সেগুলো এখনও পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। যখন আমরা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী এলডব্লিউজির মতো সার্টিফিকেশন পাবো, তখনই ইউরোপের বাজারে ভালো দামে চামড়া বিক্রি করা সম্ভব হবে। তাই ইউরোপীয় বাজারে প্রবেশ নিশ্চিত করতে সরকারকে আরও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

আইয়ুব ব্রাদার্স ট্যানারির দেখভালের দায়িত্বে থাকা আইয়ুব বলেন, চামড়া সংরক্ষণের জন্য আমরা সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছি। পর্যাপ্ত লবণ কেমিক্যাল সংরক্ষণ করা হয়েছে। তবে বিদ্যুৎ নিয়ে আমাদের সংশয় রয়েছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ না পেলে বেশিরভাগ চামড়া নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ট্যানারি অ্যাসোসিয়েশনের বক্তব্য

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়ার সহ-সভাপতি শাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, এবার চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে এক কোটি পিস। বারবার সবাইকে অনুরোধ করা হচ্ছে, দেশের সম্পদ বিবেচনা করে চামড়া কেনার পরপরই যেন লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করা হয় এবং যত দ্রুত সম্ভব সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে চামড়াগুলো ট্যানারিতে পৌঁছানোর ব্যবস্থার কথাও বলেন তিনি।

শ্রমিকদের অবস্থা ও স্বাস্থ্য সুবিধা

ট্যানারিগুলোতে চলছে শেষ সময়ের ব্যস্ততা। অনেকেই লবণ মজুত, নতুন চামড়া প্রক্রিয়াকরণে নানা প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সালাউদ্দিন নামে একজন ট্যানারি শ্রমিক বলেন, আগের যেসব চামড়া মজুত রয়েছে, সেগুলো আমরা এখন প্রক্রিয়াজাত করছি। একই সঙ্গে সময় নিয়ে জায়গা খালি করারও চেষ্টা চলছে, যাতে কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে সবাই প্রস্তুতি নিতে পারে। পরিবেশ যদি ভালো ও পরিষ্কার থাকে, তাহলে ইনশাল্লাহ কাজ আরও সহজ হবে।

তিনি বলেন, কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে ট্যানারির সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। মেশিনারি ও প্রয়োজনীয় কেমিক্যাল প্রস্তুত আছে। যদি আমরা সঠিকভাবে চামড়া সংগ্রহ করতে পারি এবং মানসম্মত উৎপাদন নিশ্চিত করতে পারি, তাহলে বিদেশি বাজারে ন্যায্যমূল্য পাওয়া সম্ভব হবে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আমরা সুন্দরভাবে লবণজাতকরণ ও অন্য প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারবো। কাঁচা চামড়া সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় লবণ ও বিভিন্ন কেমিক্যালও প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সঠিকভাবে কাঁচামাল এলে আমরা যথাযথভাবে উৎপাদন করতে পারবো।

মোহাম্মদ মানিক নামে আরেক শ্রমিক বলেন, শ্রমিকদের স্বাস্থ্যগত বা সামগ্রিক পরিবেশগত কোনও উন্নতি হয়নি। শ্রমিকদের কাজ করার জন্য যে ধরনের পরিবেশ প্রয়োজন, সেটিও এখানে নেই। তিনি বলেন, আমরা এখানে এসেছি ২০১৭ সালের ৮ এপ্রিল। কিন্তু এখনও এখানে কোনও মেডিক্যাল সুবিধা নেই। এমনকি ২০০ একরের এই শিল্পাঞ্চলের মধ্যে একটি ভালো ফার্মেসিও নেই। অথচ ছোট ছোট জুটমিল এলাকাতেও শ্রমিক কল্যাণ হাইস্কুল, খেলার মাঠ ও চিকিৎসা সুবিধা থাকে। কিন্তু আমাদের এই ২০০ একরের শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের জন্য কোনও স্কুল নেই, কলেজ নেই, খেলার মাঠ নেই, এমনকি একটি ভালো মেডিক্যাল সেন্টারও নেই।

