ঈদ এলেই সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীদের হাতে বাড়তি টাকা আসে উৎসব বোনাস হিসেবে। সেই টাকায় নতুন পোশাক কেনা, পরিবার-পরিজনের জন্য উপহার, আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে যাওয়া, ঘোরাঘুরি কিংবা নানা ধরনের কেনাকাটায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন অনেকেই। সারা বছরের অপেক্ষার পর ঈদের এই অতিরিক্ত আয় যেন কিছুটা স্বস্তি এনে দেয় মধ্যবিত্ত পরিবারে। তবে অনেক করদাতা এখনো জানেন না—ঈদের বোনাস বা উৎসব ভাতাও আয় হিসেবে গণ্য হয় এবং সেটি আয়কর রিটার্নে দেখাতে হয়। শুধু তাই নয়, ঈদ উপলক্ষে কত টাকা খরচ করা হয়েছে, সেই তথ্যও জীবনযাত্রার ব্যয়ের অংশ হিসেবে আয়কর নথিতে উল্লেখ করতে হয়।
কেন গুরুত্বপূর্ণ ঈদের বোনাসের তথ্য
বাংলাদেশে প্রতিবছর লাখো চাকরিজীবী ঈদ উপলক্ষে এক বা একাধিক উৎসব বোনাস পান। সরকারি চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিয়মে উৎসব ভাতা দেওয়া হয়। একইভাবে বেসরকারি খাতের কর্মীরাও প্রতিষ্ঠানভেদে ঈদ বোনাস পান। অনেকে আবার কর্মদক্ষতা বা বিশেষ পারফরম্যান্সের ভিত্তিতেও অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা পান। কর কর্মকর্তারা বলছেন, একজন ব্যক্তি বছরে যত আয় করেন, তার সবকিছুই আয়কর রিটার্নে প্রতিফলিত হওয়া উচিত। অনেকেই মনে করেন, উৎসব বোনাস আলাদা সুবিধা হওয়ায় সেটি না দেখালেও সমস্যা নেই। বাস্তবে এটি ভুল ধারণা। কারণ, বোনাসের টাকা ব্যাংক হিসাবে জমা হয়, মোবাইল ব্যাংকিং বা ডিজিটাল মাধ্যমে লেনদেন হয় এবং অনেক ক্ষেত্রেই তা নথিভুক্ত থাকে। ফলে ভবিষ্যতে আয় ও ব্যয়ের অসামঞ্জস্য দেখা দিলে কর কর্মকর্তাদের প্রশ্নের মুখে পড়তে হতে পারে।
আয় আর খরচ—দুটোই দেখাতে হবে
কর বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য অনুযায়ী, শুধু আয় দেখালেই দায়িত্ব শেষ হয় না। একজন করদাতা বছরে কী পরিমাণ খরচ করছেন, সেটিও আয়কর রিটার্নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ঈদ উপলক্ষে পোশাক কেনা, আত্মীয়স্বজনকে উপহার দেওয়া, কোরবানির পশু কেনা, ভ্রমণ, দাওয়াত, ঘর সাজানো কিংবা অন্যান্য উৎসব ব্যয়—সবকিছুই জীবনযাত্রার খরচের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়। আয়কর রিটার্নের সঙ্গে জমা দেওয়া আইটি-১০বি ফরমে জীবনযাত্রার ব্যয়ের বিস্তারিত তথ্য দিতে হয়। সেখানে “উৎসব ও অন্যান্য বিশেষ ব্যয়” নামে একটি আলাদা অংশ রয়েছে। ওই অংশে ঈদকেন্দ্রিক ব্যয়ের তথ্য উল্লেখ করতে হয়। কর কর্মকর্তারা মূলত দেখতে চান—একজন করদাতার ঘোষিত আয়ের সঙ্গে তাঁর জীবনযাত্রার ধরন ও ব্যয়ের মিল আছে কি না। যদি দেখা যায়, আয় তুলনামূলক কম দেখানো হয়েছে কিন্তু ব্যয় অনেক বেশি, তাহলে কর বিভাগ বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান করতে পারে।
এনবিআর কেন জীবনযাত্রার তথ্য জানতে চায়
আয়কর কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে কর ব্যবস্থায় শুধু আয় নয়, একজন মানুষের আর্থিক জীবনধারাও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। একজন ব্যক্তি কত আয় করেন, কোথায় থাকেন, কীভাবে জীবনযাপন করেন, কী পরিমাণ খরচ করেন—এসব তথ্য কর বিশ্লেষণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। এনবিআরের দৃষ্টিতে একজন করদাতার জীবনযাত্রা তাঁর আয়ের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কেউ যদি রিটার্নে সীমিত আয় দেখান কিন্তু ঈদে বড় অঙ্কের কেনাকাটা করেন, দামি গাড়ি ব্যবহার করেন বা উচ্চ ব্যয়সম্পন্ন জীবনযাপন করেন, তাহলে কর বিভাগ তাঁর আয়ের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। কর প্রশাসন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ডিজিটাল আর্থিক লেনদেন বাড়ার ফলে এখন আয়-ব্যয়ের তথ্য যাচাই আগের চেয়ে অনেক সহজ হয়েছে। ব্যাংক হিসাব, ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার, সম্পদ ক্রয়, ভ্রমণ ব্যয়সহ নানা তথ্য কর বিভাগের নজরদারির আওতায় আসছে।
কোন বছরের বোনাস কখন দেখাবেন
কর বিশেষজ্ঞদের মতে, যে অর্থবছরে বোনাস পাওয়া হবে, পরবর্তী রিটার্নে সেটি দেখাতে হবে। অর্থাৎ ২০২৬ সালের ঈদে কেউ যে বোনাস পেলেন, সেটি ২০২৬-২৭ করবর্ষের রিটার্নে আয় হিসেবে যুক্ত হবে। একইভাবে ওই ঈদে করা ব্যয়ও জীবনযাত্রার খরচের অংশ হিসেবে দেখাতে হবে। অনেকে ভুল করে মনে করেন, ছোটখাটো উৎসব ব্যয় দেখানোর প্রয়োজন নেই। কিন্তু কর কর্মকর্তারা বলছেন, বাস্তবসম্মত ও গ্রহণযোগ্য রিটার্ন দাখিলের জন্য আয় ও ব্যয়ের সামঞ্জস্যপূর্ণ তথ্য দেওয়া জরুরি।
বাড়ছে টিআইএনধারী, বাড়ছে নজরদারিও
বর্তমানে দেশে প্রায় ১ কোটি ২৮ লাখ কর শনাক্তকরণ নম্বরধারী (টিআইএন) রয়েছেন। তবে প্রতিবছর নিয়মিত রিটার্ন জমা দেন প্রায় ৪০ থেকে ৪২ লাখ করদাতা। কর প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকার করজাল বাড়ানোর পাশাপাশি রিটার্নের তথ্য বিশ্লেষণেও গুরুত্ব দিচ্ছে। শুধু টিআইএন নেওয়া নয়, সঠিক তথ্য দিয়ে নিয়মিত রিটার্ন জমা দেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে চায় এনবিআর। তাদের মতে, স্বচ্ছ আয়-ব্যয়ের তথ্য দিলে ভবিষ্যতে করদাতাদের অপ্রয়োজনীয় জটিলতায় পড়তে হবে না। বরং আয় ও ব্যয়ের বাস্তব চিত্র তুলে ধরলে কর ব্যবস্থার ওপর আস্থা বাড়বে এবং করদাতাও নিরাপদ থাকবেন।



