এক দশক আগে থাইল্যান্ডের একটি পুকুরের ধারে কিছু হাড়ের সন্ধান পাওয়া যায়। সম্প্রতি সেই হাড় পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা একটি সম্পূর্ণ নতুন প্রজাতির ডাইনোসর শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন। এই বিশালাকার ডাইনোসরটি মূলত তৃণভোজী ছিল এবং এর ছিল অত্যন্ত লম্বা গলা ও দীর্ঘ লেজ।
নতুন প্রজাতির নামকরণ ও গুরুত্ব
থাইল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যের লন্ডনের গবেষকেরা যৌথভাবে এই প্রাণীর নাম দিয়েছেন নাগাটাইটান চাইয়াফুমেনসিস (Nagatitan chaiyaphumensis)। এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত সবচেয়ে বড় ডাইনোসর হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
গবেষণা প্রকাশ ও আকার
গত ১৪ মে, বৃহস্পতিবার ‘সায়েন্টিফিক রিপোর্টস’ জার্নালে এই ডাইনোসর নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা প্রকাশিত হয়। গবেষণা অনুযায়ী, নাগাটাইটানের ওজন ছিল আনুমানিক ২৭ মেট্রিক টন, যা প্রায় ৯টি পূর্ণবয়স্ক এশীয় হাতির সমান। এর দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ২৭ মিটার। অন্যদিকে, ভয়ংকর টি-রেক্সের ওজন হতো সাধারণত ৬ থেকে ৯ টনের মধ্যে এবং এর দৈর্ঘ্য ছিল ১২ মিটারের কিছু বেশি। অর্থাৎ, ওজন ও আকারে নতুন এই ডাইনোসরটি টি-রেক্সের চেয়েও অনেক বড় ছিল।
‘দ্য লাস্ট টাইটান’ ডাকনাম
বিজ্ঞানীরা একে ‘দ্য লাস্ট টাইটান’ বলে ডাকছেন, কারণ এটি ওই অঞ্চলের সবচেয়ে নতুন ডাইনোসরসমৃদ্ধ শিলাস্তরে পাওয়া গেছে, যার বয়স ১০ থেকে ১২ কোটি বছরের মধ্যে। নামের প্রথম অংশ ‘নাগা’ থাই ও দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় লোককথার পৌরাণিক জলজ সাপ থেকে নেওয়া হয়েছে। ‘টাইটান’ শব্দটি এর বিশাল আকার ও গ্রিক পুরাণের দৈত্যদের নির্দেশ করে।
নামের দ্বিতীয় অংশের অর্থ
নামের দ্বিতীয় অংশ ‘চাইয়াফুমেনসিস’-এর অর্থ হলো থাইল্যান্ডের চাইয়াফুম প্রদেশ থেকে আগত। এই প্রদেশেই ১০ বছর আগে পুকুরের ধারে ডাইনোসরটির জীবাশ্ম আবিষ্কৃত হয়েছিল। এখন আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পাওয়ায় এটি থাইল্যান্ডে নামকরণ হওয়া ১৪তম ডাইনোসর ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ডাইনোসর হিসেবে স্থান করে নিয়েছে।
সওরোপড দলের সদস্য
নাগাটাইটান ছিল মূলত সওরোপড নামে ডাইনোসর দলের সদস্য। এই তৃণভোজী দানবদের গলা খুব লম্বা হতো। বিশ্বজুড়ে এদের আকার মানুষের চেয়ে কিছুটা বড় থেকে শুরু করে পৃথিবীর ইতিহাসের সর্ববৃহৎ স্থলচর প্রাণী পর্যন্ত হতো। ডাইনোসরটির পা ও পেটের হাড়সহ কঙ্কালের যে অংশগুলো পাওয়া গেছে, তার পাশে দাঁড়ালে একজন মানুষকে খুবই ছোট দেখাবে।
অন্যান্য ডাইনোসরের সঙ্গে তুলনা
নাগাটাইটান পৃথিবীর ইতিহাসের বৃহত্তম প্রাণী না হলেও এটি আকারে বিশাল ছিল। বর্তমানে যুক্তরাজ্যের ‘দ্য হারবার্ট আর্ট গ্যালারি অ্যান্ড মিউজিয়ামে’ প্রদর্শিত বিখ্যাত সওরোপড ডাইনোসরটির চেয়েও এটি অনেক বড়। গবেষণার প্রধান লেখক ও ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের থাই পিএইচডি শিক্ষার্থী থিতিউত সেথাপানিচসাকুল জানান, সাধারণ মানুষের হিসাব অনুযায়ী এই ডাইনোসরটি বেশ বড়। বিখ্যাত ডিপ্লোডোকাস কার্নেগি ডাইনোসরের চেয়ে এর ওজন অন্তত ১০ টন বেশি ছিল। তবে প্যাটাগোটাইটান কিংবা রুইয়াঙ্গোসরাসের মতো দানবীয় সওরোপডদের তুলনায় এটি অনেকটাই ছোট।
ভূতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট
১০ থেকে ১২ কোটি বছর আগের ডাইনোসর হওয়ায় এটি চিক্সুলুব গ্রহাণুর আঘাতে পাখি ছাড়া অন্যান্য সব ডাইনোসর বিলুপ্ত হওয়ার অনেক আগে থেকেই পৃথিবীতে রাজত্ব করত। তবে এটি থাইল্যান্ডের শেষ ডাইনোসরগুলোর অন্যতম, কারণ এর কিছুদিন পরই এই অঞ্চলটি একটি অগভীর সমুদ্রে পরিণত হয়েছিল।
জীবাশ্মের তাৎপর্য
নাগাটাইটানের সামনের পায়ের হাড়টি লম্বায় ১.৭৮ মিটার। গবেষক সেথাপানিচসাকুল এর পাশে দাঁড়িয়ে থাকার একটি ছবি এর বিশালতা প্রমাণ করে। হাড়টির উচ্চতা প্রায় তাঁর সমান! শিলাস্তরে এর অবস্থান থেকে মনে করা হয়, এটিই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আবিষ্কৃত শেষ বা সবচেয়ে নতুন যুগের বিশালাকার সওরোপড। তবে এর মানে এই নয় যে এই অঞ্চলে আর কোনো ডাইনোসর পাওয়ার সম্ভাবনা নেই।
ভবিষ্যৎ গবেষণা
থাই বিজ্ঞানীদের স্বপ্ন হলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ডাইনোসরদের বিশ্বমঞ্চে পরিচিত করানো। থাইল্যান্ড ও ইউসিএলের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের যৌথ প্রচেষ্টা এই অঞ্চলের জীবাশ্মবিজ্ঞান সম্পর্কে জ্ঞান আরও বাড়াবে। বিজ্ঞানীদের কাছে এমন অনেক সওরোপড জীবাশ্মের সংগ্রহ রয়েছে, যা নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে গবেষণা করা হয়নি। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি নতুন প্রজাতিও থাকতে পারে। ব্যাংককের এশিয়াটিক এলাকার থাইনোসর জাদুঘরে নতুন আবিষ্কৃত এই নাগাটাইটানের একটি হুবহু পূর্ণাঙ্গ মডেল তৈরি করে দর্শকদের জন্য প্রদর্শন করা হচ্ছে।



