দেশে জ্বালানি সংকট: তীব্রতা বাড়ছে, জীবনযাত্রায় বিপর্যয়
দেশে জ্বালানি সংকট দিন দিন তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠছে। আগে দুই-চার ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তেল পাওয়া যেত, কিন্তু বর্তমানে অনেক চালককে টানা ৩৬ ঘণা লাইনে দাঁড়িয়ে তেল সংগ্রহ করতে হচ্ছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার ঘোষণা দেওয়া হলেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।
কৃষি, মৎস্য ও শিল্পে পরিবহন জটিলতা
প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি তেল না পাওয়ায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রার পাশাপাশি কৃষি, মৎস্য এবং শিল্প খাতের পণ্য পরিবহনে মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারকে জ্বালানি তেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), তরল পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) এবং কয়লা আমদানিতে সর্বোচ্চ মনোযোগ দিতে হবে।
আগামী দুই মাসে গভীর সংকটের আশঙ্কা
পরিস্থিতি দ্রুত না বদলালে আগামী দুই মাস অর্থাৎ গ্রীষ্মকালে দেশ এক গভীর জ্বালানি সংকটে পড়বে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। বাংলাদেশ প্রায় শতভাগ জ্বালানি তেল আমদানি-নির্ভর হওয়ায় এই সংকট আরও উদ্বেগজনক।
জ্বালানি মজুত ও আমদানি চ্যানেলের সংকট
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশে ওয়েল ট্যাঙ্কারগুলোতে সাধারণত প্রায় ৩০ দিনের জ্বালানি তেল মজুত থাকে। পেট্রোল পাম্প, তেলবাহী জাহাজ এবং রেলওয়ের ওয়াগনে সংরক্ষিত তেল হিসেব করলে মোট মজুত সক্ষমতা প্রায় ৪৫ দিন ধরা হয়। তবে কোনও কারণে আমদানি চ্যানেল বন্ধ হয়ে গেলে দেশকে মারাত্মক সংকটের মুখোমুখি হতে হয়।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি), বাংলাদেশ তেল গ্যাস খনিজ সম্পদ কর্পোরেশন (পেট্রোবাংলা) এবং বেসরকারিভাবে কয়লা আমদানি করা বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলো স্বীকার করেছে যে তারা প্রত্যেকেই বর্তমানে সংকটে রয়েছে।
জ্বালানি তেল ও এলএনজি আমদানির বর্তমান অবস্থা
বিপিসি সম্প্রতি সরকারের কাছে দেওয়া এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, তারা ১৮ হাজার টন ডিজেল এবং ১৫ হাজার টন জেট ফুয়েল আমদানি নিশ্চিত করেছে। এছাড়া ২৫ হাজার টন ফার্নেস অয়েল এবং সমপরিমাণ অকটেন পাওয়ার বিষয়েও নিশ্চিত হওয়া গেছে। এই জ্বালানি এপ্রিল মাসেই দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, ৩০ হাজার টনের একটি ডিজেল চালান এপ্রিলের পরিবর্তে মে মাসে আসবে বলে নির্ধারণ করা হয়েছে। আরও উদ্বেগজনক হলো, মোট ৩৮ হাজার ৫০০ টনের দুটি বড় তেল চালান সরবরাহকারী বাতিল করেছে।
সরকারের জরুরি পদক্ষেপ
গত ৪ এপ্রিল সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে জরুরি জ্বালানি চাহিদা পূরণে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে কাজাখস্তান থেকে ৫ লাখ টন পরিশোধিত ডিজেল এবং সিঙ্গাপুর থেকে দুই কার্গো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, সংকট নিরসনে সরকার রাশিয়া থেকে তেল আমদানি করে তা ভারতের কোনও পরিশোধনাগারে পরিশোধনের বিষয়টি বিবেচনা করছে। তবে এই প্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদি এবং কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।
কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সংকট
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশে অন্তত ৬ হাজার ৮৩০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে মাতারবাড়ির ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি কয়লার অভাবে কম লোডে চালানো হচ্ছে। একইভাবে আরপিসিএল ও নরিনকোর ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি কয়লার অভাবে গত নভেম্বর থেকে বন্ধ রয়েছে।
এলপিজির বর্তমান অবস্থা
বর্তমান পরিস্থিতিতে তুলনামূলকভাবে কিছুটা ভালো অবস্থানে রয়েছে এলপিজি। এলপিজি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, মে মাসে দেশে এলপিজির চাহিদা ১ লাখ ৪০ হাজার থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টন হতে পারে। এর বিপরীতে গত মাসেই দেশে ১ লাখ ৭৭ হাজার টন এলপিজি আমদানি করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেইন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, "যুদ্ধ পরিস্থিতির এই সংকটের মধ্যে সাশ্রয়ের চেয়ে বেশি জরুরি হলো আগামী দুই মাস, যখন বিদ্যুতের চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকবে, সে সময় জ্বালানি নিশ্চিত করা।"
তিনি আরও বলেন, "এপ্রিল ও মে মাসে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো যেন পূর্ণ ক্ষমতায় চালানো যায়, সেজন্য কয়লা আমদানি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি এলপিজি বর্তমানে শুধু রান্নায় নয়, পরিবহন ও শিল্প কারখানাতেও ব্যবহৃত হচ্ছে।"
এলএনজি আমদানির বিষয়ে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান এরফানুল হক জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম কমতে শুরু করেছে। বর্তমানে ৭ মে পর্যন্ত এলএনজি আমদানির বুকিং নিশ্চিত করা হয়েছে।
এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সহ-সভাপতি হুমায়ুন রশিদ বলেন, "বর্তমানে দেশে এলপিজি আমদানিতে কোনও ঘাটতি নেই এবং চলতি মাসেও ঘাটতির আশঙ্কা নেই। তবে সমস্যা হচ্ছে দাম। বিইআরসি গত মাসে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে দাম নির্ধারণ করলেও ব্যবসায়ীরা এখনও লোকসানে রয়েছেন।"



