বিশ্বে প্রতিদিন ১০২-১০৪ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ব্যবহার, বাংলাদেশের চাহিদা ২.৮ লক্ষ ব্যারেল
বিশ্বে প্রতিদিন ১০২-১০৪ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ব্যবহার

বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় জ্বালানি তেল অর্থনীতি, শিল্প, পরিবহন ও দৈনন্দিন জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রযুক্তির অগ্রগতি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার সত্ত্বেও বৈশ্বিক অর্থনীতি এখনো বহুলাংশে তেলের ওপর নির্ভরশীল। প্রতিদিন বিশ্বে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল ব্যবহৃত হয়, যা আধুনিক সভ্যতার গতিকে সচল রাখে।

বিশ্বে দৈনিক তেল ব্যবহারের পরিমাণ ও খাত

সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০২ থেকে ১০৪ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ব্যবহৃত হয়, যেখানে এক ব্যারেল তেল প্রায় ১৫৯ লিটার। এই বিপুল জ্বালানি বিভিন্ন খাতে ব্যবহৃত হলেও এর বড় অংশ পরিবহন খাতে ব্যয় হয়। তেলের বিভিন্ন প্রকারভেদ রয়েছে এবং প্রতিটির ব্যবহার ক্ষেত্রও ভিন্ন।

এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় ডিজেল-প্রতিদিন প্রায় ২৮ থেকে ৩০ মিলিয়ন ব্যারেল। ট্রাক, বাস, শিল্পকারখানা ও কৃষি খাতে এর ব্যবহার অপরিসীম, ফলে বিশ্ব অর্থনীতির সরবরাহব্যবস্থাকে সচল রাখতে ডিজেলের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর পরই রয়েছে পেট্রোল বা গ্যাসোলিন, যার দৈনিক ব্যবহার প্রায় ২৪ থেকে ২৬ মিলিয়ন ব্যারেল। ব্যক্তিগত যানবাহনের জন্য এটি প্রধান জ্বালানি।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিমান পরিবহনে ব্যবহৃত জেট ফুয়েল বা কেরোসিনের দৈনিক ব্যবহার প্রায় ৭ থেকে ৮ মিলিয়ন ব্যারেল। পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পে ব্যবহৃত ন্যাপথার দৈনিক চাহিদা প্রায় ৬ থেকে ৭ মিলিয়ন ব্যারেল, যা প্লাস্টিক, রাসায়নিক দ্রব্য ও শিল্পপণ্য উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে ফুয়েল অয়েল-যা জাহাজ ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়-তার ব্যবহারও প্রায় ৬-৭ মিলিয়ন ব্যারেল।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এছাড়া এলপিজির দৈনিক চাহিদা প্রায় ৯-১০ মিলিয়ন ব্যারেল, যা রান্না ও গৃহস্থালির কাজে ব্যবহৃত হয় এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এর ব্যবহার ক্রমবর্ধমান। লুব্রিকেন্ট, অ্যাসফাল্টসহ অন্যান্য পেট্রোলিয়াম পণ্যের ব্যবহার মিলিয়ে দৈনিক প্রায় ১০ থেকে ১২ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ব্যবহৃত হয়। সব মিলিয়ে, বিশ্বের মোট তেল ব্যবহারের প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশই পরিবহন খাতে ব্যয় হয়।

তেলের বাজার ও অর্থনীতিতে প্রভাব

নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়লেও তেলের চাহিদা এখনো উচ্চমাত্রায় বিদ্যমান। জ্বালানি তেল এখনো বিশ্ব অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের ওঠানামা সরাসরি অর্থনীতির গতি নির্ধারণ করে। দাম বাড়লে উৎপাদন খরচ ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পায়, যার প্রভাব পড়ে ভোক্তা পর্যায়ে ফলে সৃষ্টি হয় মুদ্রাস্ফীতি। বিপরীতে, দাম কমে গেলে তেল আমদানিনির্ভর দেশগুলো কিছুটা স্বস্তি পায়।

