মার্চে জ্বালানি সংকট নেই, তবে দীর্ঘ যুদ্ধে আমদানি ঝুঁকি
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের মতে, মার্চ মাসে জ্বালানি তেলের সরবরাহ সংকট দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা নেই। তবে চলমান যুদ্ধ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে আমদানি প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে, জাহাজ আসার সময় পিছিয়ে যেতে পারে এবং কিছু সরবরাহকারী অপারগতা প্রকাশ করতে পারে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার চুক্তির বাইরে নতুন উৎস থেকে জ্বালানি তেল আমদানির পরিকল্পনা করছে। ভারত থেকেও বাড়তি আমদানির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা ইতিবাচক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সরবরাহ নিশ্চিত করতে জরুরি পদক্ষেপ
জ্বালানি বিভাগের সূত্র অনুযায়ী, জুন মাস পর্যন্ত পরিশোধিত জ্বালানি কেনার চুক্তি করা আছে। কিন্তু অপরিশোধিত জ্বালানি আমদানি ব্যাহত হওয়ায় সরবরাহকারীরা তেল পরিশোধন করতে সংকটে পড়তে পারেন। এর ফলে আগামী মে মাসে তারা চুক্তি অনুসারে তেল সরবরাহে ব্যর্থ হতে পারেন। এই ঝুঁকি এড়াতে সরকারি পর্যায়ে জিটুজি বা উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে, অথবা সরাসরি প্রক্রিয়ায় তেল কেনার চিন্তা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জ্বালানি তেল আমদানির দায়িত্বে রয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, প্রতি মাসে গড়ে ১৫টি জাহাজ জ্বালানি তেল নিয়ে আসে, কিন্তু যুদ্ধ শুরুর পর থেকে নির্ধারিত সময়ে তেল আসছে না। মার্চ মাসে ১৬টি জাহাজ আসার কথা, যার মধ্যে ৬টি ইতিমধ্যে এসেছে এবং ১৩ মার্চের মধ্যে আরও তিনটি আসার কথা রয়েছে। ৩১ মার্চের মধ্যে বাকি ৭টি জাহাজ আসার কথা নিশ্চিত করেছে সরবরাহকারীরা, তবে সময়সূচি এখনও নিশ্চিত হয়নি।
হরমুজ প্রণালি ও বিকল্প উৎসের সন্ধান
বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের ২০ শতাংশ ইরানের হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন হয়, যা বাংলাদেশের বেশির ভাগ জাহাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধ শুরুর দুই দিন পর এই প্রণালি বন্ধ করে দেয় ইরান, এবং এখন ঝুঁকির কারণে দিনে কয়েকটির বেশি জাহাজ পার হচ্ছে না। বাংলাদেশ সরকার ইরানকে অনুরোধ করেছে যাতে বাংলাদেশের পণ্যবাহী জাহাজ নিরাপদে পার হতে পারে, এবং ইরান সরকার আশ্বস্ত করেছে যে বাধা দেওয়া হবে না। এই প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন সম্ভব হলে সরবরাহ বাড়তে পারে। এছাড়া, আতঙ্কে জ্বালানি তেল বিক্রি দ্বিগুণ হওয়ায় গত শনিবার থেকে ফিলিং স্টেশনে ২৫ শতাংশ করে সরবরাহ কমানো হয়েছে, এবং সরকার নির্ধারিত সীমা মেনে তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে, এবং রাইড শেয়ারিং মোটরসাইকেলে সর্বোচ্চ ৫ লিটার তেল সরবরাহের সীমা করা হয়েছে। গাড়িতেও তেল সরবরাহের সীমা বাড়ানো হতে পারে, এবং কূটনৈতিকদের গাড়ির জন্য সীমা তুলে দেওয়া হতে পারে।
ভারত থেকে বাড়তি আমদানির প্রস্তাব
