ঢাকার হাজারীবাগ ও কাপ্তানবাজারে নির্মিত আধুনিক পশু জবাইখানা দুটি নির্মাণের পর বছরের পর বছর অচল পড়ে আছে। অত্যাধুনিক ভবন, বড় ফটক, পশু ওঠা-নামার পৃথক জায়গা ও কোটি টাকার যন্ত্রপাতি থাকলেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। সবই ধুলার আস্তরে ঢেকে আছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) তত্ত্বাবধানে থাকা এ জবাইখানা দুটি নির্মাণে খরচ হয়েছে মোট ১৩৩ কোটি টাকা।
হাজারীবাগ জবাইখানা
হাজারীবাগের পাঁচতলা জবাইখানার নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০২৭ সালের আগস্টে। শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২০ সালের জুনে। কিন্তু নির্মাণ শেষ হওয়ার আগেই ২০১৯ সালে তৎকালীন মেয়র সাঈদ খোকন এটি উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনের দিন একটি গরু জবাই করা হয়েছিল। এরপর সাত বছর পেরিয়ে গেলেও আর কোনো পশু জবাই হয়নি। অথচ এখানে ঘণ্টায় ৩০টি গরু ও ৬০টি ছাগল জবাই করার সক্ষমতা রয়েছে। জবাইখানা নির্মাণে খরচ হয়েছে ৮১ কোটি টাকা।
সরেজমিন দেখা যায়, ভবনের প্রধান ফটক তালাবদ্ধ। ভেতরে বা বাইরে কোনো নিরাপত্তাকর্মী নেই। সামনে কোরবানির পশুর হাট বসেছে। ভবনের ভেতরের আধুনিক যন্ত্রপাতি ঠিক আছে কি না জানতে চাইলে ডিএসসিসির যান্ত্রিক বিভাগের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, মাঝেমধ্যে যন্ত্র চালিয়ে সচল রাখা হয়। তবে বছরের পর বছর ফেলে রাখলে যেকোনো সময় বিকল হতে পারে।
কাপ্তানবাজার জবাইখানা
কাপ্তানবাজারের জবাইখানার নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে। শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২০ সালের জুনে। এখানে ঘণ্টায় ১৪টি গরু ও ৩০টি ছাগল জবাই করার সক্ষমতা রয়েছে। নির্মাণে খরচ হয়েছে ৫২ কোটি টাকা। পরিস্থিতি হাজারীবাগের মতোই অচল।
অচল থাকার কারণ
ডিএসসিসি সূত্র জানায়, সমীক্ষা ছাড়াই জবাইখানা দুটি নির্মাণ করা হয়েছে। কোথা থেকে পশু আসবে, কীভাবে আসবে, জবাইয়ের পর মাংস কীভাবে বাজারে যাবে—এসব ভাবনা ছাড়াই প্রকল্প নেওয়া হয়। বড় কারণ ইজারা না হওয়া এবং পরিচালনায় সক্ষমতার ঘাটতি। নির্মাণের পর হাজারীবাগ জবাইখানা তিন বছরের জন্য ইজারা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। ইজারামূল্য প্রথমে ৮ কোটি ৫৬ লাখ টাকা ধরা হয়, পরে কমিয়ে ৬ কোটি ১৬ লাখ টাকা করা হয়। তবু কেউ দরপত্র জমা দেননি।
ঢাকায় মাংস ব্যবসায়ীরা নিজেদের দোকানের সামনে বা অলিগলিতে পশু জবাই করেন। এতে আলাদা পরিবহন খরচ বা ফি দিতে হয় না। সময়ও সাশ্রয় হয়। এমন বাস্তবতা না বদলালে কেউ কোটি টাকা দিয়ে জবাইখানা পরিচালনার দায়িত্ব নেবে না।
নতুন উদ্যোগ
সম্প্রতি জবাইখানা সচলে নড়েচড়ে বসেছে ডিএসসিসি। হাজারীবাগ জবাইখানা চালুর জন্য কমিটি গঠনে অফিস আদেশ জারি করা হয়েছে। কাপ্তানবাজার জবাইখানা চালুর কথাও আলোচনায় এসেছে। ডিএসসিসির প্রশাসক আবদুস সালাম বলেন, ‘কীভাবে আধুনিক পশু জবাইখানা চালু করা যায়, সেটা ভাবছি। যেভাবেই হোক এ দুটি জবাইখানা সচল করব।’
কী করা উচিত
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, প্রথমে স্বাধীন কারিগরি নিরীক্ষা করতে হবে। যন্ত্রপাতি সচল আছে কি না, মেরামত দরকার হলে কত টাকা লাগবে, কত জনবল দরকার—এসব জানতে হবে। ইজারামূল্যকে রাজস্ব আয়ের উৎস হিসেবে দেখা বন্ধ করতে হবে। প্রথম এক-দুই বছর কম ফি, ভর্তুকি বা সরকারি-বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় চালু করতে হবে। নির্দিষ্ট কয়েকটি বাজার নিয়ে পাইলট প্রকল্প শুরু করা যেতে পারে। আইন প্রয়োগ করতে হবে ধাপে ধাপে। আগে সেবা সহজ করতে হবে, পরে খোলা স্থানে পশু জবাই বন্ধে অভিযান চালাতে হবে।
নগর-পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘হাজারীবাগ ও কাপ্তানবাজারের জবাইখানা এখনো বাঁচানো সম্ভব। তবে কাগুজে কমিটি দিয়ে নয়। বাস্তবসম্মত ব্যবসা মডেল, আইন প্রয়োগ, বাজারভিত্তিক পরিকল্পনা ও জবাবদিহি ছাড়া এ প্রকল্প শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতার স্মারক হয়ে থাকবে।’