বিশ্বের প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশ

বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল উৎপাদনকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্র-প্রতিদিন প্রায় ১২ থেকে ১৩ মিলিয়ন ব্যারেল। দ্বিতীয় অবস্থানে সৌদি আরব, যার উৎপাদন প্রায় ১০ থেকে ১১ মিলিয়ন ব্যারেল। তৃতীয় বৃহত্তম উৎপাদক রাশিয়া, যার উৎপাদনও প্রায় একই মাত্রার এবং যা ইউরোপ-এশিয়ার বাজারে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। এরপর রয়েছে কানাডা (৪.৫-৫ মিলিয়ন ব্যারেল), চীন (৪-৫ মিলিয়ন), ইরাক (৪-৪.৫ মিলিয়ন), সংযুক্ত আরব আমিরাত (৩-৪ মিলিয়ন), ব্রাজিল (৩-৩.৫ মিলিয়ন), ইরান (প্রায় ৩ মিলিয়ন) এবং কুয়েত (২.৫-৩ মিলিয়ন)। ভেনিজুয়েলার উৎপাদন তুলনামূলক কম এবং ওঠানামাপূর্ণ।

সব মিলিয়ে, বিশ্বের তেল উৎপাদনের বড় অংশই কয়েকটি দেশ-বিশেষত মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আমেরিকা ও রাশিয়ায় কেন্দ্রীভূত। ফলে এসব দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত সরাসরি বৈশ্বিক বাজারে প্রভাব ফেলে।

ওপেকের ভূমিকা ও প্রভাব

তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণে ওপেকের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ব জ্বালানি বাজারে অন্যতম প্রভাবশালী সংগঠন হলো ওপেক (OPEC)। ১৯৬০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠনটি তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর স্বার্থ সংরক্ষণ, উৎপাদন সমন্বয় এবং বাজারে মূল্য স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্যে গঠিত হয়। প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ছিল ইরান, ইরাক, কুয়েত, সৌদি আরব ও ভেনিজুয়েলা। বর্তমানে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে সৌদি আরব, ইরান, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ভেনিজুয়েলা, নাইজেরিয়া, আলজেরিয়া, লিবিয়া, অ্যাঙ্গোলা, কঙ্গো ও ঘানা।

ওপেকের প্রধান ভূমিকা হলো উৎপাদন নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তেলের দাম প্রভাবিত করা। তারা সম্মিলিতভাবে উৎপাদন কোটা নির্ধারণ করে, যাতে বাজারে ভারসাম্য বজায় থাকে। অনেক সময় রাশিয়াসহ অন্যান্য উৎপাদক দেশকে নিয়ে 'ওপেক+' জোট গঠন করে, যা বৈশ্বিক বাজারে আরো বড় প্রভাব ফেলে। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৩০-৪০ শতাংশ তেল সরবরাহ এই জোটের আওতায় আসে।

বাংলাদেশের জ্বালানি তেল পরিস্থিতি

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য জ্বালানি তেলের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। শিল্প, বিদ্যুৎ ও পরিবহন খাতে তেলের ওপর নির্ভরতা থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামা সরাসরি দেশের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশ এখনো জ্বালানি তেলে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। শিল্পায়ন ও নগরায়ণের ফলে চাহিদা বাড়লেও দেশীয় উৎপাদন অত্যন্ত সীমিত-প্রতিদিন মাত্র ৯ থেকে ১০ হাজার ব্যারেল। অন্যদিকে দৈনিক চাহিদা প্রায় ২.৮ লক্ষ ব্যারেল। ফলে মোট চাহিদার প্রায় ৯০-৯৫ শতাংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়।

২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ প্রায় ১.৯২ মিলিয়ন মেট্রিক টন অপরিশোধিত এবং ৪.৪১ মিলিয়ন মেট্রিক টন পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করেছে। প্রধান আমদানিকারক দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ভারত, চীন, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ড। ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে প্রায় ১.৩৮ মিলিয়ন টন পরিশোধিত তেল আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশে আমদানিকৃত প্রধান জ্বালানির মধ্যে রয়েছে ডিজেল, ফার্নেস অয়েল, অপরিশোধিত তেল, পেট্রোল, জেট ফুয়েল ও মেরিন ফুয়েল। এর মধ্যে ডিজেলের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি।

