অকটেন সংকটে ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইন: জ্বালানি তেলের বর্তমান অবস্থা বিশ্লেষণ
ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ও চাহিদা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। ঢাকার আসাদগেটের মতো ফিলিং স্টেশনগুলোয় অকটেন নিতে মোটরসাইকেলচালকদের দীর্ঘ লাইনের ছবি প্রতিদিন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। অনেক স্টেশনে ‘অকটেন নেই’, ‘পেট্রল নেই’—এমন নোটিশ ঝুলতে দেখা যাচ্ছে, যা সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে গাড়ির মালিকদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
অকটেন ও পেট্রলের মধ্যে পার্থক্য
নাম আলাদা হলেও পেট্রল ও অকটেন মূলত একই জ্বালানি তেলের অংশ। উচ্চমানের পেট্রলকে অকটেন বলা হয়, যার রেটিং বেশি থাকে এবং এটি ইঞ্জিনের চাপ সহ্য করার ক্ষমতা বাড়ায়। মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কার ও মাইক্রোবাসে সাধারণত অকটেন ও পেট্রল ব্যবহৃত হয়। অনেক গাড়ির মালিক উচ্চ রেটিংয়ের কারণে অকটেন ব্যবহার করেন, বিশেষ করে মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে এটি বেশি দেখা যায়।
দেশে অকটেনের চাহিদা ও সরবরাহ
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে অকটেন বিক্রি হয়েছে ৪ লাখ ১৫ হাজার টন, যা দৈনিক গড়ে ১ হাজার ১৩৭ টন। গত বছরের মার্চে দৈনিক বিক্রি ছিল ১ হাজার ১৯৩ টন, আর এবারের মার্চে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২২২ টন। অর্থাৎ, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ শুরুর পর দৈনিক বিক্রি গড়ে ২৯ টন বৃদ্ধি পেয়েছে।
দেশে বছরে সরবরাহ করা মোট জ্বালানি তেলের ৬ শতাংশ অকটেন, যার অর্ধেক দেশেই উৎপাদিত হয়। বিপিসির তথ্য মতে, গত অর্থবছরে চাহিদার ৫০ শতাংশ অকটেন দেশীয় উৎপাদন থেকে এসেছে, বাকি ৫০ শতাংশ আমদানি করা হয়েছে। দেশে অকটেন উৎপাদিত হয় গ্যাসক্ষেত্রের উপজাত ও আমদানি করা কনডেনসেট শোধন করে। চারটি বেসরকারি শোধনাগার—সুপার পেট্রোকেমিক্যাল লিমিটেড, পারটেক্স পেট্রো লিমিটেড, অ্যাকোয়া রিফাইনারি লিমিটেড ও পেট্রোম্যাক্স রিফাইনারি লিমিটেড—থেকে বিপিসি নিয়মিত অকটেন কেনে।
মজুত ও ভবিষ্যৎ সরবরাহ
জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুসারে, ১ এপ্রিল পর্যন্ত অকটেনের মজুত আছে ৯ হাজার ২১ টন, যা দৈনিক বিক্রির হিসাবে ৭ দিন চলার মতো। ৬ এপ্রিল সিঙ্গাপুর থেকে ২৫ হাজার টন অকটেন নিয়ে একটি জাহাজ আসার কথা রয়েছে, এবং মাসের তৃতীয় সপ্তাহে আরও ২৫ হাজার টন আসবে। এপ্রিল মাসে বেসরকারি শোধনাগার থেকে ৩০ হাজার টন অকটেন পাওয়া যাবে, ফলে মোট ৭০ হাজার টন সরবরাহ হবে, যেখানে চাহিদা ৩৭ হাজার টন। তাই আপাতত অকটেনের ঘাটতি হওয়ার শঙ্কা নেই বলে বিপিসি জানিয়েছে।
ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইনের কারণ
বিপিসির হিসাবে সংকট না থাকলেও ফিলিং স্টেশনগুলোয় দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, যুদ্ধ শুরুর পর জ্বালানি নিয়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় ‘প্যানিক বায়িং’ বা ভীতি থেকে বাড়তি কেনা শুরু হয়েছে। কিছু গোষ্ঠী এটিকে সুযোগ হিসেবে নিয়ে মজুত করছে। গত ৩০ মার্চ পর্যন্ত প্রশাসন ২৮ হাজার ৯৩৮ লিটার অকটেন উদ্ধার করেছে। আতঙ্কজনিত কেনাকাটা এখনো থামেনি, ফলে ফিলিং স্টেশনগুলো অতিরিক্ত চাহিদা সামাল দিতে পারছে না। এপ্রিলে সরবরাহ বেড়ে গেলে ভিড় কমতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়া, দাম বাড়ার শঙ্কা থাকলেও সরকার দাম বাড়ায়নি, যা মজুত করার প্রবণতা কমাতে সাহায্য করতে পারে।



