পেট্রল সংকটের মূলে আতঙ্কিত কেনা ও মজুতকরণ
বাংলাদেশের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে 'পেট্রল নেই' নোটিশ দেখা যাচ্ছে, যা গত এক মাসে অনেকের অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়েছে। বিশ্বজুড়ে ইরান যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি সংকট তৈরি হলেও, বাংলাদেশে পেট্রলের চাহিদা দেশীয় উৎপাদনেই মেটে। তাহলে সংকটের কারণ কী? এই প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠছে। সংকট শুধু পেট্রলে নয়, ডিজেল ও অকটেনেও বিদ্যমান।
পেট্রল কী এবং এর ব্যবহার
পেট্রল এক ধরনের তরল জ্বালানি, যা অপরিশোধিত জ্বালানি ও গ্যাসক্ষেত্রের কনডেনসেট পরিশোধন করে উৎপাদন করা হয়। মূলত মোটরসাইকেলের জ্বালানি হিসেবে পেট্রল ব্যবহৃত হয়। এছাড়া কিছু পুরোনো গাড়ি, অটোরিকশা, টেম্পো ও লেগুনা পেট্রলে চলে। পেট্রলচালিত যন্ত্র যেমন ঘাস কাটার মেশিনও এর ব্যবহারের অন্তর্ভুক্ত।
অকটেনের সঙ্গে পার্থক্য
পেট্রল ও অকটেনের মধ্যে রূপগত কোনো পার্থক্য নেই, পার্থক্যটি গুণগত। উচ্চ মানের পেট্রলকেই অকটেন বলা হয়। অকটেন রেটিং ৯২ থেকে ৯৫ হলে তা অকটেন, আর ৮০ থেকে ৮৭ এর মধ্যে হলে পেট্রল হিসেবে পরিচিত।
দেশে পেট্রলের চাহিদা ও সরবরাহ
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্র অনুযায়ী, গত অর্থবছরে পেট্রল বিক্রি হয়েছে ৪ লাখ ৬২ হাজার টন এবং অকটেন বিক্রি হয়েছে ৪ লাখ ১৫ হাজার টন। জ্বালানি তেলের মধ্যে ডিজেলের চাহিদা সর্বোচ্চ, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যা ৪৩ লাখ ৫০ হাজার টন।
দেশে পেট্রলের চাহিদার পুরোটাই দেশীয় উৎপাদন থেকে আসে। গত অর্থবছরে, ১৬ শতাংশ পেট্রল সরবরাহ করেছে সরকারি শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল), বাকি ৮৪ শতাংশ বেসরকারি শোধনাগারগুলো থেকে আসে। তবে ইআরএল প্রতিবছর ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আমদানি করে, যা বর্তমানে যুদ্ধের কারণে বন্ধ। এর প্রভাব পেট্রল উৎপাদনে পড়ছে।
মজুত ও সরবরাহ পরিস্থিতি
বিপিসি সূত্র জানিয়েছে, ৩ এপ্রিল পর্যন্ত পেট্রলের মজুত ছিল ১২ হাজার ৭৫৬ টন, যা ৯ দিন চলার মতো। এপ্রিলে পেট্রলের চাহিদা ধরা হয়েছে ৪৪ হাজার টন, যার মধ্যে দেশীয় উৎপাদন থেকে ৩৫ হাজার টন পাওয়া যাবে। কিছু ঘাটতি থাকলেও, অকটেন রূপান্তর করে পেট্রলের চাহিদা পূরণের পরিকল্পনা আছে।
সংকটের কারণ বিশ্লেষণ
পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও পেট্রল সংকটের মূল কারণ 'প্যানিক বায়িং' বা আতঙ্কিত হয়ে কেনা। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ইরানে হামলার পর বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজার অস্থির হয়ে ওঠে, যা বাংলাদেশে আতঙ্কিত কেনার হিড়িক তৈরি করে। মার্চে সরকার ফিলিং স্টেশনে রেশনিংয়ের সিদ্ধান্ত নিলেও, এখনো লাইন কমছে না।
বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, গত ১ থেকে ৪ মার্চ পর্যন্ত পেট্রল বিক্রি হয়েছে ৯ হাজার ৩৮০ টন, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৫ শতাংশ বেশি। তবে মার্চে পেট্রল সরবরাহ গত বছরের তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ কমেছে। পাশাপাশি, বিভিন্ন স্থানে মজুত করা পেট্রল উদ্ধারের ঘটনাও সংকটকে বাড়িয়েছে।
বাংলাদেশ পেট্রলপাম্প মালিক সমিতির সদস্যসচিব মীর আহসান উদ্দীন বলেন, 'পর্যাপ্ত জ্বালানি তেল সরবরাহ করছে সরকার, কিন্তু পেট্রলপাম্পে আনার পর মানুষের অতিরিক্ত চাহিদার চাপ সামলানো যাচ্ছে না।'
সর্বোপরি, পেট্রল সংকট মোকাবিলায় সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বয় এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি হয়ে উঠেছে।



