রাজশাহীতে পেট্রোল পাম্পে লম্বা লাইন, মোটরসাইকেল রাখতে নৈশপ্রহরীকে ৫০ টাকা
রাজশাহীতে পেট্রোল পাম্পে লম্বা লাইন, মোটরসাইকেল রাখতে টাকা

রাজশাহীতে পেট্রোল পাম্পে তেল সংগ্রহের দীর্ঘ লাইন, মোটরসাইকেল রাখতে নৈশপ্রহরীকে ৫০ টাকা

রাজশাহী নগরীর বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে তেল সংগ্রহের জন্য আগের রাত থেকেই দেখা মিলছে লম্বা লাইনের। যে পাম্পে তেল দেওয়া হচ্ছে, সেখানেই চোখে পড়ছে মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি। অনেকে সন্ধ্যার পর থেকেই নিজের মোটরসাইকেল নিয়ে এসে রাখছেন, আর এ জন্য নিরাপত্তা প্রহরীকে দিতে হচ্ছে ৫০ টাকা। একেকটি মোটরসাইকেল ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে লাইনে অপেক্ষা করছে।

নৈশপ্রহরীর তত্ত্বাবধানে মোটরসাইকেলের সারি

শুক্রবার রাতে নগরীর সাগরপাড়ায় অবস্থিত আফরিন ফিলিং স্টেশনের সামনে দেখা গেছে, দীর্ঘ সারিতে মোটরসাইকেল রাখা হয়েছে। অনেকেই রাতে ৫০ টাকার বিনিময়ে গাড়ি লাইনে রেখে সকালে এসে আবার দাঁড়াচ্ছেন। পাঁচজনের একটি দল এই লাইনের সমন্বয় করছেন, যাদের একজন ঈসা নামে পরিচিত। তিনি খাতায় মোটরসাইকেলের মালিকের নাম ও ফোন নম্বর লিখে রাখছেন, বিনিময়ে নিচ্ছেন ৫০ টাকা। তবে, এর জন্য কোনও টোকেন দেওয়া হচ্ছে না। রাতে টাকা ছাড়া কাউকে এই লাইনে দাঁড়াতে দেওয়া হচ্ছে না।

ঈসার দাবি, মোটরসাইকেলের তালা দিয়ে তার হাতে ৫০ টাকা দেন চালকেরা, যাতে কারও মোটরসাইকেলের কোনও ক্ষতি না হয়। তাই সারা রাত তারা পাহারায় থাকেন এবং এমনভাবে ছড়িয়ে থাকেন যে কেউ এখান থেকে কোনও মোটরসাইকেল বের করে নিতে পারে না। তিনি গ্রাহকদের সকাল ৭টার মধ্যে মোটরসাইকেলের কাছে এসে লাইনে দাঁড়াতে বলে দেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পাম্পের সামনে অস্থায়ী ঘের ও বর্ধিত লাইন

পাম্পটির সামনে বাঁশ দিয়ে তৈরি করা অস্থায়ী ঘেরের ভেতরে সারি করে মোটরসাইকেল রাখা হয়েছে। কিছু মোটরসাইকেল কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে, কিছু খোলা। বিভিন্ন অংশে দড়ি দিয়ে বেধে রাখা হয়েছে মোটরসাইকেলগুলো, প্রতিটি অংশ আলাদা ব্যক্তির তত্ত্বাবধানে আছে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লাইনের দৈর্ঘ্যও বাড়তে থাকে, যা সাগরপাড়া বিদ্যুৎ অফিস পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থী রেজওয়ান আহমেদ জানান, শুক্রবার রাত ৯টায় মোটরসাইকেল রেখে যান তিনি। সকালে এসে দেখেন, ১২ ঘণ্টায় তার মোটরসাইকেল মাত্র দুই হাত এগিয়েছে।

তেলের সংকটে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ

এদিকে, জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা সাধারণ মানুষ তেল না পেয়ে খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে চড়া দামে কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। এক লিটার তেল ২৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। জেলা প্রশাসন আগে জোড়-বিজোড় নম্বর অনুযায়ী তেল দেওয়ার নিয়ম চালু করলেও তা মানা হচ্ছে না। উল্টো লাইনে অপেক্ষমাণদের পাশ কাটিয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা অন্য দিক দিয়ে এসে তেল নিয়ে যাচ্ছেন, এমন অভিযোগও আছে।

