বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার মূল ভিত্তি ধান। এর মধ্যে বোরো মৌসুম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশের মোট চাল উৎপাদনের প্রায় ৫৪ শতাংশ আসে বোরো থেকে। এ বছর মৌসুমের শুরুতে অনুকূল আবহাওয়া, পর্যাপ্ত আবাদ, উন্নত জাতের ব্যবহার ও ভালো গাছের বৃদ্ধি দেখে ভালো উৎপাদনের আশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু শেষভাগে অতিবৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি, ঝড়, সেচসংকট, ডিজেলের ঘাটতি এবং রোগ-পোকার আক্রমণ সেই সম্ভাবনাকে অনিশ্চিত করেছে। বিশেষ করে হাওরসহ বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলে অতিবৃষ্টি ও শিলাবৃষ্টিতে বোরো ধানের বড় ক্ষতি হয়েছে। প্রাথমিক হিসাবে হাওর ও নিম্নাঞ্চল মিলিয়ে প্রায় ১৪-১৫ লাখ টন ধান উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এটি শুধু কৃষকের ক্ষতি নয়; জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তার জন্যও বড় সতর্কবার্তা। তবে চূড়ান্ত ক্ষতির হিসাব করতে হলে সব ফসল কাটার পর নিরপেক্ষ মূল্যায়ন প্রয়োজন।
পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে ডিজেলের সংকট। বোরো সম্পূর্ণ সেচনির্ভর হওয়ায় ডিজেলের ঘাটতিতে অনেক এলাকায় সময়মতো সেচ দেওয়া যায়নি, যার প্রভাব পড়েছে দানা গঠনে। পরে ডিজেলের দাম ও সরবরাহ–সংকট ধান কাটাকেও ব্যাহত করেছে। এই বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে—যদি বোরো উৎপাদনে ১৪-১৫ লাখ টনের ঘাটতি তৈরি হয়, তাহলে সেই ক্ষতি কীভাবে পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব?
দ্রুত ধান কাটা ও আউশ মৌসুমের গুরুত্ব
সরকারি হিসাব ও পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, হাওর বাদে দেশের বাকি এলাকায় এ মৌসুমে প্রায় ৪৬ লাখ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ নাগাদ আনুমানিক ২২-২৩ লাখ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে। অর্থাৎ এখনো প্রায় ২৩-২৪ লাখ হেক্টর জমির ধান মাঠে রয়েছে। তাই প্রথম কাজ হলো বাকি বোরো ধান দ্রুত ও নিরাপদে ঘরে তোলা। একটি দানাও যেন নষ্ট না হয়, সে জন্য স্থানীয় প্রশাসন, কৃষি বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। শ্রমিকসংকট, বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বিবেচনায় প্রয়োজনীয় এলাকায় কম্বাইন হারভেস্টারসহ কৃষিযন্ত্র দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, আউশ মৌসুমকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। আউশ স্বল্পমেয়াদি, তুলনামূলক কম সেচনির্ভর এবং অনেক ক্ষেত্রে বৃষ্টির পানিতে উৎপাদনযোগ্য। তাই এটি উৎপাদন খরচ কমাতে এবং সম্ভাব্য খাদ্যঘাটতি পুষিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আমাদের দেশে আউশের সম্ভাব্য এলাকা প্রায় ২০ লাখ হেক্টর বা তার চেয়ে বেশি; কিন্তু আবাদ হয় ১১ লাখ হেক্টরের মতো। উৎপাদন হয় ৩০ লাখ টনের মতো। যদিও আউশ লাগানোর সময় শেষের দিকে, তবু এখনই বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া গেলে আবাদ এলাকা বাড়িয়ে উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে বোরোর ক্ষতির একটি অংশ পূরণ করা সম্ভব। এ জন্য উন্নত ও স্বল্পমেয়াদি আউশ বীজ দ্রুত কৃষকের কাছে পৌঁছাতে হবে। পাশাপাশি সার, প্রণোদনা, কৃষিঋণ এবং প্রয়োজনীয় সম্পূরক সেচের ব্যবস্থা করতে হবে। বোরো কাটার পর খালি জমি ও পতিত জমি দ্রুত আউশ আবাদে আনা জরুরি। মাঠপর্যায়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নিবিড় তদারকিও বাড়াতে হবে।
আমন মৌসুমের পরিকল্পনা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি
