হবিগঞ্জের হাওরাঞ্চলে বৈশাখের অতিবৃষ্টিতে বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। হাজার হাজার কৃষক তাদের স্বপ্নের ফসল হারিয়েছেন। বানিয়াচং, আজমিরীগঞ্জ ও হবিগঞ্জ সদর উপজেলার হাওরগুলোতে পানিতে তলিয়ে গেছে পাকা ধান।
ক্ষতির মাত্রা
বানিয়াচং উপজেলার কৃষক সাহেব আলী জানান, আকস্মিক বৃষ্টিতে খাগাপাশা হাওরের তাঁর প্রায় ৭ কিয়ার (১ কিয়ার = ৩০ শতাংশ) জমির পাকা ধান তলিয়েছে। তিনি পানির নিচ থেকে মাত্র ৫০ মণ ধান তুলতে পেরেছেন, অথচ গত বছর একই জমি থেকে পেয়েছিলেন প্রায় ২০০ মণ ধান।
আজমিরীগঞ্জ পৌরসভার ফতেহপুর এলাকার বর্গাচাষি জিয়াউল মিয়া (৪০) হাইট্টা হাওরে ১১ কিয়ার জমিতে বোরো ধানের চাষ করেছিলেন। বৃষ্টির পর চার কিয়ার জমির ধান তুলতে পেরেছেন। তিনি বলেন, আগেরবার এসব জমি থেকে প্রায় ৩০০ মণ ধান পেয়েছিলেন, এবার ৩০ মণও পাবেন কি না সন্দেহ। ঋণের টাকায় চড়া মজুরিতে শ্রমিক এনে ধান কেটেছেন, কিন্তু খরচই উঠবে না।
কৃষক পরিবারের দুর্দশা
জিয়াউলের স্ত্রী জেসমিন আক্তার (৩৫) মলিন ধান শুকাচ্ছিলেন। তাঁর তিন সন্তানের বয়স ৬ থেকে ৮ বছরের মধ্যে। আসন্ন ঈদে নতুন জামা পাওয়া প্রসঙ্গে শিশুরা নিশ্চুপ। জেসমিন বলেন, 'আল্লাহ আমরার ঈদ নিসেগা ইবার। সব গেহস্ত মরা ইবার।' জিয়াউল যোগ করেন, 'ঈদে এক কেজি তেল আনার মতো পয়সা পর্যন্ত তো নাই।'
বানিয়াচং উপজেলার কৃষক পরিবারের তরুণ সালমান ফারসি জানান, তাঁদের মোট ৪ কিয়ার জমির ধান তলিয়েছিল। এক কিয়ার থেকে যে ধান পেয়েছেন, তা খাওয়ার উপযোগী নয়, হাঁসের খাবার হিসেবে বিক্রি করবেন।
সরকারি সহায়তা ও অভিযোগ
হবিগঞ্জ জেলা প্রশাসন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। তালিকায় জেলার ৯টি উপজেলার ২২ হাজার ৩৭৩ জন কৃষকের তথ্য রয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত বানিয়াচং উপজেলায় ৭ হাজার ৮৮৫ জন কৃষক। তাদের তিন ক্যাটাগরিতে সহায়তা দেওয়া হবে।
তবে তালিকা থেকে অনেক কৃষকের নাম বাদ পড়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যরা। বানিয়াচংয়ের কৃষক আবদুর রব (৫৫) বলেন, 'সরহারি এক্টা ই আছে, ইতাও পাইছি না আমি। আমরার বিরুদ্ধ হেরা, তাই নামটাম নিসে না।' তিনি দাবি করেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় তালিকা তৈরি করা হয়েছে।
ক্ষতিপূরণের দাবি
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পূর্ণাঙ্গ ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়েছেন সমাজতান্ত্রিক ক্ষেতমজুর ও কৃষক ফ্রন্ট হবিগঞ্জ শাখার সদস্য শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ক্ষতি দল বা মত দেখে হয়নি। সব ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক যাতে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারেন, সে জন্য সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে।
হবিগঞ্জের ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন জানান, মন্ত্রণালয়ে তালিকা পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে নির্দেশনা মেনে সহায়তা দেওয়া হবে। রাজনৈতিক বিবেচনায় বাদ পড়া কৃষকরা নিজেদের উপজেলার কৃষি অফিসে যোগাযোগ করতে পারেন।



