কিশোরগঞ্জে অপরিপক্ব লিচু বিক্রি, সুনাম নষ্টের আশঙ্কা
কিশোরগঞ্জে অপরিপক্ব লিচু বিক্রি, সুনাম নষ্ট

সোয়া ২০০ বছর আগে কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ার মঙ্গলবাড়িয়ায় লিচুর আবাদ শুরু হয়। এখন গাছে গাছে ঝুলছে লিচু। তবে দৃশ্যপট বদলে গেছে। দুই বন্ধু জিসান ও রুমেল ময়মনসিংহের গফরগাঁও থেকে মোটরসাইকেলে মঙ্গলবাড়িয়া গ্রামে এসেছেন লিচু খেতে। জিসান লিচু খেতে গিয়ে চোখ-মুখ কুঁচকে ফেলেন। টক লিচু খেয়েও তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইভে বলছেন, 'আহা, কত্ত মজা আর মিষ্টি লিচু! গাইস, আমরা এখন মঙ্গলবাড়িয়া লিচুগ্রামে। আপনারাও চলে আসেন সে-ই মজাদার লিচু খেতে। একটু আগেভাগে চলে আসেন, না হলে পরে হয়তো মঙ্গলবাড়িয়ার লিচুর স্বাদ না-ও পেতে পারেন।' জিসান বলেন, 'এত দূর থেকে এসেছি। এখন লিচু টক হলেও কি বলা যায়? শুধু কী আর লিচু খেতে এসেছি? ভিডিও করে তো বন্ধুদের দেখাতে হবে। সে জন্য টক লিচুকে মিষ্টি বলে চালিয়ে দিছি।'

দূর থেকে আসা দর্শনার্থীদের ভিড়

শুধু জিসান-রুমেল নন, গত এক সপ্তাহ ধরে কিশোরগঞ্জসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে নানা বয়সী লোকজন পরিবার নিয়ে মঙ্গলবাড়িয়া গ্রামে ভিড় করছেন। বেশি লাভের আশায় এ সুযোগকে কাজে লাগাচ্ছেন লিচু বিক্রেতারা। তাঁরা এখনো রং আসেনি এমন অপরিপক্ব ১০০ লিচুকে ৪০০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি করছেন। ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও দূর থেকে আসা লোকজন সেই আধপাকা লিচু কিনছেন। এতে মঙ্গলবাড়িয়ার লিচুর সুনাম নষ্ট হচ্ছে।

মঙ্গলবার সরেজমিনে দেখা গেছে, সাজগোজ করে তরুণ-তরুণীসহ নানা বয়সী লোকজন পরিবার নিয়ে মঙ্গলবাড়িয়া গ্রামে এসেছেন। মোটরসাইকেল ও নানা ধরনের গাড়ির জটলা আছে। কেউ ছবি ও ভিডিও করছেন, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইভ করছেন। ব্যাপারীরা গাছের নিচে ভ্রাম্যমাণ দোকান বসিয়ে আধপাকা লিচু গাছ থেকে পেড়ে হাঁকডাক দিয়ে 'মধু, মধু' বলে বিক্রি করছেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ক্রেতাদের হতাশা

হোসেনপুর উপজেলা থেকে অটোরিকশায় স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে লিচুগ্রামে এসেছেন আফজাল হোসেন। পছন্দ না হলেও স্ত্রী-সন্তানদের কথা ভেবে ৫০০ টাকা দিয়ে তিনি ১০০টি লিচু কিনেছেন। আফজাল বলেন, 'পথে যে লিচু ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, মঙ্গলবাড়িয়ায় সেই লিচু ৫০০ টাকা দিয়ে কিনতে হলো। লিচুগুলো পরিপক্ব হলে ৮০০ বা ১ হাজার দিলেও গায়ে লাগত না। এতে শুধু বিক্রেতাদের দোষ দিলে হবে না, আমাদেরও দোষ আছে। পাশাপাশি যারা কনটেন্ট ক্রিয়েট করে ভাইরাল করছে, তারাও কম দায়ী নয়।'

মঙ্গলবাড়িয়া গ্রামের ভেতর দিয়ে পাকুন্দিয়া সদর বাজারে যাচ্ছিলেন স্কুলশিক্ষক খায়রুল ইসলাম। তিনি বলেন, মঙ্গলবাড়িয়ার লিচুগ্রাম এখন অনেকটা ব্যাপারীদের হাতে চলে গেছে। আগে গ্রামের মানুষ নিজেরা লিচু খাওয়ার পাশাপাশি দেশ-বিদেশের আত্মীয়-স্বজনকে উপহার দিতেন। যাঁরা বিক্রি করতেন, সময়মতো পরিপক্ব লিচু বিক্রি করতেন। কিন্তু এখনকার দৃশ্য পুরোই উল্টো। লিচুগ্রাম অনেকটা বাণিজ্যিক হয়ে গেছে।

