দেশের অধিকাংশ ফিলিং স্টেশন বন্ধ, জ্বালানি তেলের সংকটে বিপর্যস্ত যানবাহন ও কৃষি
জ্বালানি তেল সংকটে দেশের ফিলিং স্টেশন বন্ধ, যানবাহন ও কৃষি বিপর্যস্ত

দেশব্যাপী জ্বালানি তেল সংকট: ফিলিং স্টেশন বন্ধ, যানবাহন ও কৃষি বিপর্যস্ত

জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে দেশের প্রায় সবকটি জেলার ফিলিং স্টেশন দিনের বেশিরভাগ সময় বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন মালিকরা। এই সংকটের কারণে যানবাহন চলাচল থেকে শুরু করে কৃষি কাজ পর্যন্ত ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিভিন্ন বিভাগের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চট্টগ্রাম, বরিশাল, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, খুলনা, রংপুর ও সিলেটে তেলের ঘাটতি দেখা দিয়েছে, যা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে।

চট্টগ্রামে অর্ধেকের বেশি পাম্প বন্ধ

চট্টগ্রাম বিভাগের ৩৮৩টি ফিলিং স্টেশনের মধ্যে অর্ধেকের বেশি দিনের বেশিরভাগ সময় বন্ধ থাকছে। নগরের পাঁচলাইশ থানার হাটহাজারী রোডের হামজারবাগ এলাকায় অবস্থিত এম আই বি সিএনজি অ্যান্ড ফিলিং স্টেশনে তেল দেওয়া হচ্ছে না বলে জানা গেছে। কর্মচারীরা জানিয়েছেন, রবিবার থেকে বুধবার পর্যন্ত অকটেন-ডিজেল বিক্রি করা হয়নি। টাইগারপাস এলাকার এজেন্সিজ লিমিটেড ফিলিং স্টেশনেও অকটেন নেই বলে মেশিনের ওপর লিখে রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, বিভাগে পাম্প আছে ৩৮৩টি, কিন্তু অর্ধেকের বেশি সময় বন্ধ থাকছে। পাম্প মালিকরা দাবি করছেন, রেশনিংয়ের মাধ্যমে সীমিত পরিমাণ তেল সরবরাহ করায় এই সংকট তৈরি হয়েছে।

বরিশালে ডিজেল সংকটে জেলেদের মাছ শিকার বন্ধ

বরিশাল বিভাগের ছয় জেলায় মোট ৫৭টি পেট্রোল পাম্প রয়েছে, যার বেশিরভাগ সময় তেল থাকে না। ডিজেল সংকটের কারণে সাগরে বা নদীতে মাছ শিকারে যেতে পারছেন না জেলেরা। পোর্ট রোডের আড়তদার জহির শিকদার বলেন, এক ব্যারেল ডিজেলের সরকারি মূল্য ২১ হাজার টাকা হলেও এখন তা ২৭ থেকে ২৮ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে, এবং ঠিকমতো পাওয়াও যাচ্ছে না। বরিশাল পেট্রোল পাম্প ও ট্যাংকলরি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের শওকত আকবর জানান, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১২ ঘণ্টার বেশি সময় পাম্পে তেল থাকে না, যা ক্রেতা ও মালিকদের মধ্যে দুর্ব্যবহারের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রাজশাহীতে তেলের জন্য দীর্ঘ লাইন, কৃষকরা সেচ দিতে পারছেন না

রাজশাহী জেলা ও মহানগরে নিবন্ধিত ৪৬টি ফিলিং স্টেশনের মধ্যে প্রতিদিন মাত্র ৮ থেকে ১০টিতে তেল বিক্রি হচ্ছে। বাকিগুলো বন্ধ থাকায় সচল পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। তেলের সংকটে কৃষকরা জমিতে সেচ দিতে পারছেন না, অনেকেই শ্যালো ইঞ্জিন নিয়ে ফিলিং স্টেশনে আসছেন। রাজশাহী পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির সভাপতি মমিনুল হক বলেন, চাহিদা অনুযায়ী তেল পাওয়া যাচ্ছে না, তাই গ্রাহকদের দিতে পারছেন না। জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, ফুয়েল কার্ড চালু করে নির্দিষ্ট পরিমাণ তেল দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

