সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামোর আংশিক বাস্তবায়ন শুরু হতে পারে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দিন ১ জুলাই থেকে। নতুন সুপারিশ অনুযায়ী, প্রথম বছরে মূল বেতনের ৫০ শতাংশ ও পরের ২০২৭-২৮ অর্থবছরে বাকি ৫০ শতাংশ দেওয়া হতে পারে। আর ২০২৮-২৯ অর্থবছরে যুক্ত হতে পারে ভাতাগুলো। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
বেতন কমিশনের প্রতিবেদন ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা
সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন ২৩ সদস্যের বেতন কমিশন গত ২১ জানুয়ারি তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে বেতন-ভাতা বৃদ্ধির সুপারিশসংবলিত প্রতিবেদন জমা দেয়। তখন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানায়, ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী ও ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য সরকারের বর্তমান ব্যয় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। কমিশনের প্রস্তাব বাস্তবায়নে প্রয়োজন হতে পারে আরও ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা।
বেসামরিক কর্মচারীদের পাশাপাশি জুডিশিয়াল সার্ভিস পে-কমিশন ও সশস্ত্র বাহিনীর জন্যও বেতন কমিটির প্রতিবেদন প্রস্তুত হয়েছে। তিনটি প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে বাস্তবায়নের সুপারিশ তৈরির জন্য বিএনপি সরকার গত মাসে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে। এই কমিটিই তিন ধাপে বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছে।
তিন ধাপে বাস্তবায়ন ও বাজেট বরাদ্দ
সূত্র জানায়, বাড়তি অর্থ তিন ধাপে ব্যয় করা হবে। প্রথম বছরে মূল বেতনের ৫০ শতাংশ বাস্তবায়নে বাজেটে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হতে পারে। তিন ধাপে বাড়তি ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। সর্বনিম্ন বেতন ২০ হাজার এবং সর্বোচ্চ ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণের সুপারিশ রয়েছে।
প্রস্তাবিত কাঠামোয় ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ রয়েছে। তবে গ্রেড রাখা হয়েছে আগের মতো ২০টি। সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের অনুপাত ১:৮, যা আগে ছিল ১:৯ দশমিক ৪। সর্বনিম্ন বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা প্রস্তাব রাখা হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব ও সিনিয়র সচিবদের জন্য ২০ ধাপের বাইরে আলাদা ধাপ নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে, যা নিয়ে পরে প্রজ্ঞাপন আকারে জারি হবে।
প্রধান উপদেষ্টার প্রতিক্রিয়া ও কমিশনের পটভূমি
প্রতিবেদন গ্রহণ করে সন্তোষ প্রকাশ করেন অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেন, ‘এটি একটি মস্ত বড় কাজ। মানুষ বহুদিন ধরে এর জন্য অপেক্ষা করছে। আউটলাইন দেখে বুঝলাম, এটি খুবই সৃজনশীল কাজ হয়েছে।’
অষ্টম বেতন কমিশনের প্রায় এক যুগ পর ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই সরকার ২৩ সদস্যের নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করে। ছয় মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার কথা থাকলেও এক দফা সময় বাড়ানো হয়। নির্ধারিত শেষ সময় ছিল ১৪ ফেব্রুয়ারি, তবে তার তিন সপ্তাহ আগেই প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়।
প্রতিবেদন প্রণয়নে বিবেচিত বিষয়
জানা গেছে, প্রতিবেদন তৈরিতে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য, পুঞ্জীভূত মূল্যস্ফীতি, প্রতিবেশী দেশের বেতন-ভাতা, বেসরকারি খাতের সঙ্গে সামঞ্জস্য এবং জীবনমানের বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
মূল বেতন বাড়লে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও অন্যান্য ভাতাও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়বে। বৈশাখী ভাতা ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার সুপারিশ করা হয়েছে। যাতায়াত ভাতা ১১তম থেকে ২০তম ধাপের পরিবর্তে ১০ম থেকে ২০তম ধাপ পর্যন্ত দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
পেনশনভোগীদের জন্য পরিবর্তন
পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তনের সুপারিশ করা হয়েছে। মাসে ২০ হাজার টাকার কম পেনশন পেলে তা প্রায় ১০০ শতাংশ বাড়তে পারে। ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকার পেনশন হলে বৃদ্ধি হতে পারে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত। ৪০ হাজার টাকার বেশি পেনশনের ক্ষেত্রে বাড়তে পারে ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত। ৭৫ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য ১০ হাজার টাকা, ৫৫ থেকে ৭৪ বছর বয়সীদের জন্য ৮ হাজার এবং ৫৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য ৫ হাজার টাকা চিকিৎসা ভাতার প্রস্তাব রয়েছে।
উচ্চ বেতনের প্রথম থেকে দশম ধাপের চাকরিজীবীদের বাড়িভাড়া তুলনামূলক কম এবং ১১তম থেকে ২০তম ধাপে বেশি হারে বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞের মতামত
সরকারের এই পরিকল্পনা নিয়ে সাবেক অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ গতকাল রোববার প্রথম আলোকে বলেন, মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় একবারে বাস্তবায়ন ভালো হলেও আয়-ব্যয়ের বাস্তবতা রয়েছে। তাঁর মতে, কয়েক ধাপে বাস্তবায়নের উদ্যোগই বেশি যৌক্তিক।