করিমগঞ্জ উপজেলা থেকে আসা শায়লা ও নাঈম নামের এক দম্পতি বলেন, ফেসবুক-ইউটিউবে মঙ্গলবাড়িয়ার টসটসে লিচু দেখে অনেক লোভ হয়। গতবার আসতে চেয়েও পারেননি। এবার সুযোগ পেয়ে চলে এসেছেন। কিন্তু এসে হতাশ হয়েছেন। লিচুগুলোকে ভালোভাবে পাকতে দেওয়া হচ্ছে না। প্রশাসনের উচিত সময় বেঁধে দেওয়া, যাতে বিক্রেতারা তখন লিচু পেড়ে বেচাবিক্রি করেন। এতে ক্রেতারাও সন্তুষ্টি ও তৃপ্তি নিয়ে লিচু খেতে পারবেন।

ব্যাপারীদের যুক্তি

গাছের নিচে ভ্রাম্যমাণ দোকান বসিয়ে লিচু বিক্রি করছেন খোকন মিয়া। নিজের গাছ নেই। মুকুল আসার পর কম দামে অন্যের ৩০০ লিচুগাছ কিনে পরিচর্যা করেছেন তিনি। আধপাকা লিচু বিক্রির ব্যাপারে প্রশ্ন করলে খোকন বলেন, 'একটু আগেভাগে বিক্রি শুরু না করলে ৩০০ গাছের লিচু একেবারে কি বিক্রি করা যাবে? টাকা দিয়ে গাছ কিনেছি, কয়টা টাকা লাভ করতেই।' বেশি দামের বিষয়ে তাঁর যুক্তি, 'মঙ্গলবাড়িয়া ব্র্যান্ড বলে কথা। এরপরও গতবারের তুলনায় এবার দাম কম।'

তবে লিচু চাষি তওহিদুল ইসলাম বললেন ভিন্ন কথা। তিনি এ প্রতিবেদককে তাঁর লিচুগাছ দেখিয়ে বললেন, 'হাঁকডাক দিয়ে যে লিচু বিক্রি হচ্ছে, তার চেয়ে আমার গাছের লিচুর আকার ও রং ভালো। এরপরও আমি এক সপ্তাহের মধ্যে লিচুগাছে হাত দেব না। স্বাদে-গুণে ভরপুর হলেই আমি লিচু পাড়া শুরু করব। কয়টা টাকা বেশি লাভের আশায় মঙ্গলবাড়িয়ার লিচুর সুনাম নষ্ট করা যাবে না।'

মঙ্গলবাড়িয়ার লিচুর ইতিহাস ও সম্ভাবনা

জনশ্রুতি আছে, গ্রামের এক ব্যক্তি ১৮০২ সালে চীনে পড়তে গিয়ে দুটি লিচুর চারা এনে লাগিয়েছিলেন। সেখান থেকেই মঙ্গলবাড়িয়ায় লিচুর চাষ শুরু। মঙ্গলবাড়িয়াসহ পাশের কুমারপুড়, নারান্দী, হোসেন্দীতে বাড়ির উঠান, আঙিনা, পুকুরপাড়, খেতের আইলসহ বিভিন্ন জায়গায় ১০ থেকে ১২ হাজার লিচুগাছ আছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার ফলন ভালো হয়েছে। এসব গাছ থেকে ১২ থেকে ১৩ কোটি টাকা আয়ের আশা করছেন চাষিরা।

পাকুন্দিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নূর-ই-আলম প্রথম আলোকে বলেন, বেলে ও দোআঁশ মাটির কারণে মঙ্গলবাড়িয়াসহ আশপাশের গ্রামে লিচুর ফলন ভালো হয়েছে। আকর্ষণীয় গোলাপি রং ও ছোট বিচির কারণে মঙ্গলবাড়িয়ার লিচুর সুখ্যাতি আছে। ভালো ফলন ও লাভের কারণে এলাকাবাসী দিন দিন লিচু চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। তিনি চাষি ও ব্যাপারীদের অপরিপক্ব লিচু বিক্রি না করে সঠিক সময়ে লিচু বিক্রির আহ্বান জানান।