২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে মধ্যবিত্ত ও বেসরকারি চাকরিজীবীদের ওপর করের বোঝা বেড়েছে। করমুক্ত সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা রেখে সরকার ‘ব্র্যাকেট ক্রিপ’ নামক নীরব কৌশলে প্রকৃত কর বাড়িয়েছে। বিনিয়োগ রিবেট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে, এবং সঞ্চয়পত্রের মুনাফায় উৎসে কর দ্বিগুণ করে ১০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে বেতনভোগীদের প্রকৃত আয় হ্রাস পাচ্ছে।
করকাঠামোর পরিবর্তন ও প্রভাব
২০২৪-২৫ অর্থবছরের করকাঠামোতে প্রথম ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত করমুক্ত ছিল, এরপর ১ লাখ টাকায় ৫ শতাংশ, পরবর্তী ৪ লাখ টাকায় ১০ শতাংশ এবং ধাপে ধাপে ১৫, ২০, ২৫ ও ৩০ শতাংশ কর ধার্য ছিল। নতুন প্রস্তাবে করমুক্ত সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করা হয়েছে, কিন্তু ৫ শতাংশের ধাপটি তুলে দিয়ে সরাসরি ১০ শতাংশ কর শুরু হয়েছে। ফলে ৬ লাখ টাকা বার্ষিক করযোগ্য আয়ের ব্যক্তির কর প্রায় ১২.৫ শতাংশ বেড়েছে।
ব্র্যাকেট ক্রিপ: নীরব কর বৃদ্ধি
অর্থনীতিতে ‘ব্র্যাকেট ক্রিপ’ বলতে বোঝায় করমুক্ত সীমা ও স্ল্যাবগুলো মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় না করে প্রকৃত করের বোঝা বাড়ানো। ২০২০ সালে করমুক্ত সীমা ছিল ৩ লাখ টাকা, যা বর্তমানে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। কিন্তু এই সময়ে মূল্যস্ফীতি ৩০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। ফলে প্রকৃত করমুক্ত সীমা ৫-৬ লাখ টাকা হওয়া উচিত ছিল। বেতন মূল্যস্ফীতির কারণে বাড়লে কর্মীরা উচ্চতর কর স্ল্যাবে চলে যান এবং প্রকৃত আয় না বাড়লেও বেশি কর দেন।
বিনিয়োগ রিবেটে কাটছাঁট
পূর্বে অনুমোদিত বিনিয়োগের ১৫ শতাংশ বা সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত কর রিবেট পাওয়া যেত। নতুন প্রস্তাবে এই হার ১০ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ সীমা সাড়ে ৭ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ১০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করলে আগে দেড় লাখ টাকা রিবেট মিলত, এখন মিলবে ১ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রতি ১০ লাখ টাকা বিনিয়োগে ৫০ হাজার টাকা বেশি কর দিতে হবে।
সঞ্চয়পত্রে দ্বৈত কর
সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর উৎসে কর ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। পূর্বে এই কর চূড়ান্ত ছিল, কিন্তু এখন করদাতার মোট আয়ের সঙ্গে যোগ করে প্রযোজ্য স্ল্যাব অনুযায়ী কর দিতে হবে। অর্থবিল ২০২৬-এর মাধ্যমে আয়কর আইনের ১৬৩ ধারা সংশোধন করা হয়েছে। ফলে পেনশনভোগী বা ছোট বিনিয়োগকারীদের ওপর করের বোঝা বাড়বে।
ন্যূনতম করের ফাঁদ
ন্যূনতম কর ৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, এবং টিন না থাকলে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা যাবে না। দেশে প্রায় ১ কোটি ১৪ লাখ টিনধারী থাকলেও নিয়মিত রিটার্ন দেন মাত্র ৪০ লাখ মানুষ। এই মানসিক বাধা নতুন করদাতা তৈরিতে বাধা সৃষ্টি করছে।
সরকারি-বেসরকারি বৈষম্য
সরকারি চাকরিজীবীদের বাসা ভাড়া, চিকিৎসা ও উৎসব ভাতার বড় অংশ করমুক্ত, অথচ বেসরকারি চাকরিজীবীদের প্রায় পুরো বেতন করযোগ্য। বেসরকারি খাতের প্রভিডেন্ট ফান্ডের সুদের ওপর কর বসানো হয়েছে, যা সরকারি খাতে করমুক্ত। একই আয়ের দুই ব্যক্তির মধ্যে আয়ের উৎসভেদে করের বৈষম্য তৈরি হয়েছে।
মূল্যস্ফীতি ও প্রকৃত আয় হ্রাস
দেশে মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের কাছাকাছি থাকলেও গড় বেতন বৃদ্ধি ৭.৯৪ শতাংশ। করোনার পর থেকে বেসরকারি চাকরিজীবীদের প্রকৃত আয় তিন বছরে ১৫-২০ শতাংশ কমেছে। প্রতিবেশী দেশ ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় মূল্যস্ফীতি বাংলাদেশের অর্ধেকেরও কম।
বিকল্প প্রস্তাব
প্রথম ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত করমুক্ত, এরপর ১ লাখ টাকায় ৫ শতাংশ, পরবর্তী ৪ লাখে ১০ শতাংশ, ৫ লাখে ১৫ শতাংশ, ৬ লাখে ২০ শতাংশ, ৩০ লাখে ২৫ শতাংশ এবং অবশিষ্ট আয়ে ৩০ শতাংশ কর প্রস্তাব করা হয়েছে। সর্বোচ্চ হার ৩০ শতাংশ শুরু হবে ৫১ লাখ টাকার পর। ভাতার করমুক্ত সীমা সাড়ে ৪ লাখ থেকে বাড়িয়ে ৬ লাখ করা এবং বিনিয়োগ রিবেট পুরোনো নিয়মে ফিরিয়ে আনার দাবি জানানো হয়েছে।
দ্বৈত আইন বাতিলের প্রস্তাব
সরকারি ও বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য দ্বৈত আইন বাতিল করে প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটি করমুক্ত করতে হবে। ন্যূনতম কর ৫ হাজার থেকে কমিয়ে ৩ হাজার টাকা করা এবং সর্বজনীন পেনশন স্কিমকে করের সঙ্গে সমন্বয় করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। করমুক্ত সীমা ও স্ল্যাবগুলো মূল্যস্ফীতির সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমন্বয়ের ব্যবস্থা চালু করতে হবে।