সিইটিপি সংস্কার ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহীন আহমেদ বলেন, আমাদের এবার যথেষ্ট প্রস্তুতি রয়েছে। সরকারও অনেক সহায়তা করছে। আমাদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো চামড়ার মান ঠিক রাখা। ঈদের সময় সঠিকভাবে লবণ ব্যবহার ও সংরক্ষণ না হলে চামড়ার মান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে বাজারমূল্যের ওপর।

প্রায় ২০০ একর জমির ওপর নির্মিত সাভারের হেমায়েতপুরে চামড়া শিল্পনগরীতে বর্তমানে এখানে ১৩৭ থেকে ১৫৫টি ট্যানারি চালু রয়েছে। দেশের ট্যানারিগুলোর সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা বছরে প্রায় ৪০ কোটি বর্গফুট ওয়েট-ব্লু চামড়া, ৩০ কোটি বর্গফুট ক্রাস্ট লেদার ও ১৪ কোটির বেশি বর্গফুট ফিনিশড লেদার উৎপাদনের সমপরিমাণ। তবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোগত দুর্বলতাসহ নানা কারণে খাতটি এখনও আন্তর্জাতিক বাজারে যাওয়ার সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি। সাভার চামড়া শিল্পনগরীর বড় সংকট হিসেবে উঠে এসেছে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারের (সিইটিপি) অসক্ষমতা।

সম্প্রতি শিল্পনগরী পরিদর্শন করে শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এই সিইটিপির ত্রুটির বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, নির্মাণকারী চীনা প্রতিষ্ঠান সিইটিপির সক্ষমতা ২৫ হাজার কিউবিক মিটার বলে দাবি করলেও যাচাই-বাছাইয়ে এর প্রকৃত সক্ষমতা ১৪ থেকে ১৮ হাজার কিউবিক মিটার পাওয়া গেছে। অর্থাৎ নির্মাণ ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ঘোষিত পরিমাণ বর্জ্য পরিশোধন করতে পারছে না সিইটিপি। এ ছাড়া প্রয়োজনের তুলনায় কম সক্ষমতা রেখে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারটি নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে সিইটিপি থেকে নির্গত তরল বর্জ্যে পার্শ্ববর্তী ধলেশ্বরী নদী দূষিত হচ্ছে। এ দূষণ রোধে সিইটিপির ত্রুটিগুলো সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সরকারের পক্ষ থেকে সহায়তাসহ নানা উদ্যোগ নিয়ে ট্যানারিগুলোকে নিজস্ব সিইটিপি স্থাপনে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, সম্প্রতি সিইটিপির ব্যাপক সংস্কার হয়েছে। পুরোনো স্পেয়ার পার্টস, পাম্প ও ব্লোয়ার পরিবর্তন বা মেরামত করা হয়েছে। এর ফলে সিইটিপির কিছু কিছু প্যারামিটার এখন বেশ ভালো অবস্থায় রয়েছে। আগে কঠিন বর্জ্য নিয়ে তেমন কোনও কার্যকর উদ্যোগ না থাকলেও বর্তমানে এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। দ্রুত সিইটিপির নকশাগত ত্রুটিগুলোর স্থায়ী সমাধান করা হবে।

এ বিষয়ে সিইটিপির দায়িত্বে থাকা ঢাকা ট্যানারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল এস্টেট ওয়েস্টেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম শাহনেওয়াজ বলেন, কোরবানি সামনে রেখে আমাদের সার্বিক প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন। পুরো ওভারহোলিংয়ের কাজ শেষ হয়েছে। এ ছাড়া দুটি পুকুর সংস্কার করা হয়েছে। পুকুরের সঙ্গে সংযুক্ত রাস্তার কাজও চলমান, যা কোরবানির আগেই শেষ হবে। এতে কঠিন বর্জ্য সংরক্ষণ ও অপসারণে কোনও সমস্যা হবে না।