ময়মনসিংহে দিনের অধিকাংশ সময় পাম্প বন্ধ

ময়মনসিংহ বিভাগের চার জেলায় ১১৫টি ফিলিং স্টেশন রয়েছে, যার মধ্যে সাতটি স্থায়ীভাবে বন্ধ। বাকিগুলো দিনের অধিকাংশ সময় তেল সংকটের কারণে বন্ধ থাকছে। শেরপুর জেলায় ১১টি ফিলিং স্টেশনের মধ্যে ১০টি সচল আছে, কিন্তু দুই-তিন দিন পরপর তেল পাওয়া যাচ্ছে। নেত্রকোনায় ১৮টি পাম্প সচল থাকলেও ডিপো থেকে সময়মতো তেল না পাওয়ায় মাঝেমধ্যে বন্ধ রাখতে হয়। জামালপুর জেলায় ২০টি ফিলিং স্টেশনের মধ্যে তিনটি স্থায়ীভাবে বন্ধ। ময়মনসিংহ জেলা পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জয়নাল আবেদীন বলেন, গত ১৫-২০ দিন ধরে ডিপো থেকে অর্ধেক পরিমাণ তেল পাওয়া যাচ্ছে, যা চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে।

খুলনায় দুই-তিন দিন পর পর তেল পাওয়া যাচ্ছে

খুলনা বিভাগের ১০ জেলায় ও ফরিদপুরে ২৬০টি ফিলিং স্টেশন সচল আছে, কিন্তু দুই-তিন দিন পর পর জ্বালানি তেল পাচ্ছে। ফলে যেদিন তেল পায় না, সেদিন বন্ধ রাখতে হয়। খুলনা বিভাগীয় ট্যাংকলরি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. সুলতান মাহমুদ পিন্টু বলেন, সংকট নিরসনে প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি উপস্থাপন করা হয়েছে, কিন্তু এখনও সমাধান হয়নি। খুলনা ট্যাংকলরি মালিক সমিতির সদস্য মুরাদ হোসেন মন্তব্য করেন, মানুষের অস্থিরতা ও মজুত করার মানসিকতা তেলের চেয়েও বেশি সংকট তৈরি করছে।

রংপুরে চাহিদার অর্ধেক তেল সরবরাহ

রংপুর বিভাগের আট জেলায় ৩৫০টি ফিলিং স্টেশন আছে, যার মধ্যে ২০টি বাদে বাকিগুলো সচল। তবে ডিজেলের দৈনিক চাহিদা ১০ লাখ লিটার হলেও সরবরাহ করা হচ্ছে সাড়ে আট লাখ থেকে নয় লাখ লিটার। পেট্রোলের চাহিদা পাঁচ লাখ ১০ হাজার লিটার, কিন্তু সরবরাহ হচ্ছে দুই থেকে সোয়া দুই লাখ লিটার। অকটেনের চাহিদা দুই লাখ ৭৫ হাজার লিটার, সরবরাহ হচ্ছে ৭৫ থেকে ৮০ হাজার লিটার। রংপুর বিভাগীয় কমিশনার মো. শহিদুল ইসলাম দাবি করেন, জ্বালানি তেলের সংকট নেই, কিন্তু ফিলিং স্টেশন ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের আফজাল হোসেন বলেন, চাহিদার অর্ধেক তেল বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে, যা গ্রাহকদের চাহিদা পূরণ করতে পারছে না।

সিলেটে লজিস্টিক সাপোর্টের সংকট

সিলেট বিভাগে ১১৮টি পেট্রোল পাম্প রয়েছে, যেখানে নগরীতে তেমন সংকট না থাকলেও উপজেলা পর্যায়ের ফিলিং স্টেশনগুলো লজিস্টিক সাপোর্টের সংকটে ভুগছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়ামের ডিলার অ্যাসোসিয়েশনের সিলেট বিভাগীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রিয়াশাদ আজিম হক আদনান বলেন, উপজেলা পর্যায়ে তেল পরিবহনের খরচ জোগান দিতে না পারায় মালিকরা সমস্যায় রয়েছেন। কোম্পানীগঞ্জের পাড়ুয়া ফিলিং স্টেশনের স্বত্বাধিকারী আলকাছ আলী জানান, প্রশাসনের পক্ষ থেকে ড্রামে তেল বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়েছে, তবে কৃষিকাজের জন্য সীমিত অনুমতি আছে।

সর্বোপরি, এই জ্বালানি তেল সংকট দেশের অর্থনীতি ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে। রেশনিং পদ্ধতি প্রত্যাহার ও পর্যাপ্ত তেল সরবরাহ নিশ্চিত না করা পর্যন্ত এই সংকট কাটানো কঠিন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।