এছাড়া বাংলাদেশ-ভারত ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইনের মাধ্যমে ডিজেল আমদানি একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। আসামের নুমালীগড় রিফাইনারি থেকে দিনাজপুরের পার্বতীপুর পর্যন্ত বিস্তৃত এই পাইপলাইন ২০২৩ সালে চালু হওয়ার পর থেকে নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করছে।

জ্বালানি তেলের রাজনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্ব

জ্বালানি তেল শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এর প্রভাব সরাসরি প্রতিফলিত হয় সরকারের জনপ্রিয়তায়। যখন মানুষ ঘন্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও তেল পায় না, পরিবহন ব্যাহত হয়, দ্রব্যমূল্য বেড়ে যায়-তখন অসন্তোষ বাড়তে থাকে। বিদ্যুৎ-সংকট দেখা দিলে দুর্ভোগ আরো বাড়ে। ফলে এই অসন্তোষ শেষ পর্যন্ত সরকারের প্রতি ক্ষোভে রূপ নেয়। অন্যদিকে, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে পরিবহন সচল থাকে, দ্রব্যমূল্য তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকে এবং মানুষের জীবনযাত্রা সহজ হয়-ফলে সরকারের প্রতি আস্থা বাড়ে।

জ্বালানি তেলের প্রশ্নটি আজ কেবল সরবরাহ ও দামের সমীকরণে সীমাবদ্ধ নেই; এটি ধীরে ধীরে একটি কৌশলগত সক্ষমতার পরীক্ষায় পরিণত হচ্ছে। যে দেশ যত দ্রুত নিজের জ্বালানি নীতিকে বহুমাত্রিক করতে পারছে-অর্থাৎ আমদানির উৎস বৈচিত্র্য, মজুত ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, জ্বালানিদক্ষতা বৃদ্ধি এবং নবায়নযোগ্য শক্তির সঙ্গে সমন্বয় ঘটাতে পারছে-সে দেশ তত বেশি স্থিতিশীলতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের জন্য এখানেই মূল চ্যালেঞ্জ এবং সম্ভাবনা-একই সঙ্গে। কারণ একদিকে বৈশ্বিক বাজারের অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ চাহিদার ক্রমবর্ধমান চাপ-এই দুইয়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে জ্বালানি ব্যবস্থাপনাকে শুধু প্রশাসনিক কার্যক্রম হিসেবে দেখার সুযোগ আর নেই। এটি এখন অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, বৈদেশিক সম্পর্ক, এমনকি জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি ইস্যু।

জ্বালানি দক্ষতা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ভবিষ্যৎ

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক- জ্বালানি দক্ষতা (energy efficiency)। আমরা যতটা জ্বালানি ব্যবহার করছি, তার কতটা অপচয় হচ্ছে-এই প্রশ্নটি প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়। শিল্প, পরিবহন ও নগর ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়াতে পারলে একই পরিমাণ জ্বালানিতে বেশি উৎপাদন ও সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব। অর্থাৎ, নতুন জ্বালানি জোগানের পাশাপাশি বিদ্যমান জ্বালানির বৃদ্ধিদীপ্ত ব্যবহারই হতে পারে একটি নীরব কিন্তু কার্যকর সমাধান।

পাশাপাশি, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারকে কেবল ভবিষ্যতের স্বপ্ন হিসেবে না দেখে বর্তমানের কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি কিংবা বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদনের মতো উদ্যোগগুলো ধীরে ধীরে আমদানি-নির্ভরতার চাপ কমাতে পারে। যদিও এগুলো তাৎক্ষণিকভাবে তেলের বিকল্প নয়, তবে দীর্ঘ মেয়াদে একটি সুরক্ষাবলয় তৈরি করতে সক্ষম।

অতএব, জ্বালানি তেলের সংকটকে কেবল একটি সাময়িক সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আসলে একটি সংকেত যে সংকেত আমাদের বলে দেয়, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বর্তমান মডেলকে নতুনভাবে ভাবার সময় এসেছে। যে রাষ্ট্র এই সংকেতকে বুঝে আগেভাগে প্রস্তুতি নিতে পারবে, তার জন্য সংকটই হয়ে উঠবে নতুন সম্ভাবনার দরজা।

লেখক: ফিকামলি তত্ত্বের জনক, বিশ্ববিদ্যালয় সাবেক শিক্ষক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক