ঈদে বিদ্যুৎ চাহিদা কম, লোডশেডিং নেই তবে ঝড়ের শঙ্কা
ঈদে বিদ্যুৎ চাহিদা কম, লোডশেডিং নেই তবে ঝড়ের শঙ্কা

ঈদের ছুটি শুরু হওয়ার পর দেশে বিদ্যুতের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। আগামী এক সপ্তাহ বিদ্যুৎ ব্যবহার মূলত বাসাবাড়িতেই সীমিত থাকবে। একই সময়ে দেশের বেশির ভাগ এলাকায় কোনো কোনো দিন বৃষ্টি হতে পারে। দিনে গড়ে বিদ্যুতের চাহিদা ৮ থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে লোডশেডিংয়ের তেমন কোনো শঙ্কা নেই। তবে গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে ঝড়বৃষ্টি সমস্যা তৈরি করতে পারে।

বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ পরিস্থিতি

বিদ্যুৎ সরবরাহের দুই মূল সংস্থা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ (পিজিবি) পিএলসি সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। এর মধ্যে ২০ মে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে ১৭ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। তবে বেশির ভাগ সময় চাহিদা ১৫ হাজার মেগাওয়াট ছাড়ালেই লোডশেডিং করতে হয়।

বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও জ্বালানির অভাবে পূর্ণ উৎপাদন সম্ভব হয় না। তরল জ্বালানিচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র বেশি চালালে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়, যা সরকারের ভর্তুকি বাড়ায়। তাই উৎপাদন সীমিত রেখে চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করা হয়। গত এপ্রিলে গরম বেড়ে যাওয়ায় নিয়মিত লোডশেডিং করতে হয়েছে। তবে মে মাসে নিয়মিত বৃষ্টির কারণে চাহিদা কম থাকায় লোডশেডিং করতে হয়নি। এ ছাড়া গত মাসের তুলনায় এ মাসে বিদ্যুৎ উৎপাদনও বাড়ানো হয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভূমিকা

পিডিবি সূত্র বলছে, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সব উৎপাদনে থাকায় মে মাসে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানো গেছে। তবে কারিগরি ত্রুটির কারণে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট থেকে উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে, যা ঈদের আগেই চালু হতে পারে। এ ছাড়া নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ কাজের জন্য মাতারবাড়ি ও বাঁশখালী বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি করে ইউনিট বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে দুটি কেন্দ্র থেকে মোট ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট উৎপাদন কমেছে। ঈদের ছুটির প্রথম দিনে গত সোমবার বিদ্যুৎ চাহিদা ছিল সাড়ে ১০ হাজার থেকে ১১ হাজার মেগাওয়াট।

পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, 'আগে থেকে নির্ধারিত সূচি মেনেই দুটি কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্রে রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। এতে অসুবিধা হবে না। ঈদের ছুটিতে সবাইকে স্বস্তি দিতে চাহিদামতো বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।'

গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহের চ্যালেঞ্জ

পিডিবির কাছ থেকে কিনে সারা দেশের গ্রাহকদের কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেয় সরকারের ছয়টি বিতরণ সংস্থা। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) একাই ৫৫ শতাংশের বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। দেশের সব গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে তারা। বিদ্যুতের চাহিদা ও উৎপাদনে ঘাটতি হলেই গ্রামে লোডশেডিং বেড়ে যায়।

ছুটিতে চাহিদা কম থাকায় বিদ্যুতের ঘাটতির শঙ্কা নেই আরইবির। তবে এ সময়ের আকস্মিক ঝড়বৃষ্টি নিয়ে দুশ্চিন্তা আছে। আরইবি সূত্র বলছে, ঈদের ছুটির প্রথম দিনেই ঝড়ের কবলে পড়ে কয়েকটি জেলায় বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দেয়। এর মধ্যে কুমিল্লা, শরীয়তপুর, দিনাজপুর, রংপুর ও জামালপুর জেলা অন্যতম। গত সোমবার সকালে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে কুমিল্লার সাড়ে ৬ লাখ গ্রাহক। লাইন মেরামতের পর ওই এলাকার সবার বিদ্যুৎ ফিরতে সন্ধ্যা পার হয়ে যায়। ঝড় হলে সবখানে বিদ্যুৎ সরবরাহ ধরে রাখা সম্ভব হয় না।

আরইবির কাঠামো ও সমস্যা

দেশের ৪৬২টি উপজেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) অধীনে থাকা ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। সবচেয়ে বড় এ বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাটির বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য বিতরণ লাইন আছে এখন সাড়ে ৫ লাখ কিলোমিটার। তাদের মোট গ্রাহক পৌনে চার কোটি। অনিয়মিত-নিয়মিত মিলে সংস্থাটির জনবল প্রায় ৪০ হাজার।

সংস্থাটির কর্মকর্তারা বলছেন, প্রত্যন্ত এলাকায় গাছপালার মধ্য দিয়ে নিয়ে যাওয়া বিতরণ লাইন, ত্রুটি খুঁজে বের করার সনাতন পদ্ধতি ও জনবলের ঘাটতি রয়েছে। একটু ঝড়বৃষ্টি হলেই বন্ধ হয়ে যায় বিদ্যুৎ সরবরাহ। কখনো কখনো বিদ্যুৎ ফিরে আসতে লেগে যায় কয়েক ঘণ্টা। আরইবির মূল বিতরণ লাইনটি সব এলাকাতেই বেশ দীর্ঘ। বন–জঙ্গল, বাড়িঘর, গাছপালার মধ্য দিয়ে এসব লাইন চলে গেছে। লম্বা লাইনে কপারে আচ্ছাদিত তার ব্যবহার করা হয় না। বিদ্যুতের মূল তারে গাছ হেলে বা ডাল ভেঙে পড়লে বিদ্যুৎ চলে যায়। এটি শনাক্ত করতে স্থানীয়দের অভিযোগের ওপর ভরসা করতে হয়। কেউ না জানালে শনাক্ত করতেই লম্বা সময় লেগে যায়।

বিতরণ লাইনের দুই পাশে ১০ ফুট করে গাছপালা পরিষ্কার রাখতে হয় নিয়মিত। বছরে তিনবার গাছপালা পরিষ্কার করতে প্রতিটি সমিতির ৮০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকার আলাদা বরাদ্দ আছে। তবে এটি নিয়মিত পরিষ্কার করা যায় না, এবং এলাকার লোকও বাধা দেয়। টেকসই, গুণগত মানসম্মত ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করছে আরইবি।

ঈদে প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা

আরইবির প্রধান প্রকৌশলী (পরিচালন ও পরিকল্পনা) স্বপন বণিক বলেন, 'চাহিদা কম থাকায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে সামগ্রিক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। দেশের সবচেয়ে বিস্তৃত ও দীর্ঘ লাইন ঠিক রাখায় ঝড় নিয়ে দুশ্চিন্তা আছে। ঈদে ছুটি বাতিল করে সবাইকে দায়িত্বে রাখা হয়েছে। লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হলেই মেরামতের কাজ শুরু হচ্ছে। নজরদারি চালু আছে, নিয়ন্ত্রণকক্ষ ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখা আছে।'