দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বর্তমানে ২৮ হাজার ৪৯৪ মেগাওয়াট। কিন্তু চাহিদা ১৬ হাজার মেগাওয়াট ছাড়ালেই সংকট দেখা দেয়। বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং বেড়ে যায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংকটের মূল কারণ জ্বালানির অভাব। পর্যাপ্ত গ্যাস, কয়লা ও তেল সরবরাহ না থাকায় পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। সংকট দূর করতে জ্বালানির সংস্থান বাড়ানোর বিকল্প নেই। বিশেষজ্ঞরা আমদানি-নির্ভরতা না বাড়িয়ে দেশীয় জ্বালানিতে জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
কোন জ্বালানিতে কত বিদ্যুৎ
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থায় এখনও গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রের আধিপত্য বেশি। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মোট উৎপাদন সক্ষমতার মধ্যে গ্যাস থেকে উৎপাদিত হচ্ছে ১২ হাজার ১৯৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ, যা মোট উৎপাদনের ৪২ দশমিক ৭৯ শতাংশ। দেশে ব্যবহার করা গ্যাসের একটি অংশ আমদানির ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি বিদেশ থেকে আমদানি করা হচ্ছে।
দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ভারতের আদানিসহ মোট আটটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। এসব কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত হচ্ছে ৭ হাজার ৬২৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ, যা মোট উৎপাদনের ২৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ। এর মধ্যে বড়পুকুরিয়া ছাড়া বাকি কেন্দ্রগুলোর বিদ্যুৎ আমদানি করা কয়লা থেকেই উৎপাদন করা হয়।
অপরদিকে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক (এইচএফও) কেন্দ্র থেকে আসছে ৫ হাজার ৬৩৪ মেগাওয়াট বা ১৯ দশমিক ৭৭ শতাংশ বিদ্যুৎ। ডিজেলভিত্তিক (এইচএসডি) বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ ৭৬৮ মেগাওয়াট, যা মোট উৎপাদনের ২ দশমিক ৭০ শতাংশ। ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলও আমদানি করতে হয়।
এছাড়া ভারত থেকে আমদানি করা হচ্ছে ১ হাজার ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ, যা মোট সরবরাহের প্রায় ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। নবায়নযোগ্য জ্বালানির মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ থেকে উৎপাদন হচ্ছে ৭৭৭ মেগাওয়াট বা ২ দশমিক ৭৩ শতাংশ। জলবিদ্যুৎ থেকে আসছে ২৩০ মেগাওয়াট এবং বায়ুবিদ্যুৎ থেকে মাত্র ৬২ মেগাওয়াট। এছাড়া অন্যান্য উৎস থেকে উৎপাদিত হচ্ছে আরও ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ।
চাহিদা ও সরবরাহ
বছরের মার্চ ও এপ্রিল মাসে তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশে বিদ্যুতের চাহিদাও বেড়ে যায়। পিডিবির হিসাবে গত শনিবার (১৭ মে) দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল (সর্বোচ্চ চাহিদার সময় অর্থাৎ সন্ধ্যায়) ১৬ হাজার ৪৮০ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ করা হয়েছে ১৬ হাজার ২০১ মেগাওয়াট। ফলে লোডশেডিং করতে হয়েছে ২৬৭ মেগাওয়াট।
সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বর্তমানে দুটি কারণে ৫ হাজার ৮৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। এর মধ্যে গ্যাসের স্বল্পতার কারণে ৪ হাজার ২১৪ মেগাওয়াট এবং বিদ্যুৎকেন্দ্র মেরামত ও সংরক্ষণ কাজ চলমান থাকায় ১ হাজার ৬১৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে না।
এছাড়া সম্প্রতি ইরানযুদ্ধের কারণে তেল আমদানিতে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। একইসঙ্গে কয়লার ঘাটতির কারণে কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে কম উৎপাদন হচ্ছে। আবার ব্যয় সাশ্রয়ের অংশ হিসেবে সরকার দীর্ঘ সময় তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রাখে। শুধুমাত্র পিক আওয়ার অর্থাৎ প্রতি দিন সন্ধ্যায় সর্বোচ্চ চাহিদার সময় চালানো হয় এসব কেন্দ্র।
পিডিবির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে জানান, বর্তমানে পেট্রোবাংলার কাছে পিডিবির গ্যাসের চাহিদা রয়েছে প্রায় ১ হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট। তবে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে গড়ে ৮৫০ থেকে ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এতে গ্যাসচালিত অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের জ্বালানি খাত এখনও আমদানিনির্ভর। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি বা সরবরাহ বিঘ্নিত হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে দেশের বিদ্যুৎ খাতে। তাদের মতে, জ্বালানিতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন না করা পর্যন্ত বিদ্যুৎ পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হবে।
সংশ্লিষ্টরা যা বলছেন
জানতে চাইলে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন-বিপিসির এক কর্মকর্তা বলেন, তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র আমাদের জন্য ব্যয়বহুল। তাই পুরো ক্ষমতায় ২৪ ঘণ্টা কেন্দ্রগুলো চালানো সম্ভব না। একটা নির্দিষ্ট সময়ে চালাতেই যথেষ্ট তেলের দরকার পড়ে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, মূলত তিনটি কারণে আমরা বিদ্যুৎ সংকট থেকে বের হতে পারছি না: এক. অর্থ সংকট, দুই. জ্বালানি সংকট এবং তিন. আমদানি-নির্ভরতা।
তিনি বলেন, প্রথম থেকে পরিকল্পনায় সমস্যা ছিল। তেল আমদানি করার চেয়ে এলএনজি আমদানি করা গেলে কিছুটা সাশ্রয় হতো। তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাতে গেলেই পিডিবির লোকসান বেড়ে যায়। অপরদিকে তেল কিনতে গিয়ে সরকারকে প্রচুর পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।
আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় জ্বালানিতে মনোযোগ দেওয়া এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো হলে সংকট কিছুটা কমে আসবে বলে তিনি মনে করেন।



