কিশোরগঞ্জের প্রত্যন্ত হাওরাঞ্চল মিঠামইনের খয়ারকান্দা হাওরে ধারকর্জ ও ঋণ করে চার বিঘা জমিতে বোরো ধান চাষ করেছিলেন উপজেলার গোপদিঘি এলাকার কৃষক আতিকুর রহমান। তাঁর তিন বিঘা জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। এক বিঘা জমির ধান পানির নিচ থেকে কোনোমতে কেটেছেন। কিন্তু একনাগাড়ে ভালো রোদ না পাওয়ায় সে ধানও তিনি শুকাতে পারেননি। তাই ধানের রং নষ্ট হয়ে গেছে। সেসব ধান বিক্রি করার জন্য করিমগঞ্জের চামড়া নৌবন্দরে এসে এ আড়ত সে আড়তে ঘুরছেন।
কৃষক আতিকুর বলেন, ‘সময়মতো ভালো রোদ না পাওয়ায় ধান সঠিকভাবে শুকাতে পারিনি। রং নষ্ট হয়ে কিছুটা কালচে হয়ে গেছে। সে ধান এখন ব্যাপারীরা ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা দাম করছেন। মনে হচ্ছে ধান ফলায়ে অন্যায় করে ফেলেছি। দূর থেকে ১০০ বস্তা ধান নিয়ে এসে মনে হয় এখন নৌকা ভাড়া আর বস্তা টানা শ্রমিকদেরই দিয়ে দিতে হবে। আর আমি সব কষ্ট ফাউ করেছি।’
ধান উৎপাদন খরচ ও বাজারমূল্যের বৈষম্য
কৃষকদের ভাষ্য, দেশে সবকিছুর দাম বাড়ে, শুধু বাড়ে না কৃষকের ধানের দাম। এক মণ ধান ফলাতেই খরচ হয়ে যায় ১,২০০ টাকার ওপরে আর বিক্রি করতে হচ্ছে ৪০০ থেকে ১,০০০ টাকায়। ইটনা মৃগা এলাকার কৃষক দুলু মিয়া বলেন, কিশোরগঞ্জ হাওরের কৃষকেরা যতটুকু ধান এবার নিতে পেরেছেন, এর বেশির ভাগ ধানের রং নষ্ট। এখন রং নষ্ট এসব ধান নিয়ে তাঁরা পড়েছেন বিপাকে। কৃষকদের বাধ্য হয়ে ৪০০ টাকা মণ ধান বিক্রি করতে হচ্ছে। আর সর্বোচ্চ ভালো শুকনা ধান ১,০০০ থেকে ১,০৫০ টাকায় বিক্রি করা যাচ্ছে। অথচ সরকারিভাবে ১,৪৪০ টাকা মণ ধান কেনা হচ্ছে। এখন কথা হলো সরকারিভাবে ধান বিক্রি করার এ সুযোগই বা কজন পাচ্ছে আর সরকারিভাবে বিক্রির জন্য ঝকঝকে পরিষ্কার ধানই কজনে মাড়াতে পেরেছেন?
চামড়া নৌবন্দরে আড়তের অবস্থা
কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলের মুখ করিমগঞ্জের চামড়া নৌবন্দর। যেখানে দৈনিক হাওর থেকে আসা হাজার হাজার মণ ধান বেচাকেনা হতো। এখান থেকেই দেশের বিভিন্ন জেলার চাতালে ধান সরবরাহ করা হতো। আর কিশোরগঞ্জের বিশাল হাওরাঞ্চলের ধানের ওপর নির্ভর করেই বছরের এ সময়ে চামড়া নৌবন্দরের ৪০টির মতো আড়ত বসে। কৃষকেরা কষ্টার্জিত জমির ভেজা ও শুকনা ধান বস্তায় ভরে ছোট-বড় নৌকায় চামড়া ঘাটের এসব আড়তে নিয়ে আসতেন। আড়তদারেরা এসব ধান কিনে ট্রাকে করে রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, শেরপুর, জামালপুরসহ বিভিন্ন জেলার বড় বড় চালকলে পাঠান। তবে এবার চিত্র ভিন্ন। শুরুতে কিছুটা ধান এলেও বৃষ্টি শুরুর পর থেকে আড়তদারেরাও মনমরা হয়ে গেছেন। সারা দিন বসে থেকেও ধান না কিনতে পেরে অনেকেই আড়ত বন্ধ করে দিয়েছেন।
গত শনিবার সরেজমিনে দেখা যায়, করিমগঞ্জের নাগচিন্নি নদীর তীরে গড়ে ওঠা চামড়া নৌবন্দর এলাকায় কয়েকটি আড়তঘর। অনেক আড়তঘরই ফাঁকা পড়ে রয়েছে। সোহাগ মিয়া নামে একজন আড়তদার জানান, গত বছর এ সময় দৈনিক কয়েক হাজার মণ ধান কিনতে পারলেও এবার সারা দিনে ৫০০ মণ ধান কেনা যায় না। কৃষকেরা ধান মার খাওয়ায় আড়তদারদের ব্যবসা শেষ। আল আমিন নামের আরেকজন আড়তদার বলেন, এখন তাঁরা ৪০০ থেকে ১,০৫০ টাকা মণ ধান কিনছেন। মান বেঁধে ধানের দামের এই পার্থক্য। কারণ, এবার হাওরাঞ্চল থেকে যেসব ধান আসছে, বেশির ভাগই রং নষ্ট, আধা পচা।
সরকারি সংগ্রহ ও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক
কিশোরগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. সাদিকুর রহমান বলেন, ‘কিশোরগঞ্জে সোমবার পর্যন্ত হাওরে ৯৯ ভাগ আর নন–হাওরে ৮৩ ভাগ ধান কাটা হয়েছে। অতিবৃষ্টি আর ঢলের কারণে প্রায় ৪৭ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। মাঠপর্যায়ের সে তালিকা আমাদের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসনের কাছে পাঠানো হয়েছে। তারা ক্ষতিগ্রস্ত তালিকা যাচাই-বাছাই করে ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে।’
জেলা খাদ্যনিয়ন্ত্রকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বোরো মৌসুমে সরকার সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ৩৬ টাকা কেজি দরে ১,৪৪০ টাকা মণ ধান এবং ৪৯ টাকা কেজি চাল সংগ্রহ করছে। চলতি মৌসুমে কিশোরগঞ্জ জেলায় মোট ১৮,৩৩০ টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে সোমবার পর্যন্ত ৬৭৬ টন ধান সংগ্রহ করা হয়েছে। আর চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২৩,৩২৪ টন। এর মধ্যে সোমবার পর্যন্ত ৩,৮২৯ টন সংগ্রহ করা হয়েছে।
কিশোরগঞ্জ জেলার সহকারী খাদ্যনিয়ন্ত্রক মো. মোশারফ হোসেন বলেন, ৩ মে ধান চাল সংগ্রহ অভিযান শুরু হয়েছে, যা আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত চলবে। এর মধ্যে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়ে যাবে। তবে কৃষকদের কাছ থেকে কোনো রকম রং নষ্ট বা ভেজা ধান নেওয়া হচ্ছে না। ঝকঝকে পরিষ্কার ও শুকনা ধানই সংগ্রহ করা হচ্ছে।