তৃতীয়ত, আগামী আমন মৌসুমকে কৌশলগতভাবে পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। আমন দেশের দ্বিতীয় বৃহৎ ধান উৎপাদন মৌসুম; মোট চাল উৎপাদনের প্রায় ৩৯ শতাংশ আসে আমন থেকে। বোরোতে সম্ভাব্য ঘাটতি পূরণে এবার আমনের আবাদ ও ফলন বাড়ানো জরুরি। সম্ভাব্য আবাদ এলাকা ৫৯ লাখ হেক্টর থেকে ৬০ লাখ হেক্টরে এবং উৎপাদন ১ কোটি ৭০ লাখ টনে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়া যেতে পারে। বন্যা, জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততা–সহনশীল জাতের বিস্তার বাড়াতে হবে। অনেক এলাকায় এখনো আমনের ফলন সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি। সময়মতো চারা রোপণ, উন্নত জাত ব্যবহার, সুষম সার প্রয়োগ, রোগ-পোকা ব্যবস্থাপনা এবং প্রয়োজনে সম্পূরক সেচ ও জলবায়ু–সহনশীল প্রযুক্তি ও যান্ত্রিকীকরণের ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে আমনের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব।
চতুর্থত, ২ কোটি ৩০ লাখ টনের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে আগামী বোরো মৌসুমের জন্য এখন থেকেই দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি নিতে হবে। বারবার একই ধরনের সংকট প্রমাণ করে, শুধু উৎপাদন বাড়ানো যথেষ্ট নয়; উৎপাদনব্যবস্থাকে জলবায়ু–সহনশীল ও টেকসই করতে হবে। হাওর ও নিম্নাঞ্চলের জন্য বিশেষ অভিযোজন কৌশল প্রয়োজন। আগাম বন্যা এড়াতে স্বল্পমেয়াদি বোরো জাত, বিশেষ করে ব্রি ধান ১১৮-এর মতো জাত সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। সময়মতো ধান কাটার জন্য কৃষি যান্ত্রিকীকরণ আরও বাড়াতে হবে এবং যন্ত্র পরিচালনায় নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
সেচব্যবস্থাকেও আধুনিক ও দক্ষ করতে হবে। ভূগর্ভস্থ ও ভূ-উপরিস্থ পানির সমন্বিত ব্যবহার বাড়াতে হবে। সৌরশক্তিচালিত সেচপাম্পের ব্যবহার বাড়ানো গেলে ডিজেলের ওপর চাপ কমবে এবং কৃষকও উপকৃত হবেন। পাশাপাশি খাদ্য সংরক্ষণ ও সংগ্রহ–উত্তর ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব দিতে হবে। প্রতিবছর উৎপাদিত খাদ্যের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ (১০-১২ শতাংশ) সংগ্রহ ও সংগ্রহ–উত্তর পর্যায়ে নষ্ট হয়। সর্বক্ষেত্রে যান্ত্রিকীকরণ, উন্নত সংরক্ষণব্যবস্থা এবং আধুনিক গুদাম–সুবিধা বাড়ানো গেলে এই অপচয় অনেকটাই কমানো সম্ভব।
কৃষকের উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাও এখন অত্যন্ত জরুরি। উৎপাদন ব্যয় ক্রমাগত বাড়ছে; সার, ডিজেল, শ্রম, সেচ ও কীটনাশকের উচ্চমূল্যের কারণে কৃষকের লাভ কমে যাচ্ছে। অনেক সময় উৎপাদন খরচ বাড়লেও কৃষক ধানের ন্যায্য দাম পান না। মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য, বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং সরকারি ক্রয় কার্যক্রমের সীমাবদ্ধতায় কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হন। তাই খাদ্যনিরাপত্তা বজায় রাখতে উৎপাদনের পাশাপাশি কৃষকের লাভজনকতাও নিশ্চিত করা জরুরি। এ জন্য সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান ও চাল সংগ্রহ বাড়ানো, ন্যূনতম সহায়ক মূল্য সর্বক্ষেত্রে কার্যকর করা, বাজার মনিটরিং জোরদার করা এবং কৃষক পর্যায়ে সহজ সংরক্ষণ সুবিধা ও ডিজিটাল বিপণনব্যবস্থা এবং সমবায়ভিত্তিক বাজারকাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন। কৃষক যদি তাঁর উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতভাবে পান, তাহলে ভবিষ্যতেও উৎপাদন বাড়াতে উৎসাহিত হবেন, যা দেশের দীর্ঘমেয়াদি খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ড. মো. শাহজাহান কবীর, সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)