বিপিসি সূত্র বলছে, ভারতের নুমালিগড় রিফাইনারি লিমিটেডের সঙ্গে ২০১৭ সালের চুক্তি অনুসারে, এ বছর ১ লাখ ২০ হাজার টন ডিজেল আসার কথা, যার বাইরে অতিরিক্ত ৬০ হাজার টন দেওয়ার প্রস্তাব আছে। জানুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে নিশ্চিত ৬০ হাজার ও অতিরিক্ত ৩০ হাজার টন আসার কথা। প্রতিবার ৫ হাজার টন করে ডিজেল পাইপলাইনে সরবরাহ করা হয়, কারণ মজুতাগারের সক্ষমতা সীমিত। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেল পরিবহনের খরচ বেড়ে গেছে এবং জাহাজ পাওয়া যাচ্ছে না, কিন্তু ভারত থেকে পাইপলাইনে তেল আনতে প্রতি ব্যারেলের পরিবহন খরচ সাড়ে ৫ ডলার, যা তুলনামূলক কম। এছাড়া, ইন্ডিয়ার অয়েল কোম্পানি লিমিটেড (আইওসিএল) থেকে সমুদ্রপথে ডিজেল, ফার্নেস, অকটেন ও জেট ফুয়েল আমদানি করা হচ্ছে। বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষিতে, বিপিসি জ্বালানি বিভাগের কাছে ভারত থেকে তেল আমদানি বাড়ানোর প্রস্তাব পাঠিয়েছে, যাতে পাইপলাইনে মার্চে ২০ হাজার ও এপ্রিলে ২৫ হাজার টন ডিজেল সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে।
ডিজেল নিয়ে প্রধান চিন্তা ও বিকল্প উৎস
পেট্রল শতভাগ দেশে উৎপাদন হয় এবং অকটেনের ৫০ শতাংশ দেশে উৎপাদিত হয়, তাই মূল চিন্তা ডিজেল নিয়ে। বিপিসির সরবরাহ করা জ্বালানির ৭০ শতাংশ ডিজেল, যা শিল্প, কৃষি ও পরিবহন খাতে ব্যবহৃত হয়। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্ববাজারে ডিজেলের দাম ৮৮ ডলার ছিল, যা গত রোববার ১৪৬ ডলারে পৌঁছেছে। সরবরাহ যাতে ব্যাহত না হয় এবং কম দামে ডিজেল আমদানি করতে বিকল্প উৎস বিবেচনা করা হচ্ছে। অপরিশোধিত জ্বালানি তেল সৌদি আরব ও আরব আমিরাত থেকে আমদানি করা হয়, এবং ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড তা শোধন করে ডিজেল সরবরাহ করে, কিন্তু যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এই সরবরাহ বন্ধ আছে। বর্তমান মজুত দিয়ে আগামী মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত তেল পরিশোধন সম্ভব হবে। পরিশোধিত তেল সিঙ্গাপুর, চীন, মালয়েশিয়া প্রভৃতি দেশ থেকে আসে, এবং এখন এদের পাশাপাশি নতুন উৎস সন্ধান করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানি এ অ্যান্ড এ এনার্জি অয়েল অ্যান্ড গ্যাস এলএলসি দুই লাখ টন ডিজেল সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে, প্রতি ব্যারেল ৭৬ ডলারে, কিন্তু তাদের সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ আছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক কোম্পানি পেট্রো গ্যাস এলএলপি বাজার দামে ডিজেল সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে, তবে পরিবহন খরচ প্রতি ব্যারেল প্রায় ৪৫ ডলার চেয়েছে, যা বর্তমান চুক্তির চেয়ে বেশি। জ্বালানি বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানান, এই প্রস্তাবগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে, এবং সরবরাহের সক্ষমতা, গুণগত মান ও দাম পর্যালোচনা করে কোম্পানি বাছাই করা হবে। বিশেষ বিবেচনায় দরপত্র ছাড়াও সরাসরি জ্বালানি তেল কেনার অনুমোদন দেওয়া হতে পারে। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জ্বালানিবিষয়ক বিশেষ সহকারী ম তামিম বলেছেন, পরিস্থিতি বিবেচনায় এখন বিকল্প উৎস থেকে আমদানির চেষ্টা করা উচিত, এবং দাম বেশি হলেও দেশের প্রয়োজনে সেরা উৎস খুঁজে বের করতে হবে। ভারত থেকে আমদানি বাড়ানো গেলে খরচ কম হবে, যা সুবিধাজনক হতে পারে।