পদ্মা নদীর ওপার থেকে আসা মোটরসাইকেলের কয়েকজন চালক জানান, নৌকায় মোটরসাইকেল পারাপারে প্রায় ৬০০ টাকা খরচ হয়। তাই অনেকে মোটরসাইকেলের ট্যাংক খুলে নিয়ে এসেছেন তেল নিতে। তবে, পাম্প কর্তৃপক্ষ তাদের তেল দিচ্ছে না।

পাম্প কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের ভূমিকা

আফরিন ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপক সোলাইমান কবির বলেন, ‘লাইনে মোটরসাইকেল রাখতে টাকা নেওয়ার বিষয়টি প্রশাসনকে জানানো হয়েছে। কিন্তু, কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। আগে জোড়-বিজোড় নম্বর অনুযায়ী তেল দেওয়ার নিয়ম ছিল, এখন তা কার্যকর নেই। সম্প্রতি একটি অ্যাপস চালুর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যেখানে গাড়ির নম্বর নিবন্ধন করে তেল দিতে হবে এবং ৭২ ঘণ্টার মধ্যে একই গাড়ি আর তেল নিতে পারবে না। তবে, অন্য পাম্পগুলোতে এই ব্যবস্থা কার্যকর না হওয়ায় আমরা বিড়ম্বনায় পড়ছি।’

আফরিন ফিলিং স্টেশনের তদারক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল রাজশাহী গণপূর্ত বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী আজমল হুদাকে। তিনি বলেন, অফিসে তিনি ছাড়া তার সেকশনে আর দ্বিতীয় কোনো লোক নেই। এ জন্য তিনি পাম্পে যাননি। পাম্পে কী হচ্ছে, তা জানেন না। বিষয়টি তিনি কর্তৃপক্ষকে ইতোমধ্যে জানিয়েছেন।

অন্যান্য এলাকায় একই অবস্থা

পবা উপজেলার নওহাটার রুচিতা ফিলিং স্টেশনেও দেখা গেছে, পাম্পের সীমানা প্রাচীরে রয়েছে শতাধিক মোটরসাইকেল। পবা উপজেলার পিল্লাপাড়ার জাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আমি তেল নেওয়ার জন্য দুপুরে সিরিয়াল দিয়েছি। ফিলিং স্টেশনের ভেতরের প্রতি মোটরসাইকেলের জন্য নৈশপ্রহরীকে ৫০ টাকা করে দিতে হয়। আর যারা মোটরসাইকেল রাখেন, তারা তেল নিয়ে বাইরে দ্বিগুণ দামে বিক্রি করেন।’

দেলোয়ার হোসেন ও মাহবুব হোসেন বলেন, ‘একটি চক্রের সদস্যরা প্রতিদিন অন্তত দু’টি করে ফিলিং স্টেশন থেকে বিশেষ কৌশলে মোটরসাইকেলের ট্যাংকি ভর্তি করে নিচ্ছেন। আমরা গত এক মাসে তিনবার তাদের কাছ থেকে ২৭০ টাকা লিটার দামে অকটেন কিনতে বাধ্য হয়েছি।’

সিন্ডিকেটের অভিনব কৌশল

রাজশাহী জেলা এবং মহানগরীতে রয়েছে ৪৪টি ফিলিং স্টেশন। আর এসব ফিলিং স্টেশন বা পাম্প থেকে তেল সংগ্রহে সিন্ডিকেটের সদস্যরা নিয়েছেন অভিনব কৌশল। এর অংশ হিসাবে যেসব পাম্পে তেল দেওয়া হবে, তার আগের দিন দুপুর থেকে বিকালের মধ্যেই পাম্প সীমানার মধ্যে রেখে আসছেন দেড় থেকে দুই শতাধিক মোটরসাইকেল। এক্ষেত্রে তাদের সহযোগিতা করছেন পাম্পের নৈশপ্রহরীরা। এছাড়া রাজশাহীর ৯ উপজেলার পাম্পগুলোতেও একই অবস্থা বিরাজ করছে।

পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন রাজশাহী জেলা শাখার সভাপতি মনিমুল হক বলেন, “আমি আমার পাম্পের ভেতরে কাউকে মোটরসাইকেল রাখতে দেয় না। অভিযোগ উঠেছিল। তবে, পাম্পের মালিকরা এতে জড়িত নয়। ইতোমধ্যে এটি বন্ধ করা হয়েছে। এ ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারির প্রয়োজন। দু-একটি পাম্পে দুর্বল ম্যানেজমেন্টের কারণে কর্মচারী বা নৈশপ্রহরীরা সুবিধা নিতে পারেন। এ সম্পর্কে আমরা খোঁজ নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেব।’