তিনি বলেন, পুকুরের সঙ্গে সংযুক্ত যে রাস্তাটি রয়েছে, যেদিক দিয়ে ফ্লেশিংয়ের গাড়িগুলো ঈদের পরে চলাচল করবে, সেই রাস্তারও কাজ চলমান আছে। আশা করছি, ঈদের আগেই কাজ সম্পূর্ণভাবে শেষ হবে। এ ছাড়াও আমাদের যে ক্রোম শেডিং প্ল্যান্ট রয়েছে, সেটি আগে আংশিকভাবে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এখন আমরা একটি চাইনিজ কোম্পানির সহযোগিতায় সেটি পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিয়েছি। তাদের সহযোগিতায় নবীনগরে একটি ফ্যাক্টরি স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে বর্জ্য থেকে রাস্তা তৈরির উপকরণ উৎপাদন করা হচ্ছে। তারা ইতিমধ্যে প্রায় চার হাজার মেট্রিক টন উপকরণ নিয়েছে এবং ভবিষ্যতেও তা সংগ্রহ করবে।

তিনি আরও বলেন, বহু বছর ধরে ইউনিট অর্থায়নে প্রগতি কোম্পানি কাজ করছে। তাদের মাধ্যমেই সিইটিপির পূর্ণাঙ্গ অ্যাসেসমেন্ট ও ডিজাইন করা হচ্ছে। আশা করছি আগামী জুন-জুলাইয়ের মধ্যে আমরা এই রিপোর্ট হাতে পাবো। রিপোর্ট পাওয়ার পর কোথায় কী ধরনের ডিজাইন ঘাটতি আছে, সেগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হবে এবং সরকার সে অনুযায়ী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারবে। পাশাপাশি সরকার আরও যে বিষয়টি চিন্তা করছে, তা হলো- এখানে প্রায় ৩০টি ট্যানারি নিজেদের উদ্যোগে সলিড ওয়েস্ট প্রসেসিং করতে আগ্রহী। তাদের সে বিষয়ে অনুমোদন দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। এর ফলে কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার ওপর চাপ অনেকটাই কমে যাবে এবং প্রতিদিনের বিপুল বর্জ্যের একটি বড় অংশ স্থানীয়ভাবেই ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব হবে।

বিসিকের প্রস্তুতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা

বিসিক চামড়া শিল্প নগরীর নির্বাহী প্রকৌশলী প্রকৌশলী মেহরাজুল মাঈয়ান বলেন, আমরা চামড়া সংগ্রহের জন্য ট্যানারিকে শতভাগ প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছি। চামড়া প্রক্রিয়াজাতের সময় ঈদের পর থেকে টানা তিন মাস নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ঈদের দিন এবং এর পরবর্তী কয়েকদিন সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে চামড়াবাহী ট্রাক জ্যামে পড়ে চামড়া নষ্ট না হয় সেজন্য ট্রাফিক ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশ ফোর্সের মাধ্যমে চামড়া শিল্প নগরী বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, সারা দেশে এক কোটি দুই লাখ কোরবানিযোগ্য পশু নির্ধারণ করা হয়েছে। এরমধ্যে ১০ ভাগ কম ধরে ৯০ লক্ষ্যের কম বেশি পশু কোরবানি হবে। এর মধ্যে ৬০ থেকে ৭০ ভাগ হিসেবে ৫৫ থেকে ৬৫ লাখ চামড়া ট্যানারিতে প্রবেশ করবে বলে আমরা আশা প্রকাশ করছি। গত বছর ৪৫ থেকে ৫০ লাখ পিস চামড়া ট্যানারিতে প্রবেশ করেছিল।

তিনি আরও বলেন, সাভার চামড়া শিল্পনগরীর ২০৫টি প্লটের মধ্যে ১৬২টি ট্যানারির রয়েছে। এর মধ্যে ১৫৫ থেকে ১৫৬টি কারখানা চামড়া প্রক্রিয়াকরণের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে।

সাভারের এই ট্যানারি পল্লি এখন শুধু চামড়া আসার অপেক্ষায়। সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এবার একটি সফল ও পরিবেশবান্ধব চামড়া সংগ্রহের মৌসুম উপহার দেওয়া সম্ভব হবে।

রপ্তানি তথ্য ও বৈশ্বিক বাজার

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যানুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের চামড়া খাতের রফতানি এক হাজার ১৪৫ দশমিক ০৭ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। অন্যদিকে ফরচুন বিজনেস ইনসাইটসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে বৈশ্বিক চামড়াজাত পণ্যের বাজার ছিল ৪৪০ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার, যা ২০৩০ সালের মধ্যে ৭৩৮ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে।