চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার সিংনগর গ্রামের সিংনগর বাঁওড় তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পর্যটকদের কাছে প্রিয়। বাঁওড়ের পাশের আঁকাবাঁকা রাস্তার দুই ধারে নানা ফলের বাগান ও ফসলের মাঠ থাকলেও সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে একটি আঙুর বাগান। দূর থেকে দেখে মনে হয় বিদেশি কোনো আঙুর বাগান। থোকায় থোকায় ঝুলে থাকা মিষ্টি আঙুর পথচারীদের থামিয়ে দিচ্ছে। এই বাগানের রূপকার চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার মানিকপুর গ্রামের তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা সজল আহমেদ (৩৬)।
শখ থেকে বাণিজ্যিক সাফল্য
সজল আহমেদ পাশের গ্রাম সিংনগরে সুস্বাদু জাতের আঙুর চাষ করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন। ২০২৪ সালে শখের বশে পরীক্ষামূলকভাবে এক বিঘা জমিতে আঙুর চাষ শুরু করেন। সেই শখ আজ তাঁকে অভাবনীয় সাফল্য এনে দিয়েছে। গত বছর দুই বিঘা ও চলতি বছর তিন বিঘা জমিতে বাণিজ্যিকভাবে আঙুরের আবাদ করেছেন তিনি।
দর্শনার্থীদের ভিড়
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে সজলের আঙুর বাগানের খবর ছড়িয়ে পড়েছে। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ বাগানের সৌন্দর্য দেখতে আসছেন। দর্শনার্থীরা শুধু বাগান দেখেই ক্ষান্ত হচ্ছেন না, বরং গাছ থেকে টাটকা ও মিষ্টি আঙুর পেড়ে খাচ্ছেন এবং পরিবারের জন্য কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। কেউ কেউ নিজেরাও চাষ করার স্বপ্ন নিয়ে আঙুরের চারা কিনে নিচ্ছেন। বর্তমানে সজলের বাগান ও নার্সারিতে ১৪ জাতের আঙুর গাছ ও চারা আছে। এর মধ্যে ‘বাইকুনুর’ জাতের আঙুর সবচেয়ে বেশি সাড়া ফেলেছে।
গত শুক্রবার সজলের বাড়িতে গিয়ে দর্শনার্থীর ভিড় দেখা যায়। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আঞ্চলিক কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল মামুন নিজের ছেলে ও সহকর্মীদের নিয়ে আঙুর বাগান দেখতে এসেছিলেন। তিনি গাছ থেকে টাটকা আঙুর পেড়ে খাওয়ার পাশাপাশি দুই কেজি আঙুর কিনেছেন এবং আঙুর, পার্সিমন, চায়না সিডলেস লেবু ও আপেলের চারা নিয়ে গেছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, দেশে আঙুরের চাষ হচ্ছে, এটা খুবই ভালো লাগার বিষয়। পরীক্ষামূলকভাবে বাসার ছাদে চাষ করার জন্য তিনি চারা নিয়েছেন, পরে মাঠে চাষ করার ইচ্ছা আছে।
উদ্যোক্তার যাত্রা
উদ্যোক্তা হিসেবে সজল আহমেদের এই যাত্রার শুরু ২০০৯ সালে। অন্যের কাছ থেকে সাত বিঘা জমি বন্দোবস্ত নিয়ে নিজের গ্রামে বরই ও পেয়ারা বাগান করেছিলেন। প্রথম বছরে লাভের মুখ দেখার পর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। বর্তমানে মানিকপুর ও সিংনগর গ্রামে ১৩৯ বিঘা জমিতে ৫৫০ প্রজাতির দেশি-বিদেশি ফলের মিশ্র বাগান ও ১ হাজার ২০০ প্রজাতির ফলের চারার একটি নার্সারি আছে তাঁর।
দেশি-বিদেশি নানা ফল নিয়ে সজলের আগ্রহ দীর্ঘদিনের। এই আগ্রহ থেকে তিনি ফল উৎপাদনকারী বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। সজল বলেন, ‘ভিয়েতনাম ও ভারতের মহারাষ্ট্র ভ্রমণের সময় আঙুর বাগান দেখে মুগ্ধ হই। তখন ওই দুই দেশ থেকে সায়ন (চারা উৎপাদনের জন্য গাছের শাখা) সংগ্রহ করে দেশে নিয়ে আসি এবং নিজের খামারে চারা উৎপাদন করি। সেই চারা দিয়ে ২০২৪ সালে এক বিঘা জমিতে আঙুর চাষ শুরু করি। এ বছর তিন বিঘায় উন্নীত হয়েছে।’
আঙুর চাষের অর্থনীতি
সজল আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, এক বিঘা জমিতে প্রায় ৩০০টি আঙুরের চারা লাগানো যায়। এতে খরচ হয় ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা। প্রতিটি গাছে গড়ে ১৫ কেজি হিসাবে এক বিঘায় প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কেজি আঙুর উৎপাদন হয়। বর্তমানে পাইকারি বাজারদর ন্যূনতম ২৫০ টাকা। ভালো ফলন হলে এক বিঘা জমিতে প্রায় ১০ লাখ টাকা লাভের সম্ভাবনা আছে।
তবে আঙুর চাষে কিছু প্রতিবন্ধকতাও আছে। সজল জানান, বিদেশি ফল হওয়ায় জাতভেদে কিছু গাছে ফাঙ্গাস আক্রমণ করে এবং ফল পাড়ার পর পচে যায়, যা বাজারে প্রচলিত ওষুধে সারানো যায় না। এ বিষয়ে সরকারি পর্যায়ে গবেষণার প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, বাজারে যেখানে আমদানি করা আঙুর ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা দরে বিক্রি হয়, সেখানে দেশি আঙুর তার অর্ধেকের কম দামে পাওয়া সম্ভব।
কৃষি বিশেষজ্ঞের মতামত
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের চুয়াডাঙ্গার উপপরিচালক মাসুদুর রহমান সরকার প্রথম আলোকে বলেন, লাভজনক হওয়ায় বিদেশি ফলের পাশাপাশি আঙুর চাষেও মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। আঙুর উৎপাদন করে দেশের মানুষের চাহিদা মেটানো গেলে আমদানির বিপুল পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় হবে এবং দেশের অর্থনীতিও শক্তিশালী হবে। তিনি বলেন, ‘কোন জাতটি আমাদের জন্য প্রযোজ্য, সেটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ফাইন্ড আউট করতে পারলে এটি খুব সহজে উৎপাদন করা সম্ভব হবে।’



